মীরা মুরাতির (Mira Murati) সংস্থা 'থিঙ্কিং মেশিনস' (Thinking Machines Lab) কিনতে চেয়েছিলেন জুকারবার্গ (Mark Zuckerberg)। প্রত্যাখ্যান শুনে ১৫০ কোটি ডলার দিয়ে তাঁর টপ ইঞ্জিনিয়ারকেও কেনার চেষ্টা করেন তিনি।

মীরা মুরাতি ও মার্ক জুকারবার্গ।
শেষ আপডেট: 6 August 2025 15:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিলিকন ভ্যালিতে একটা কথা খুবই প্রচলিত — 'কখনও মার্ক জুকারবার্গকে (Mark Zuckerberg) হেলাফেলা কোরো না। কারণ, একবার কিছু ঠিক করলে তিনি সেটা করেই ছাড়েন, যে কোনও মূল্যে।' এবার তাঁর সেই দৃঢ় মনোভাবেরই মুখোমুখি হলেন OpenAI-এর প্রাক্তন সিটিও এবং বর্তমান Thinking Machines Lab-এর প্রতিষ্ঠাতা মীরা মুরাতি (Mira Murati)।
সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক রিপোর্টে উঠে এসেছে, জুকারবার্গ মীরা মুরাতিকে ১ বিলিয়ন ডলারে (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮৮০০ কোটি টাকা) তাঁর AI স্টার্টআপ কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। মীরা সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, এবার জুকারবার্গ সরাসরি ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন। লক্ষ্য, Thinking Machines-এর টপ ইঞ্জিনিয়ারদের তাঁর দলে টেনে নেওয়া।
আলবেনিয়ান-মার্কিন প্রযুক্তিবিদ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ মীরা মুরাতি। তাঁর জন্ম আলবেনিয়ার ভ্লোরে, ১৯৮৮ সালে। পড়াশোনায় ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রযুক্তি ও গণিত ছিল তাঁর প্রিয় ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন টেসলা-সহ নানা বিখ্যাত কোম্পানিতে কাজ করার পর ২০১৮ সালে তিনি যুক্ত হন ওপেনএআই-তে। এরপর দ্রুতই তিনি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। ২০২২ সালে CTO (চিফ টেকনোলজি অফিসার) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, এবং ChatGPT, DALL-E, GPT-4-সহ বহু যুগান্তকারী প্রজেক্টের নেতৃত্বে ছিলেন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে ওপেনএআই-এর CEO সাম অল্টম্যানকে সংস্থার বোর্ড সাময়িকভাবে সরিয়ে দিলে মীরাকেই অন্তর্বর্তী CEO করা হয়। যদিও কয়েকদিন পর অল্টম্যান ফেরেন, এবং মীরা ফের CTO-র ভূমিকায় ফিরে যান। এরপর ২০২৪ সালে তিনি ওপেনএআই ছেড়ে নিজেই একটি নতুন AI সংস্থা গড়ে তোলেন—Thinking Machines Lab। অল্প সময়ের মধ্যেই এই সংস্থা প্রযুক্তি জগতে দারুণ সাড়া ফেলে এবং বহু বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও আকর্ষণ করে। বর্তমানে এই সংস্থার কর্ণধার হিসেবে মীরাই দেখছেন তার পথচলার দিশা। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয়, নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার ক্ষেত্রেও তিনি আজকের দিনের অন্যতম অনুপ্রেরণামূলক মহিলা।
মীরা মুরাতির প্রত্যাখ্যানের পরে এই যুদ্ধে জুকারবার্গের 'টার্গেট' হলেন, কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং স্বনামধন্য মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু টালোচ। তাঁর কাছে ৬ বছরে মোট ১.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব পাঠায় মেটা (Meta)। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয়, টালোচ সেই বিশাল অঙ্কের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
টালোচ অবশ্য আগে Meta-তেই কাজ করেছেন, PyTorch-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ AI টুল তৈরিতে বড় ভূমিকা নিয়েছেন। পরে তিনি GPT-4 মডেল নিয়ে OpenAI-তেও কাজ করেন। ২০২৫ সালের শুরুতে মীরা মুরাতির সঙ্গে Thinking Machines Lab-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হন তিনি।
টালোচের Meta-তে ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নানা মহলে জল্পনা শুরু হয়। অনেকেই মনে করছেন, Thinking Machines Lab-এ তাঁর বড়সড় ইকুইটি হোল্ডিং আছে এবং এই কোম্পানির মূল্য ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফলে, এত টাকা দিয়েও হয়তো টালোচকে প্রলুব্ধ করা যায়নি।
জানা গেছে, মেটা-র লক্ষ্য এখন ‘সুপার ইনটেলিজেন্স’ টিম গড়ে তোলা। এই কারণে জুকারবার্গ নিজেই বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ার ও গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অ্যান্ড্রু টালোচের মতোই তিনি সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিলেন ২৪ বছর বয়সি AI প্রতিভা ম্যাট ডেইটকের কাছে।
প্রথমে ডেইটকে ১২৫ মিলিয়ন ডলার অফার করলেও তিনি না বলেন। এরপর জুকারবার্গ তাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে অফার বাড়িয়ে ২৫০ মিলিয়নে বাড়িয়ে দেন, যার মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার প্রথম বছরেই নিশ্চিত করে দেওয়ার কথা বলা হয়। এই অফারের সামনে অবশেষে নতি স্বীকার করেন ডেইটকে।
তবে মেটা শুধু Thinking Machines Lab নয়, বরং পুরো AI ইন্ডাস্ট্রিকেই নজরে রেখেছে। OpenAI-এর ১০০-র বেশি কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ জনকে ইতিমধ্যেই নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও, Dario Amodei-এর Anthropic-ও Meta-র হিটলিস্টে রয়েছে।
মেটার মুখপাত্র অ্যান্ডি স্টোন অবশ্য জানিয়েছেন, টালোচের প্রস্তাবিত পারিশ্রমিক সম্পর্কে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি অতিরঞ্জিত ও অবাস্তব। তাঁর মতে, এত বড় অঙ্কের অফার বাস্তবায়িত হয় মেটার স্টক পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে। তিনি আরও বলেন, মেটা কখনও থিঙ্কিং মেশিমস-কে কেনারও চেষ্টা করেনি। এটা ভুল ধারণা।
তবে এই পুরো ঘটনা থেকে একথা বোঝা যায় যে, আজকের AI যুদ্ধ শুধু পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানবসম্পদ ও প্রতিভার দখল নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। Thinking Machines এখন বড় ফোর্স, এবং জুকারবার্গ যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের ভিত কাঁপিয়ে দিতে চাইছেন, তা এই প্রযুক্তি দুনিয়ায় এক অনন্য নজির।