রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দীক্ষালাভ নিছক ধর্মীয় কৃত্য নয়। থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক পালাবদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। কয়েক দশক যাবৎ যিনি রাজ্যসুখ, পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত থাকলেন, তিনিই আচমকা উদয় হলেন কুর্সি দখলের লড়াইয়ে। আর সেটা লুকিয়ে-ছুপিয়ে নয়, বুঝিয়ে দিলেন বুক বাজিয়ে, প্রকাশ্যে, সরবে।

থাইল্যান্ডের ত্যাজ্য রাজপুত্র
শেষ আপডেট: 26 May 2025 18:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঠিক যেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাসের অসমাপ্ত খসড়া। এক রাজার চার রানি, অগণিত শয্যাসঙ্গিনী। অমিতব্যয়ী, স্বেচ্ছাচারী। একদিন চার রানির এক রানিকে পরিত্যাগ করলেন ওই রাজা। সেই সঙ্গে তিন ছেলেকেও। বাধ্য হয়ে ওই রাজমহিষী রাজ্য ছেড়ে চলে গেলেন ভিনদেশে।
ইতিমধ্যে তিন ছেলের এক ছেলে বড় হয়েছে। সে খবর পেল বাবা অসুস্থ। রাজত্বের উত্তরাধিকার নিয়েও গোলমাল বেধেছে। কারণ, এক পুত্র, যাঁর সিংহাসনে বসার কথা, তিনি একাধারে বিকলাঙ্গ ও অপরিণত। বিকল্প এক মেয়ে। তিনিও বেশ কিছুদিন ধরে কোমায়। ছোট মেয়ে রাজ্যের কর্তৃত্বলাভে উৎসুক নন।
এই অবস্থায় রাজ্যে ফিরে এলেন ত্যাজ্য রাজপুত্র। সটান রাজপরিবারের অন্দরমহলে ঢুঁ না মারলেও তোষামোদ করে রাজার মন গলানোর চেষ্টা চালালেন। সিংহাসন পেতে গেলে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। তিনি সেটাও সেরে ফেলেছেন। বদলে যাবে রাজার মন? ত্যাজ্য সন্তানকে ফিরিয়ে নেবেন? দেবেন রাজত্বলাভের নি:শর্ত অধিকার?
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্লটকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লিখলে কোন পথে সমাপ্তি টানতেন, সেটা পাঠকের অনুমানের বিষয়। কিন্তু হুবহু এই রূপরেখায় থাইল্যান্ডের রাজবংশের উত্তরাধিকার নিয়ে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তার পরিণাম হয়তো আগামী কিছুদিনের মধ্যে পরিষ্কার হতে চলেছে!
বিতর্কের কেন্দ্রে থাইলান্ডের বর্তমান রাজা মহা বাজিরালংকর্ন এবং তাঁর ত্যাজ্যপুত্র বাচারেসর্ন বিবাচারাওংস। রাজত্ব ফিরে পেতে তিনি দিনকয়েক আগেই ব্যাংককে বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে দীক্ষাগ্রহণ করেছেন। অনুষ্ঠানের একগুচ্ছ ছবি পোস্ট করেছেন ইনস্টাগ্রামে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দীক্ষালাভ নিছক ধর্মীয় কৃত্য নয়। থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক পালাবদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। কয়েক দশক যাবৎ যিনি রাজ্যসুখ, পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত থাকলেন, তিনিই আচমকা উদয় হলেন কুর্সি দখলের লড়াইয়ে। আর সেটা লুকিয়ে-ছুপিয়ে নয়, বুঝিয়ে দিলেন বুক বাজিয়ে, প্রকাশ্যে, সরবে।
কে এই বাচারেসর্ন?
বাচারেসর্ন মহা বাজিরালংকর্ন দ্বিতীয় ছেলে। মা সুজারিনী বিবাচারাওংস। এক সময় পেশাদার অভিনেত্রী হিসেবে সমাদর পান। রুপোলি পর্দায় খ্যাতিলাভ করেন ‘যুবাধিদা’ নামে।
রাজার নির্দেশেই বহিষ্কৃত হন সুজারিনী। সপুত্র। বাধ্য হয়ে বাচারেসর্নকে দুই ভাইয়ের সঙ্গে, মায়ের হাত ধরে আমেরিকা চলে যেতে হয়। রাজ্যের ত্রিসীমানায় থাকার অধিকারও হারিয়েছিলেন তাঁরা!
১৯৯৬ সালের ঘটনা। তখন বাচারেসর্ন বছর পনেরোর কিশোর। থাইল্যান্ড থেকে অনেক দূরে, সাগর পেরিয়ে বিদেশে বড় হয়েছেন, তবু থাই সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।
দু'বছর আগে সবাইকে অবাক করে থাইল্যান্ডে ফিরে আসেন বাচারেসর্ন। আচমকা। হঠাৎ করে। তারপর থেকে প্রায়শই আমেরিকা-থাইল্যান্ড যাতায়াত করেছেন। অংশ নিচ্ছেন নানাবিধ অনুষ্ঠানে। সম্প্রতি ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করলেন। একে অনেকেই রাজপরিবারে ফিরে আসার ধাপ হিসেবে দেখছেন।
রাজা মহা বাজিরালংকর্ন কে?
রাজা মহা বাজিরালংকর্ন থাইল্যান্ডের রাজা। আপাতত তিনিই মসনদে রয়েছেন। ২০১৬ সালে বাবা রাজা ভূমিবলের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন। ৭২ বছর বয়সী সম্রাট আপাতত ভগ্নশরীর। বেশিরভাগ সময় থাকেন জার্মানিতে।
বাজিরালংকর্নের ব্যক্তিগত জীবন বিতর্কে মোড়া। চারবার বিয়ে করেছেন। ইদানীং রানি (সুথিদা) এবং এক রাজসঙ্গিনীকে (সিনিনাত) নিয়ে দিন গুজরান। বয়স বাড়ছে। শরীর ভাঙছে। সেই সঙ্গে থাইল্যান্ডে রাজত্ব অর্জনের নিয়মগত জটিলতা। সব মিলিয়ে জটিল প্যাঁচে কার্যত দিশেহারা বাজিরালংকর্ন।
রাজার স্ত্রী-সন্তান:
১. প্রথম স্ত্রী সোয়ামসাওয়ালি, এক মেয়ে, রাজকুমারী বাজরাকিটিয়াভা।
২. দ্বিতীয় স্ত্রী সুজারিনী: চার ছেলে ও এক মেয়ে (রাজকুমারী সিরিওন্নাভারি)। ছেলেদের ১৯৯৬ সালে ত্যজ্য ঘোষণা করা হয়।
৩. তৃতীয় স্ত্রী শ্রীরাসমি: এক ছেলে রাজকুমার দিপাঙ্কর্ন
৪. বর্তমান রানি সুথিদা: নি:সন্তান
উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতার কারণ?
থাইল্যান্ডের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী ছেলেদের রাজা হওয়ার কথা। কিন্তু রাজার একমাত্র ছেলে (স্বীকৃত পুত্র) দিপাঙ্কর্ন বিকলাঙ্গ। তার উপর বেশ কিছু মানসিক সমস্যা আছে বলেও অনেকের ধারণা৷ ফলে আইনে না আটকালেও তিনি রাজা হতে পারবেন না।
রইল বাকি রাজকন্যা। রাজার বড় মেয়ে বাজরাকিটিয়াভা। দিপাঙ্কর্নের বিকল্প হিসেবে তাঁকেই সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী মনে করা হয়েছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তিনি আপাতত কোমায়। আজ নয়, গত তিন বছর ধরে।
ছোট মেয়ে সিরিওন্নাভারি। তিনি জীবিত, সুস্থ। রাজপরিবারের সদস্য। প্রাসাদেই থাকেন৷ কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে থাকলেও তাঁকে উত্তরাধিকার হিসেবে ধর্তব্যে আনা হয় না!
বাচারেসর্ন কি রাজা হতে পারেন?
থাইল্যান্ডের রাজ পরিবারের এই অচলাবস্থার জেরে অপ্রত্যাশিতভাবেই মসনদে বসার সুযোগ খুলেছে বাচারেসর্নের সামনে। একদা বহিষ্কৃত ‘রাজপুত্র’। দীর্ঘকাল বিদেশে থেকেছেন। কোনও সম্ভাবনাই ছিল না রাজসিংহাসনে বসার। যদিও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, আবার রাজপরিবারে ফিরতে পারেন তিনি। থাই রীতি অনুযায়ী, রাজদায়িত্ব নেওয়ার আগে ভিক্ষু হতে হয়। তাই দুইয়ে দুইয়ে চার করে বাচারেসর্নের ভিক্ষু হওয়াকে অনেকেই রাজপরিবারে ফিরে আসার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
শুধু তাই নয়৷ যত দিন যাচ্ছে, ইঙ্গিতকে ‘প্রচ্ছন্ন’ থেকে ‘প্রকটে’ পরিণত করছেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে বাবার প্রশংসা, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া—থাইল্যান্ডের সিংহাসন দখলে এতটুকু কসুর করছেন না বাচারেসর্ন।
উপন্যাসের পরিণতি সাধারণত মিলনান্তক হয়ে থাকে। থাইল্যান্ডের রাজপরিবারে পালাবদলের সমীকরণ কোন দিকে বাঁক নেয়, সেটা সময় বলবে।
ঐতিহাসিক উপন্যাসের নায়কও কিন্তু সচারচর ক্ষেত্রে ‘সময়'-ই হয়ে থাকে!