এখানে পাঁচদিন ধরে একেবারে পাঁজি মেনে পুজো (Durga Puja 2025)। ষষ্ঠীতে ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান থেকে শুরু করে অষ্টমীর ভোগ, সন্ধিপুজো, দশমীর সিঁদুরখেলা সবই চলে একেবারে তিথিনক্ষত্র ধরে।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 21 September 2025 14:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শরতের অপেক্ষায় থাকে না এখানকার শিউলি ফুল। আকাশমুখী হাইরাইজের পাশে পাশে ঝাঁ চকচকে পথের ধারে ইতিউতি কখনও সখনও দেখা মেলে ফুটে থাকা শিউলিফুলের। সারাবছরই শরতের মতো আবহাওয়া যে! তবুও ঠিক সময়ে শারদীয়ার ঘ্রাণ ছড়ায় তারা। সিঙ্গাপুর শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের কানে তখন বেজে ওঠে আগমনীর সুর। মনের ঢাকে কাঠি পড়ে। চূড়ান্ত পেশাদার জীবনে ফাঁক খুঁজে নিয়ে শুরু হয়ে যায় পুজোর প্রস্তুতি।
বিদেশে বাঙালির দুর্গাপুজো (Durga Puja 2025) নতুন নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সপ্তাহের শেষে দু-দিনে টি-২০ খেলার মতো পুজো সারতে হয়। সিঙ্গাপুর (Singapore) কিন্তু সে পথে হাঁটে না কোনওদিনই। এখানে পাঁচদিন ধরে একেবারে পাঁজি মেনে পুজো। ষষ্ঠীতে (Sasthi) ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সপ্তমীতে (Saptami) নবপত্রিকা স্নান থেকে শুরু করে অষ্টমীর (Asthami) ভোগ, সন্ধিপুজো, দশমীর (Dashami) সিঁদুরখেলা সবই চলে একেবারে তিথিনক্ষত্র ধরে। তাই পুজোর সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বাঙালিরা যেন অনেক বেশি সম্পৃক্ত।
তারক দাস দীর্ঘদিন ধরে কর্মসূত্রে রয়েছেন সিঙ্গাপুরে। আইটি সেক্টরের সিনিয়র কনসালট্য়ান্ট। তিনি জানালেন, দু'দশক আগে তিনটির মতো দুর্গাপুজো হতো। সেটা এখন সংখ্যায় বেড়ে আট। রামকৃষ্ণ মিশনের পুজো ছাড়াও সাত-আটটি বেঙ্গলি ক্লাব এখন দুর্গাপুজো করে। রামকৃষ্ণ মিশনে ছবিতে পুজো হলেও বাকিরা সবাই কলকাতার কুমোরটুলি থেকে মূর্তি নিয়ে যায় পুজো করার জন্য। যত দিন এগোচ্ছে ততই পুজোর জাঁকজমকও বাড়ছে। তাঁর কথায়, "বিদেশে থাকলেও পুজোর সময় মাটির গন্ধ পাই আমরা। একটা অন্যরকম ফিলিং। পুজোর ক'টা দিন বিদেশে আছি মনেই হয় না। মোটামুটি বেশ কিছুদিন আগের থাকতেইআগে শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। কুমোরটুলি থেকে ঠাকুর আনা, পুরোহিতের বন্দোবস্ত করা, পুজোর সমস্ত আয়োজনে তো সময় লাগে।"
এখন পুজোর সংখ্য়া বাড়ায় সিঙ্গাপুর শহরে বসেও মিলছে প্যান্ডেল হপিংয়ের স্বাদ। নিজেদের পুজো সেরে অনেকেই বেরিয়ে পড়ছেন অন্যদের মণ্ডপ দেখতে, তাঁদের ভাবনার সরিক হতে। তারকবাবু বলেন, "দুপুর পর্যন্ত নিজেদের মণ্ডপে ব্যস্ত থাকেন সবাই। পুজো শেষ করে খাওয়াদাওয়া। সন্ধেতেও থাকে ব্যস্ততা। তারপর রাতের দিকে অন্যদের পুজো দেখতে বেরোন অনেকেই। সপ্তমী থেকে দশমী মণ্ডপে খাওয়া দাওয়ার ঢালাও ব্যবস্থা থাকে। খিচুরি-লাবড়া-পোলাও-পায়েস, ভোগ নেন সবাই। অনেকে আবার লিটিল-ইন্ডিয়ায় যান পছন্দের খাবার খেতে। পুজোর ক'দিন সেখানে আবার বিরিয়ানির দারুণ কাটতি। অন্যান্য মুঘলাই ডিশেরও চাহিদা বেশ। তবে দুপুরে দেবীর ভোগ খেয়ে রাতেই সাধারণত লিটিল-ইন্ডিয়ার নানা রেস্তোরাঁয় আসন দখল করতে যান সবাই।"
মূলত আইটি ও নির্মাণ, সিঙ্গাপুরের এই দুটি ক্ষেত্র দখল করে রেখেছে বাঙালি। প্রচুর বাঙালি কনসালট্যান্ট যেমন রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন বড় সংখ্য়ায় শ্রমিকও। যত দিন যাচ্ছে ততই বাড়ছে ক্লাবের সংখ্যা। তাই বেশি সংখ্যায় পুজো দেখতে পাচ্ছেন বাঙালিরা। ভারতের অন্য প্রান্ত থেকে যাওয়া মানুষজনও পুজো দেখতে মণ্ডপে ভিড় জমান। ভোগ খান। তাঁদের মধ্যেও তখন ছুটির আমেজ।
এবার উইকএন্ড নেই। মূল চারদিনের পুজোই পড়েছে কর্মদিবসে। তাই বাঙালিদের ছুটির আবেদন সামাল দিতে অফিস কর্তৃপক্ষও হিমশিম! এবার মা দুর্গা গজে আসছেন। ফল শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা। সিঙ্গাপুরে শস্য ফলানোর জায়গা তেমন নেই, কিন্তু এই দেশের জিডিপি গড়গড়িয়ে বাড়বে, এই কোয়ার্টারে বেশি প্রফিট করবে, এমন আশা দেখিয়েই কি তবে ছুটি ম্যানেজ করবে বাঙালি! বিশ্বের সবচেয়ে ধর্মীয় বৈচিত্র্যময় দেশগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয় সিঙ্গাপুরকে। যেখানে সরকারিভাবে ১০টি প্রধান ধর্মকে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে। এই যুক্তিতেই এখানে দুর্গাপুজোর ছুটি পাওয়া তেমন কঠিন হবে না বলে মনে করছেন আরেকদল।