Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

পাকিস্তানের দলিলেও লেখা আছে, শেখ মুজিবই স্বাধীনতার ঘোষক, তাই এ নিয়ে বিতর্ক অনর্থক

শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চের বার্তা ও পাকিস্তানি দলিলে তার স্বীকৃতি—স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রনায়ক মুজিবকে নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ।

 

পাকিস্তানের দলিলেও লেখা আছে, শেখ মুজিবই স্বাধীনতার ঘোষক, তাই এ নিয়ে বিতর্ক অনর্থক

ফাইল চিত্র

অন্বেষা বিশ্বাস

শেষ আপডেট: 26 March 2026 00:05

.সৈয়দ ইফতেখার হোসেন

১৯৭০ সালের ৩০ মার্চ ইয়াহিয়া খান এক তরফা ভাবে একটি আইনি কাঠামো আদেশ (এলএফও) জারি করেন, যাতে বলা হয় নবগঠিত পরিষদ হবে একটি গণপরিষদ আর তাকে ১২০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রনয়ন সম্পন্ন করতে হবে। তিনি বলেন, এই সংবিধানে পাকিস্তানের আদর্শকে ধারণ করতে হবে, যার অর্থ ছিল পাকিস্তানের ধর্মতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা এবং জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমুন্নত রাখা। এলএফও-তে এও জোর দেওয়া হয় যে, নির্বাচনের সময় অর্থনৈতিক বৈষম্যকে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না এবং ইয়াহিয়া নতুন সংবিধান অনুমোদন না দিলে সংসদ স্বয়ংক্রিয় ভাবে ভেঙে যাবে। মুজিব ঘোষণা করেন যে, আওয়ামী লিগের নির্বাচনী ইস্তেহার হবে তাঁর পূর্ব ঘেষিত ছয় দফা ভিত্তিক। আর তাঁর দল আওয়ামী লিগ নির্বাচিত হলে পাকিস্তানের সংবিধান হবে ছয় দফা ভিত্তিক। তখন অনেকেই এমন একটি কঠোর নিয়মের নির্বাচনে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং শেখ  মুজিবকে নির্বাচন বর্জন করতে বলেন। কেউ কেউ স্লোগান তোলেন ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো'। কিন্তু ততদিনে মুজিব নিজেকে একজন রাজনৈতিক নেতা থেকে রাষ্ট্রনায়কে  রূপান্তরিত করেছিলেন। এক অর্থে, মুজিবই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম ও শেষ রাষ্ট্রনায়ক যিনি দেশ ও জনগণের ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন।

১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চের রাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে মুজিব আদৌ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে কিছু নাদান মাঝে মাঝে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করে । অথচ, আর্জেন্টিনা, কানাডা বা নরওয়ের মতো দূর-দূরান্ত থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোও তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, '৩২ নম্বর সড়কে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার হওয়ার আগে মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।' তিনটি বিদেশি টিভি নেটওয়ার্ক, বিবিসি, সিবিএস এবং এনবিসি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তাদের সান্ধ্য সংবাদে বিশ্বকে এই খবর প্রচার করেছিল, যাতে বলা হয়েছিল মুজিব পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পূর্বে ‘তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের একাধিক সেনা অফিসার যারা তখন বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন তারাও পরবর্তীকালে তাদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে এমন তথ্য দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ দফতরের  নথিতেও তা উল্লেখ আছে। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর মুজিব তৎকালীন ইপিআরের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠান, যেখানে তিনি বলেন, 'এটিই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন এবং আপনাদের যা কিছু আছে তা দিয়েই, শেষ পর্যন্ত দখলদার সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করুন। আপনাদের এই সংগ্রাম ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে, যতক্ষণ না পাকিস্তান  দখলদার সেনাবাহিনীর শেষ সৈন্যকেও বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করা হয় এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।'

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এটি ধারণা করা হয়েছিল পাকিস্তানের উভয় অংশকে সমান মর্যাদা দেওয়া হবে যা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী কখনও মানতে চায়নি। পাকিস্তানের থেকে রপ্তানিযোগ্য একমাত্র পণ্য পাট ও চা তার পূর্ব অংশে উৎপাদিত হতো, কিন্তু রপ্তানি আয়ের ৮০% পশ্চিমের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী করাচিকে প্রথমে রাওয়ালপিন্ডিতে স্থানান্তর করা হয় । এরপর রাওয়ালপিন্ডির কাছে জনমানবহীন এক জায়গায় ইসলামাবাদ নামে একটি নতুন রাজধানী গড়ে  তোলা হয়, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি আয় এবং রাজস্ব তহবিল  থেকে।

১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান গৃহীত হয় এবং আশা করা হয়েছিল যে পরের বছরের মধ্যেই নতুন সংবিধানের অধীনে দেশের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু পাঞ্জাবের বেসামরিক-সামরিক চক্র কখনোই চায়নি যে সংবিধানটি কার্যকর হোক, কারণ এটি তাদের ক্ষমতাকে খর্ব করবে এবং তাদের বেসামরিক শাসনের অধীনে কাজ করতে হবে। এভাবেই পাকিস্তানের সুপরিচিত বেসামরিক-সামরিক ষড়যন্ত্রের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এ সময় সকালে একটি সরকার গঠন করা হতো এবং পরের দিনই তা ভেঙে দেওয়া হতো। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত বিরতি দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়ে উঠেছিল রেওয়াজ ।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে অনেকটা প্রত্যাশিতভাবেই বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে, যা রাজনৈতিক পণ্ডিতদের সমস্ত জল্পনা এবং বেসামরিক-সামরিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। জনগণের বঙ্গবন্ধু মুজিব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ভুট্টো ৮৮টি আসন পেতে সক্ষম হন এবং এই অযৌক্তিক প্রস্তাব নিয়ে আসেন যে, এখন থেকে পাকিস্তানের সংসদে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকবে। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠুকে ছিলেন।

মুজিব ও তার দলের ক্রমাগত দাবির মুখে, ইয়াহিয়া নানা টালবাহানার পর  ১৯৭১ সালের ১৩ ফেব্রয়ারি ঘোষণা করেন যে, ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু  হবে। মুজিব ১৩ ফেব্রুয়ারি পুনরায় দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের সংবিধান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হবে। এর চেয়ে  কম কিছুতেই নয় । ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদের অধিবেশন অর্থহীন। মাসের শেষ নাগাদ, ভুট্টোর পিপলস পার্টি ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় তখন টান টান উত্তেজনা। এ’সময় হঠাৎ ১ মার্চ, রেডিও ও টিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে, ১৯৭১ সালের ৩ মার্চের নির্ধারিত সংসদ অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। এই ঘোষণায় পাকিস্তানের সম্পূর্ণ বিভাজন চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। ইয়াহিয়া ও ভুট্টো উভয়েই মুজিব ও বাংলাদেশের জনগণের চিন্তাধারাকে শোচনীয়ভাবে ভুল বুঝেছিলেন।

সংসদ অধিবেশন স্থগিতের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের বেসামরিক শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক ছাত্র সমাবেশ থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রমনা রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) থেকে তিনি সমস্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন। ৭ মার্চ ছিল কার্যত পাকিস্তানের সমাপ্তি।
৭ মার্চ দুপুরের মধ্যেই বিশাল রেসকোর্সটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে  যায়। কেউ বলেন সমাবেশে বিশ লক্ষ মানুষ ছিল; কেউ বলেন পঞ্চাশ লক্ষ। সকালে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড মুজিবের বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং মৃদুভাবে তাঁকে সতর্ক করে দেন যে, তিনি যদি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করবে না। এরপর ছাত্র নেতারা এসে দাবি জানান যে  স্বাধীনতা ছাড়া জনগণ আর কিছুই গ্রহণ করবে না। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা তাঁর স্মৃতিকথা ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’-তে লিখেছেন, 'দূতদের মাধ্যমে আমি শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলাম যে, তাঁর ভাষণের সময় আমি সেনানিবাসে কামান ও ট্যাঙ্ক সজ্জিত সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত  রাখব, যাতে তারা অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমি রেসকোর্স থেকে সরাসরি শেখ মুজিবের ভাষণ শোনার ব্যবস্থাও করে রাখব। যদি শেখ মুজিব দেশের অখণ্ডতার ওপর আঘাত হানেন এবং স্বাধীনতার সর্বজনীন ঘোষণাপত্র পাঠ করেন, তবে আমি কোনও দ্বিধা ছাড়াই এবং আমার ক্ষমতার সবটুকু দিয়ে আমার কর্তব্য পালন করব। আমি অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে সভাটি বানচাল করার এবং প্রয়োজনে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়ে এগিয়ে  যাওয়ার নির্দেশ দেব।'

৭ মার্চের পড়ন্ত বিকেল রমনা রেসকোর্স ময়দানে রচিত হয় বাঙালি জাতির মহকাব্য যখন বঙ্গবন্ধু লক্ষ জনতার সামনে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’।  

২৬ মার্চের ঘোষণাকে বিশ্বকে একটি নতুন জাতির জন্মের কথা জানানোর নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখা যেতে পারে। বাকি নয় মাসের প্রথম দিন থেকেই কেটেছে আমাদের স্বাধীনতা, যা আমাদের ছিল, তা পুনরুদ্ধারে যার জন্য ত্রিশ লক্ষ বাঙালি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আসুন এই দিনে আমরা স্মরণ করি মহান রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুজিবনগর সরকারের সদস্যবৃন্দ, ত্রিশ লক্ষ শহিদ এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব উৎসর্গকারী অন্য সকলকে। কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি সে সকল দেশ ও দেশের মানুষকে যারা আমাদের সেই কঠিন সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু ।

লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক


```