কূটনৈতিক মহলের মতে, একদিকে আলোচনার টেবিলে নমনীয়তা না দেখানো এবং অন্যদিকে মাঝসমুদ্রে মার্কিন জাহাজকে হুমকি দেওয়া - সব মিলিয়ে ইরান স্পষ্ট করে দিল যে তারা সহজে মাটি ছাড়বে না।

হরমুজ প্রণালীতে মুখোমুখি আমেরিকা ও ইরানের রণতরী।
শেষ আপডেট: 12 April 2026 13:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একদিকে ইসলামাবাদের (Islamabad peace talk US Iran) মাটিতে যখন দুই দেশের কূটনীতিকরা খসড়া প্রস্তাব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিলেন, ঠিক তখনই কয়েকশো মাইল দূরে সমুদ্রে আছড়ে পড়ল যুদ্ধের ঢেউ। হরমুজ প্রণালীতে মুখোমুখি আমেরিকা ও ইরানের রণতরী (US-Iran Hormuz standoff)।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, রেডিও বার্তায় মার্কিন রণতরীকে (US warships Strait of Hormuz) ‘শেষ হুঁশিয়ারি’ (Iranian Navy warning) দিতেও পিছপা হয়নি ইরানের ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’ (IRGC)।
‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ (WSJ)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তেজনার সূত্রপাত হয় যখন আমেরিকার দুটি শক্তিশালী গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার - ‘ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক ই পিটারসন’ এবং ‘ইউএসএস মাইকেল মারফি’ হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের চেষ্টা করে। গত ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের পর এই প্রথম কোনও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এই বিতর্কিত জলপথে ঢোকার সাহস দেখাল।
কাছেই থাকা একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পাওয়া অডিও ক্লিপে সেই রোমহর্ষক মুহূর্ত ধরা পড়েছে। ইরানি নৌসেনা তারস্বরে চেঁচিয়ে বলছে, “এটাই শেষ হুঁশিয়ারি! আমি আবারও বলছি, এটাই শেষ হুঁশিয়ারি!” পালটা শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় মার্কিন রণতরী থেকে উত্তর আসে, “আমরা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই এগোচ্ছি। আপনাদের প্রতি কোনও চ্যালেঞ্জ ছোঁড়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা বর্তমান যুদ্ধবিরতির নিয়ম মেনেই চলছি।”
হরমুজ কেন রণক্ষেত্র?
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমজ প্রণালীর সংকীর্ণ পথ দিয়েই যায়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ড্রোন এবং মিসাইল ব্যবহার করে এই পথ কার্যত বন্ধ করে রেখেছিল ইরান। ফলে বিশ্ব বাজারে তেলের জোগান তলানিতে ঠেকেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, আমেরিকা এই পথ সাফ করার কাজ শুরু করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীকে বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করাই তাঁদের লক্ষ্য। ইরান এই জলপথে যত্রতত্র মাইন বিছিয়ে রেখেছে। সেই মাইন সরাতে আন্ডারওয়াটার ড্রোন নামিয়েছে আমেরিকা। কুপারের সাফ কথা, “ওয়াশিংটন কোনওভাবেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ইরানের একাধিপত্য মেনে নেবে না।”
ইরানের পাল্টা দাবি ও ‘টোল’ বিতর্ক
এদিকে ইরান দাবি করেছে, তাদের কড়া হুঁশিয়ারির মুখে মার্কিন জাহাজগুলি পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, কোনও পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আমেরিকা এই পথে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। শুধু তাই নয়, ইরানের জলপথ ব্যবহার করার জন্য জাহাজ প্রতি ২০ লক্ষ ডলার ‘টোল’ বা কর দাবি করেছে ইরান, যা নিয়ে নতুন করে বিবাদ দানা বেঁধেছে।
ভেস্তে গেল ইসলামাবাদ বৈঠক?
সমুদ্রে যখন এই টানাপড়েন চলছে, তখনই ইসলামাবাদ থেকে আসে 'দুঃসংবাদ'। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরানের সামনে আমেরিকা তাদের ‘সেরা এবং শেষ’ (Best and Final) প্রস্তাব রাখলেও তেহরান তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। ফলে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকের পর শান্তি প্রক্রিয়া এখন বিশ বাঁও জলে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, একদিকে আলোচনার টেবিলে নমনীয়তা না দেখানো এবং অন্যদিকে মাঝসমুদ্রে মার্কিন জাহাজকে হুমকি দেওয়া - সব মিলিয়ে ইরান স্পষ্ট করে দিল যে তারা সহজে মাটি ছাড়বে না। অন্যদিকে, মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের এই ‘সিক্রেট মুভ’ বুঝিয়ে দিল, আমেরিকাও প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শনে পিছপা হবে না।