‘গাজা পুনর্গঠন’ (Gaza) এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার মূল বিষয়। কিন্তু বিদেশ থেকে আসা সেই পরিকল্পনাগুলোর বেশিরভাগই ভবন বা রাস্তাঘাট গড়ার কথা বলে, মানুষ গড়ার নয়।

'ধ্বংসস্তূপে এক নতুন প্রজন্মের জন্ম হবে বলে...'
শেষ আপডেট: 2 November 2025 17:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু' সপ্তাহ আগেই মিশরের শার্ম এল শেখে বিশ্বনেতারা ঘোষণা করেছিলেন— আরব দুনিয়ায় শান্তির নতুন পথ খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু আগের মতোই, সেই ঘোষণার কেন্দ্রে নেই যাঁরা, যাঁরা সবচেয়ে বেশি মূল্য চুকিয়েছেন, তাঁরা হলেন প্যালেস্তাইনের (Palestine) বাসিন্দারা।
আজও ইজরায়েল (Israel) হাতে ধরে রেখেছে সেই নাজুক যুদ্ধবিরতির লাগাম। বিশ্ব যখন ইজরায়েলের বন্দিদের মৃতদেহ খোঁজার দিকে ব্যস্ত, তখন গাজার মানুষের নিজেদের হারানো আপনজনদের শোক জানাবার সুযোগটুকুও নেই।
‘গাজা পুনর্গঠন’ (Gaza) এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার মূল বিষয়। কিন্তু বিদেশ থেকে আসা সেই পরিকল্পনাগুলোর বেশিরভাগই ভবন বা রাস্তাঘাট গড়ার কথা বলে, মানুষ গড়ার নয়। অথচ আসল পুনর্গঠন শুরু হতে হবে মানুষকে কেন্দ্র করেই—বিশেষত শিক্ষাকে ঘিরে। কারণ যে প্রজন্ম ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকেও স্বপ্ন দেখছে, সেই তরুণ প্রজন্মই গাজার ভবিষ্যৎ।
গাজার পুনর্গঠন নিয়ে এখন নানা পরিকল্পনা ঘুরছে আন্তর্জাতিক মহলে। কিন্তু এই পরিকল্পনাগুলোর বেশিরভাগেই বাদ পড়ে যাচ্ছেন সেই প্যালেস্তাইনের বাসিন্দারা, যাঁরা গণহত্যার অভিঘাতে বেঁচে আছেন। তাঁদের জন্য ‘সহায়তা’ মানে যেন আবারও নিয়ন্ত্রণ। আবারও বাহ্যিক শাসন।
কিন্তু সেখানকার ইতিহাস বলছে, সমাজ টিকে আছে শিক্ষার ওপর ভর করে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুলগুলোই টিকিয়ে রেখেছে তাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছা। ক্যাম্পাস ভেঙে চুরমার হলেও, অধ্যাপকরা ক্লাস নিচ্ছেন তাঁবুর নীচে, গাছতলায়, বা অস্থায়ী আশ্রয়ে। তাঁরা থামেননি। ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন।
গাজার বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু পাঠশালা নয়, এগুলো ভাবনার, সহমর্মিতার, এবং আশার কেন্দ্র। এখানেই তৈরি হবে সেই ডাক্তার, শিক্ষক, স্থপতি, আইনজীবী, যারা একদিন গাজার সমাজটাকে আবার দাঁড় করাবে।
পৃথিবীর নানা প্রান্তে এখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো প্যালেস্তাইনের পাশে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা— ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদে, মোমবাতির আলোয়, কিংবা মানববন্ধনে জানাচ্ছেন, শিক্ষা কেবল সহজাত পাঠ নয়, এটি বিবেকের প্রকাশও।
এই বিশ্বজনীন সংহতি গাজার পুনর্গঠনের দিশা দেখাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত গাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। যাতে গাজা আবার চিন্তা, গবেষণা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নতুন করে উঠতে পারে।
তবে এই সংহতি যেন করুণা না হয়। গাজাকে সাহায্য করা মানে দয়া করা নয়— এটা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। গাজার শিক্ষাক্ষেত্রকে নিজের শর্তে, নিজের মর্যাদায় সহযোগিতা দরকার ।
গাজা আজ শুধু ধ্বংসস্তূপ নয়, এক নতুন বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র। ভেঙে পড়া ভবন থেকে নির্গত অ্যাসবেস্টস গাজার বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ফুসফুসের রোগের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। এসব মোকাবিলায় চাই আন্তর্জাতিক গবেষণা ও জ্ঞানের বিনিময়।
একইভাবে, যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজার সম্পত্তি, উত্তরাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলো মীমাংসা করতে দরকার আইনজীবী, সমাজবিজ্ঞানী, সাংবাদিক, এবং ইতিহাসবিদদের যৌথ উদ্যোগ। শিক্ষা এই সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়।
গাজা যদি সত্যিই নতুন পথে হাঁটতে চায়, তবে তাকে স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ স্মৃতি ছাড়া শান্তি মানে বিস্মৃতি। প্রতিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি, প্রতিটি হারানো পরিবার ইতিহাসের অংশ। তাদের নথিভুক্ত করতে হবে, মনে রাখতে হবে।
এই স্মরণই ভবিষ্যতের ন্যায়বিচারের ভিত্তি। আর শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও ইতিহাসই পারে সেই শোককে রূপ দিতে প্রতিরোধের শক্তিতে।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও আজ গাজার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেঁচে আছে। তারা গাজার স্মৃতি রক্ষা করছে, আর ভবিষ্যৎ গড়ছে। কারণ শেখার মধ্যেই আছে জীবনের প্রতিরোধ, এবং শিক্ষাই গাজার টেকসই শান্তির প্রথম পদক্ষেপ।