গ্রিনল্যান্ড (Greenland) ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) ধারাবাহিক হুমকির জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করে দিল ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (European Parliament)।

এই স্থগিতাদেশের ফলে চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে যাচ্ছে না।
শেষ আপডেট: 22 January 2026 10:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গ্রিনল্যান্ড (Greenland) ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) ধারাবাহিক হুমকির জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করে দিল ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (European Parliament)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) আইনপ্রণেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আপাতত এই চুক্তির উপর ভোটাভুটি হবে না।
ইইউয়ের ২৭টি দেশের জোট এখন ভাবছে, ট্রাম্প যদি সত্যিই শুল্কযুদ্ধ (tariff war) শুরু করেন, তাহলে তার পাল্টা জবাব কীভাবে দেওয়া হবে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপণ্যে (US industrial goods) শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে ভোট করার কথা ছিল। কিন্তু, সেই পরিকল্পনাও আপাতত বাতিল।
এই স্থগিতাদেশের ফলে চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে যাচ্ছে না। গত জুলাইয়ে দীর্ঘ দর কষাকষির পর এই চুক্তি হয়। যখন ওয়াশিংটন (Washington) ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় পণ্যের উপর ১৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিল। তবে অনুমোদন প্রক্রিয়া আটকে দিয়ে হোয়াইট হাউসকে (White House) যে শক্ত বার্তা পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের মতে, এতে আমেরিকার বাণিজ্যিক মহল (American businesses) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মধ্যপন্থী গোষ্ঠী ‘রিনিউ’ (Renew Europe)-র প্রেসিডেন্ট ভ্যালেরি হায়ার (Valerie Hayer) বলেন, এটা অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার (powerful lever)। আমি মনে করি না, কোনও মার্কিন কোম্পানি ইউরোপীয় বাজার (European market) হারাতে রাজি হবে।
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড (Greenland), যা ডেনমার্কের (Denmark) স্বশাসিত অঞ্চল, তা নিয়ে তাঁর দাবি না মানলে ইউরোপের ছ’টি দেশের উপর শুল্ক বসানো হবে। এই তালিকায় ফ্রান্স (France) ও জার্মানির (Germany) মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্রাসেলসে (Brussels) ইইউ নেতাদের জরুরি শীর্ষ বৈঠক (emergency summit) বসার কথা। সেখানে ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে।
ইইউ ইতিমধ্যেই ভাবছে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পাল্টা শুল্ক (retaliatory tariffs) বসানো হবে। এই প্যাকেজটি গত বছর ইইউ-ইউএস (EU-US trade standoff) বাণিজ্য সংঘাতের সময়েই তৈরি হয়েছিল, যদিও তা ফেব্রুয়ারি ৬ পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল সর্বাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধ এড়াতে। এছাড়াও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ (Emmanuel Macron) চাইছেন, ইইউ-র শক্তিশালী অ্যান্টি-কোয়েরশন ট্রেড ইনস্ট্রুমেন্ট (Anti-Coercion Trade Instrument) সক্রিয় করা হোক, যদি ট্রাম্প তাঁর কথা অনুযায়ী অগ্রসর হন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (US-EU trade deal) মধ্যে হওয়া এই বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদন আটকে গেল মূলত গ্রিনল্যান্ড (Greenland sovereignty) নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থানের কারণে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ট্রেড কমিটি ২৬–২৭ জানুয়ারিতে এ বিষয়ে ভোট করার কথা ছিল, কিন্তু তা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের “গ্রিনল্যান্ড দখল” (seize Greenland) করার বাসনা দুই দীর্ঘদিনের মিত্র— যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ-র মধ্যে বড় সংঘাত তৈরি করেছে। ট্রাম্প আগেই হুমকি দিয়েছিলেন, দ্বীপটি কিনতে না পারলে একাধিক ইউরোপীয় দেশের উপর শুল্ক চাপাবেন। যদিও বুধবার ট্রাম্প জানান, ন্যাটো (NATO)-র প্রধানের সঙ্গে সুমেরুর নিরাপত্তা (Arctic security) নিয়ে একটি ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। এরপর তিনি আটটি ইউরোপীয় দেশের উপর ঘোষিত শুল্ক সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেন।
অধিকাংশ ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।
চুক্তির কিছু অংশ ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে, কিন্তু ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া এটি পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ট্রেড কমিটির চেয়ারম্যান বের্ন্ড লাঙ্গে (Bernd Lange) এক বিবৃতিতে বলেন, ইইউ সদস্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা (territorial integrity) ও সার্বভৌমত্বকে ভয় দেখিয়ে (sovereignty) এবং শুল্ককে চাপের অস্ত্র (coercive instrument) হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ইইউ-ইউএস বাণিজ্য সম্পর্কের স্থিতিশীলতা (stability) নষ্ট করছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সামনে আর কোনও পথ নেই— সহযোগিতার বদলে সংঘাতের রাস্তা বেছে নেওয়া হলে আমরা এই চুক্তির কাজ স্থগিত রাখব। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি (European People’s Party / EPP)-র নেতা মানফ্রেড ওয়েবার (Manfred Weber) বলেন, আমাদের কাছে পরিষ্কার— যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা (reliability) প্রশ্নে পরিষ্কার ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত কোনও অনুমোদন হবে না, কোনও শুল্কহীন সুবিধা (zero tariff access) দেওয়া হবে না।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন (Ursula von der Leyen) সতর্ক করে বলেন, ইউরোপ আলোচনার পথেই বিশ্বাসী (dialogue)। কিন্তু প্রয়োজনে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে (unity), দ্রুত (urgency) এবং দৃঢ়তার সঙ্গে (determination) পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
অনেক ইউরোপীয় আইনপ্রণেতার মতে, এই চুক্তি ভারসাম্যহীন (uneven deal)। কারণ, ইইউকে প্রায় সব শুল্ক তুলে নিতে হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ১৫ শতাংশ শুল্ক রেখে দেবে। তবু আগে তারা চুক্তি মেনে নিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি সেই সমঝোতার পথ কার্যত বন্ধ করে দিল।