প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অনেকে জানালা ভেঙে পালানোর চেষ্টা করেন। দগ্ধ অবস্থায় বহু মানুষ রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। আহতদের সংখ্যা ১১৯। তাঁদের অধিকাংশের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 3 January 2026 08:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নতুন বছরের আনন্দ যে এমন বিভীষিকায় রূপ নেবে, কেউ ভাবেনি। সুইৎজারল্যান্ডের জনপ্রিয় স্কি রিসর্ট শহর ক্রাঁ-মঁতানায় Le Constellation বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেল অন্তত ৪০ জনের। ভোররাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান—শ্যাম্পেনের বোতলে গোঁজা স্পার্কলার বা ‘বেঙ্গল ক্যান্ডেল’ই আগুনের সূত্রপাত (Deadly Swiss Bar Fire Started From Sparklers Or Bengal Candles: Officials)।
a bar at a swiss ski resort catches fire.
rather than run or respond, the patrons stand around dancing under it and filming it for instagram.
as a result, 40 people who could have reached safety died because they seem, quite literally, to have forgotten that danger is real.
i… pic.twitter.com/RgrYAhDgm1— el gato malo (@boriquagato) January 2, 2026
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনে ধরা পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, বেসমেন্টের বারের নিচু ছাদে শব্দরোধী ফোম লাগানো ছিল। সেই ছাদের একেবারে কাছে শ্যাম্পেন বোতলে বসানো স্পার্কলার জ্বালিয়ে নাচছিলেন পার্টি-গোয়ারা। কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ছাদের ফোমে আগুন ধরলেও তখনও অনেকেই বিপদের গুরুত্ব না বুঝে নাচ চালিয়ে যাচ্ছিলেন—যেন অজান্তেই ঢুকে পড়েছিলেন মৃত্যুফাঁদে।
ওয়ালিস অঞ্চলের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি বিট্রিস পিলু সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ছাদের কাছে উঁচু করে ধরা স্পার্কলার বা বেঙ্গল ক্যান্ডেল থেকেই আগুনের সূত্রপাত।” কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিপদ বুঝতে পেরেই বারে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক—ভিডিওতে ধরা পড়ে দিশেহারা মানুষের ছুটোছুটি, চিৎকার।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অনেকে জানালা ভেঙে পালানোর চেষ্টা করেন। দগ্ধ অবস্থায় বহু মানুষ রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। আহতদের সংখ্যা ১১৯। তাঁদের অধিকাংশের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে সুইস হাসপাতালগুলির ওপর প্রবল চাপ পড়ে। শেষমেশ বহু আহতকে বিশেষ বার্ন ইউনিটে চিকিৎসার জন্য ফ্রান্স-সহ প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলিতে পাঠাতে হয়।
বারটির ফরাসি মালিক জ্যাক মোরেত্তি—যিনি ২০১৫ সাল থেকে স্ত্রী জেসিকার সঙ্গে এই বার চালাচ্ছিলেন—দাবি করেছেন, সমস্ত নিরাপত্তা বিধি মেনেই বার চালানো হচ্ছিল। স্থানীয় সংবাদপত্রকে তিনি বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী সবকিছুই করা হয়েছিল।” তবে কৌঁসুলি পিলু স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সেই নিরাপত্তা বিধি আদৌ ঠিক ভাবে মানা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম মূল বিষয়। আপাতত মোরেত্তি দম্পতিকে ‘সাক্ষী’ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে; এখনও পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা দায়ের করা হয়নি।
ঘটনার সময় বারে ঠিক কত জন ছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্থানীয় পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বারের ভিতরে ৩০০ জন এবং টেরেসে আরও ৪০ জন থাকার অনুমতি ছিল। মৃতদের শনাক্ত করতেও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় বিদেশি নাগরিকদেরও মৃতদের মধ্যে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই অপেক্ষা সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে পরিবারগুলির কাছে। স্থানীয় এক মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে লেটিসিয়া ব্রোদার্ড বলেন, তাঁর ১৬ বছরের ছেলে আর্থারের শেষ বার্তা ছিল—“মা, হ্যাপি নিউ ইয়ার, আই লাভ ইউ।” কাঁপা গলায় তাঁর প্রশ্ন, “৪০ ঘণ্টা হয়ে গেল। আমাদের বাচ্চারা নিখোঁজ। এতক্ষণে তো কিছু জানা উচিত ছিল।”
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার পাওয়া ১১৯ জনের মধ্যে ১১৩ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গিয়েছে। আহতদের মধ্যে সুইস, ফরাসি, ইতালীয়, সার্ব, বসনীয়, বেলজিয়ান, পোলিশ, পর্তুগিজ ও লুক্সেমবার্গের নাগরিক রয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় অন্তত ৫০ জনকে সুইৎজারল্যান্ডের বাইরে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হবে।
ওয়ালিস ক্যান্টনের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বহু রোগীর শরীরে শুধু বাহ্যিক দগ্ধ ক্ষত নয়, শ্বাসনালীতেও মারাত্মক পোড়া রয়েছে—যা চিকিৎসার দিক থেকে অত্যন্ত জটিল। অনেককেই শ্বাসনালি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ভেন্টিলেশনে রাখতে হচ্ছে।
ঘটনার পর ক্রাঁ-মঁতানায় নেমে এসেছে শোকস্তব্ধ নীরবতা। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কথায় বারবার উঠে আসছে একই শব্দ—‘প্রলয়’। আনন্দের রাতে একটু অসতর্কতা যে কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সেই নির্মম পাঠই দিয়ে গেল Le Constellation বারের আগুন।