পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে পাকিস্তানগামী ‘সেলেন’ জাহাজ আটকাল ইরান। জ্বালানি সঙ্কটে চাপে পাকিস্তান, আমেরিকা-ইরান সংঘাতে মধ্যস্থতার ভূমিকায় ইসলামাবাদ।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 26 March 2026 12:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে (Iran, Pakistan, Hormuz Strait)। এই আবহেই পাকিস্তানগামী একটি কন্টেনার জাহাজকে প্রণালী পার হতে না দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, করাচির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া ‘সেলেন’ নামের জাহাজটিকে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী আটকে দেয়। তেহরানের দাবি, জাহাজটি প্রয়োজনীয় অনুমতি না নিয়েই প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করছিল এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। সেই কারণেই তাকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই ২৫তম দিনে গড়ালেও সংঘাত কমার কোনও লক্ষণ নেই। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের উপর। বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে হয়। ফলে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়তে পারে গোটা বিশ্বের অর্থনীতির উপর।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তান এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে ইসলামাবাদ নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। পাকিস্তান সরকার ইতিমধ্যেই শান্তি আলোচনার জন্য তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকার ১৫ দফার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাকিস্তানের মাধ্যমেই ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সেই প্রস্তাবে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন বন্ধ করার মতো একাধিক শর্ত রাখা হয়েছে। যদিও ইরান সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে, তবু পাকিস্তান-সহ কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের বিষয়টি তারা স্বীকার করেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে পাকিস্তানের জ্বালানি খাত। দেশটির মোট তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয় এবং তার বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়েই আসে। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটায় পাকিস্তানে জ্বালানি সঙ্কট তীব্র আকার নিয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পাকিস্তান সরকার জরুরি ভিত্তিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি দফতরে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথে তেল সরবরাহ সুরক্ষিত রাখতে পাকিস্তান নৌবাহিনী ‘অপারেশন মুহাফিজ-উল-বাহর’ শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে, একদিকে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কড়া নজরদারি, অন্যদিকে আমেরিকা-ইরান সংঘাতের মধ্যে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সক্রিয়তা এবং জ্বালানি সঙ্কট—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু পশ্চিম এশিয়াই নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির উপর তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।