ইংরেজি জানলেও এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বিদেশের মাটিতেও মাতৃভাষাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। বাংলা ভাষায় ভোটপত্র সেখানে আবেগের বিষয় তো বটেই।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 November 2025 19:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কখনও বলিউডের ধাঁচে, শাহরুখের মতো হাত ছড়িয়ে শহরের রাস্তায় ভোটের আর্জি, কখনও খাঁটি ভারতীয়দের মতো হাত দিয়ে ভাত-ডাল খাচ্ছেন। ভোটের আগে মুখে হিন্দি সিনেমার সংলাপ, বাংলায় কথাও বলতে শোনা গেছে জোহরান মামদানি। সবমিলিয়ে ভোটদাতাদের কাছে গোটা বিষয়টা যতটা মনোগ্রাহী করে তোলা যায়।
গতকাল ইনস্টাগ্রামে জোহরান মামদানির (Zohran Mamdani) অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট করা হয়, যেখানে হাসিমুখে ব্যালট ব্যাপার হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন জোহরান। শুধু তাই নয়, নেটিজেনদের চোখে যেটা পড়েছে, তা হল – হাতে ব্যালট সংক্রান্ত যে খাম রয়েছে, তাতে জ্বলজ্বল করছে বাংলায় লেখা – ‘ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষার খাম’।
কিন্তু আমেরিকার মতো শহরে বাংলা ভাষা - এই যাত্রার শুরুটা কবে?
নিউইয়র্ক শহরকে বলা হয় আমেরিকার মেল্টিং পট - কারণ এখানে একসঙ্গে সহাবস্থান করছে বিশ্বের প্রায় সব সংস্কৃতি। শহরটির প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্টের হিসেব বলছে, এই মহানগরে দু’শোরও বেশি ভাষায় কথা বলা হয়।
তবুও মার্কিনি নির্বাচনের ভোটপত্রে স্থান পেয়েছে মাত্র চারটি ভাষা (ইংরেজি ছাড়া) - আর সেই তালিকায় জায়গা পেয়েছে বাংলা। থাকবে চাইনিজ, স্প্যানিশ, কোরিয়ানও।
নিউ ইয়র্কে অনেকেই থাকেন, যাঁদের শিকড় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে গাঁথা।
ইংরেজি জানলেও এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বিদেশের মাটিতেও মাতৃভাষাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। বাংলা ভাষায় ভোটপত্র সেখানে আবেগের বিষয় তো বটেই।
কেন ভোটপত্রে বাংলা বাধ্যতামূলক হল?
এই ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অন্তর্ভুক্তি কেবল সৌজন্য নয় কিন্তু, বরং একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।
নিউইয়র্ক সিটি আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় যেখানে বাংলাভাষী জনসংখ্যা ঘন, সেখানে ভোটের সমস্ত উপকরণ - শুধু ব্যালট নয়, বরং নির্দেশিকা, পোস্টার, সহায়ক সামগ্রী - সবকিছুই বাংলায় দিতে হবে। নিউইয়র্কে একটি মামলা হয়েছিল, ভাষাগত সহায়তা নিয়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে যেহেতু বহু ভাষা রয়েছে, তাই আদালতের নির্দেশ ছিল যদি নির্দিষ্ট ঘনত্বে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী থাকে, তাহলে একটি এশীয় এবং অবশ্যই ভারতীয় ভাষায় ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। আলোচনা শেষে সেখানে বাংলা ভাষাকে বেছে নেওয়া হয়।
প্রথমবার ২০১৩ সালে কুইন্সের দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায় বাংলায় অনুবাদ করা ভোটপত্র পায়।
এটি আসে ১৯৬৫ সালের Voting Rights Act-এর অধীনে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনার পর, যেখানে সংখ্যালঘু ভাষাভাষীদের জন্য ভোটে সহায়তা বাধ্যতামূলক করা হয়।
বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। যদিও বাংলা পুরো উপমহাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে প্রতিনিধিত্ব করে না, তবু এই উদ্যোগে ভোটে অংশগ্রহণ বাড়বে, নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারবে - এটাই উদ্দেশ্য। এখানে অবশ্যই এ দেশের মানুষদের জন্য ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ভোট দেওয়া ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দৃশ্যটা গর্বের।
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠারও এক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।
বাংলা ভাষার এই অন্তর্ভুক্তি যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয় - গণতন্ত্র তখনই পরিপূর্ণ, যখন সবাই নিজের ভাষায় নিজের ভোট দিতে পারে।