গত মাসে একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে এ বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপরই প্রথম দফায় খনিজ সরবরাহ শুরু হল।

আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পাকিস্তানের ঋণভার কমাতে এখন ইসলামাবাদ প্রশাসন ট্রাম্পকে খুশি রাখতে চায়।
শেষ আপডেট: 6 October 2025 18:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গুঞ্জন চলছিলই, এবার নিশ্চিত হওয়া গেল। মার্কিন মুলুকে দুষ্প্রাপ্য খনিজের প্রথম সম্ভার পাঠাল পাকিস্তান। গত মাসে একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে এ বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপরই প্রথম দফায় খনিজ সরবরাহ শুরু হল। ঋণজর্জর দেশের খনিজ সম্পদকে ব্যবহার করে উন্নয়নের হাতিয়ার করাই এই বাণিজ্যের প্রধান উদ্দেশ্য। যদিও এই চুক্তি ও সরবরাহ নিয়ে সেদেশেই বিতর্কের মুখে শাহবাজ শরিফ সরকার।
পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ এই খনিজ সরবরাহকে দুদেশের ‘গোপন আঁতাঁত’ বলে ব্যাখ্যা করেছে। নমুনা হিসেবে পাকিস্তান অ্যান্টিমনি, কপার কনসেন্ট্রেট এবং দুষ্প্রাপ্য কিছু খনিজ পাঠিয়েছে বলে সোমবার পাক সংবাদপত্র দ্য ডন জানিয়েছে।
ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস এ বিষয়ে পাকিস্তানি মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শাখা ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে একটি মউ স্বাক্ষর করে। পাকিস্তানে একটি খনিজ প্রক্রিয়াকরণ কারখানা খোলার জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে। প্রথম দফায় যে নমুনা পাঠানো হয়েছে, তা স্থানীয়ভাবে পরিশোধন করা হয়েছে। দুই দেশের তরফেই এই ঘটনাকে মাইলস্টোন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের পরামর্শদাতারা আমেরিকার কাছে আরব সাগর এলাকায় একটি অসামরিক বন্দর গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। ব্রিটিশ দৈনিক সংবাদপত্র ফিনান্সিয়াল টাইমস প্রস্তাবিত বন্দরের নকশা দেখেছে বলে দাবি জানিয়ে এই খবর দিয়েছে। আরব সাগরে পাকিস্তানি মাটিতে আমেরিকা বন্দর গড়লে এবং সেখান থেকে জাহাজ চলাচল করলে আখেরে ভারতের উপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি হবে। নিরাপত্তা ছাড়াও মার খাবে এদেশের সমুদ্র বাণিজ্য।
করাচি থেকে মাত্র ৪৫০ কিমি দূরে বালুচিস্তানের গ্বদর জেলার মারকানে অবস্থিত পাসনি নামে একটি সমুদ্র তীরবর্তী শহর আছে। যা মূলত মৎস্য বন্দর। আরব সাগরের তীরের এই বন্দর পাসনি শহরের খুব কাছেই ছোট্ট একটি দ্বীপ। সেখানেই বন্দর গড়ে তোলার প্রস্তাবের কারণ হচ্ছে, পাকিস্তান বালুচিস্তানের দুষ্প্রাপ্য খনিজ বেচে দিতে চায় আমেরিকাকে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে খনিজ বাণিজ্য নিয়ে প্রস্তাব দিয়ে এসেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল মুনির।
মূল বিষয়টি হল, আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পাকিস্তানের ঋণভার কমাতে এখন ইসলামাবাদ প্রশাসন ট্রাম্পকে খুশি রাখতে চায়। আর সে কারণেই দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদ, যা আমেরিকার ভীষণভাবে কাজে লাগে এবং পাকিস্তানের প্রযুক্তির প্রয়োগের বাইরের জিনিস তা বেচে দিতে মরিয়া শরিফ ও মুনিরভাই।
পাসনিকে বাছার আরও একটি কারণ হল, এই দ্বীপ বালুচিস্তানে হওয়ায় তা ভৌগোলিক দিক থেকে আফগানিস্তান ও ইরানের একেবারে দোরগোড়ায়। এদিকে, আরব সাগর বয়ে এসে ভারতের জল সীমান্তের দূরত্বও খুব বেশি নয়। ফলে আমেরিকা এখানে সমুদ্র বন্দর গড়ে তুললে তা একসঙ্গে আফগানিস্তান, ইরান ও ভারত ছাড়াও বালুচ সংগ্রামীদের পক্ষেও চাপের হবে। এছাড়া বালুচিস্তান-খাইবার পাখতুনখোয়াতেই রয়েছে ওই সব দুষ্প্রাপ্য খনিজ ভাণ্ডার। সে কারণে কাঁচামাল পরিবহণেও তেমন বেগ পেতে হবে না আমেরিকাকে।
সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ মুনির ও শরিফ দুজনে মিলে দেখা করেন ট্রাম্পের সঙ্গে। সেখানে ট্রাম্পকে মার্কিন কোম্পানিগুলিকে পাকিস্তানে বিনিয়োগের অনুরোধ জানান শরিফ। তিনি জানান, কৃষি, প্রযুক্তি, খনি এবং বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে মার্কিন বিনিয়োগের প্রত্যাশা রাখে পাকিস্তান। বন্দর তৈরির নকশায় পাসনিতে মার্কিন সেনা ঘাঁটি নির্মাণের প্রস্তাব আপাতভাবে বাদ রাখা হয়েছে। তবে খনিজ সম্পদে ভরপুর পশ্চিম প্রদেশের সঙ্গে বন্দরের একটি রেলপথ যোগাযোগের কথা রয়েছে পরিকল্পনায়।
পাকিস্তানের দল পিটিআই এ ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, সরকারকে খনিজ রফতানি ও বন্দর চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে বলতে হবে। দলের দাবি, সব চুক্তির বিস্তারিত রিপোর্ট জনসাধারণের সামনে জানাতে হবে। তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে, এই চুক্তি কেন এত গোপনীয়তা রক্ষা করে হয়েছে। এর সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা জড়িত।