এই নথিগুলি কেন বা কীভাবে সরিয়ে ফেলা হল, সে বিষয়ে বিচার দফতর কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। বিষয়টি ইচ্ছাকৃত না প্রযুক্তিগত ত্রুটি, তা নিয়েও সরকারি স্তরে কিছু জানানো হয়নি।

শেষ আপডেট: 21 December 2025 09:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার দফতরের (US Justice Department) সরকারি ওয়েবসাইট থেকে আচমকাই উধাও হয়ে গেল জেফ্রি এপস্টাইন সংক্রান্ত অন্তত ১৬টি নথি (US Justice Department Epstein documents)। শুক্রবার ওই নথিগুলি প্রকাশ্যে আনার পর শনিবারের মধ্যেই সেগুলি আর দেখা যায়নি। নিখোঁজ ফাইলগুলির মধ্যে ছিল এমন একটি ছবিও, যেখানে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেফ্রি এপস্টাইন, মেলানিয়া ট্রাম্প এবং গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে এক ফ্রেমে দেখা যাচ্ছে (Epstein files disappear Trump photo)।
যে সমস্ত নথি আর পাওয়া যাচ্ছে না, তার মধ্যে নগ্ন মহিলাদের শিল্পকর্মের ছবিও ছিল। পাশাপাশি, একটি বিশেষ ছবিতে ট্রাম্প-এপস্টাইনের একাধিক ছবি আসবাবের উপরে ও ড্রয়ারের ভিতরে সাজানো অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এই নথিগুলি কেন বা কীভাবে সরিয়ে ফেলা হল, সে বিষয়ে বিচার দফতর কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। বিষয়টি ইচ্ছাকৃত না প্রযুক্তিগত ত্রুটি, তা নিয়েও সরকারি স্তরে কিছু জানানো হয়নি। বিচার দফতরের এক মুখপাত্র এই বিষয়ে প্রশ্নেরও কোনও উত্তর দেননি।
এই রহস্যজনক ‘ডিলিট’ ঘিরে অনলাইনে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। ঠিক কোন কোন নথি সরানো হল এবং কেন - তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। বহুদিন ধরেই দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী ও অর্থলগ্নিকার জেফ্রি এপস্টাইন এবং তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে জনমানসে কৌতূহল রয়েছে। এই ঘটনা সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিল।
মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁদের পোস্টে ট্রাম্পের ছবি নিখোঁজ হওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলা হয়, “আর কী কী আড়াল করা হচ্ছে? আমেরিকার জনগণের কাছে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।”

প্রকাশিত নথিতে ট্রাম্পের নাম প্রায় অনুপস্থিত
এপস্টাইন সংক্রান্ত হাজার হাজার নথি প্রকাশ করা হলেও সেখানে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম লিখিত নথিতে প্রায় অনুপস্থিত বলেই চোখে পড়ছে, যদিও এপস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অতীতে নথিভুক্ত হয়েছে।
এই অনুপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কারণ এর আগের কিছু প্রকাশ্যে, যেমন এপস্টাইনের ব্যক্তিগত বিমানের ফ্লাইট লগ, ট্রাম্পের নাম ছিল। সেই নথিগুলি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিচার দফতরই প্রকাশ করেছিল। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এপস্টাইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কোনও ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগও আনা হয়নি।
বহু গুরুত্বপূর্ণ নথিই প্রকাশ্যে আসেনি
যে নথিগুলির জন্য সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা ছিল, তার অনেকগুলিই এবার প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে এফবিআইয়ের নেওয়া নির্যাতিতদের সাক্ষাৎকার এবং বিচার দফতরের অভ্যন্তরীণ মেমো, যেখানে কেন কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা থাকার কথা।
এই ঘাটতি নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের প্রসিকিউশন প্রক্রিয়া নিয়ে। তখনই এপস্টাইন এমন এক প্লি এগ্রিমেন্ট পান, যার ফলে তাঁকে ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়নি। বদলে তিনি রাজ্য স্তরের একটি তুলনামূলক হালকা ‘অপ্রাপ্তবয়স্ককে দিয়ে দেহব্যবসা’ সংক্রান্ত অপরাধে দোষ স্বীকার করেন।
এপস্টাইনের সঙ্গে যুক্ত আরও কিছু পরিচিত মুখ, যেমন ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রিন্স অ্যান্ড্রু, নথিতে খুব সামান্যই উল্লেখ পেয়েছেন। ফলে কে কতটা তদন্তের আওতায় এসেছিলেন আর কে আসেননি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নতুন তথ্য থাকলেও ছবি-নির্ভর প্রকাশ
যদিও প্রকাশিত নথিতে কিছু আগে অজানা তথ্যও ছিল। যেমন, ১৯৯৬ সালের একটি অভিযোগপত্র, যেখানে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে শিশুদের ছবি চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পাশাপাশি, ২০০০-এর দশকে বিচার দফতর কীভাবে ধীরে ধীরে ফেডারেল মামলা থেকে সরে আসে, তারও ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে সামগ্রিকভাবে নথি প্রকাশের মূল অংশ জুড়ে ছিল নিউ ইয়র্ক ও মার্কিন ভার্জিন আইল্যান্ডসে এপস্টাইনের বাড়িগুলির ছবি, সঙ্গে ছড়ানো-ছিটানো কিছু সেলিব্রিটি ও রাজনীতিবিদের ফোটোগ্রাফ।
দেরিতে ক্ষুব্ধ নির্যাতিতরা
প্রকাশিত বহু নথিতেই ব্যাপকভাবে তথ্য ঝাপসা করা হয়েছে বা প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট নেই। ১১৯ পাতার একটি নথি, যার শিরোনাম ছিল “Grand Jury–NY”, সেটি সম্পূর্ণ কালো করে দেওয়া হয়েছে। ফেডারেল প্রসিকিউটররা স্বীকার করেছেন, এপস্টাইন ও গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে যৌন পাচার সংক্রান্ত তদন্তে লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠার নথি রয়েছে। তার মধ্যে কেবল একটি অংশই জনসমক্ষে থাকা মামলার সঙ্গে মেলে।
যদিও কংগ্রেস পূর্ণাঙ্গ প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, বিচার দফতর এখন জানাচ্ছে, ধাপে ধাপে নথি প্রকাশ করা হবে। তাদের যুক্তি, নির্যাতিতদের পরিচয় গোপন রাখতে সময় প্রয়োজন।
এই অনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্যাতিতদের পাশাপাশি স্বচ্ছতার দাবিতে সরব আইনপ্রণেতাদেরও হতাশ করেছে। তাঁদের কাছে শুক্রবারের প্রকাশ কোনও সমাপ্তি নয়, বরং আরও একটি দীর্ঘ অপেক্ষার সূচনা। এমন এক অপেক্ষা, যার শেষে এখনও এপস্টাইনের অপরাধচক্র ও তাকে থামাতে ব্যর্থ ফেডারেল ব্যবস্থার পূর্ণ ছবি মিলছে না।