যদিও খামেনেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের মুখ ছিলেন, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার কাঠামোর ভিতরে লারিজানির ভূমিকা এবং তাঁর মৃত্যুর সময়কাল, দুটিই যুদ্ধের গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

দুই নেতার মৃত্যুতে কী হতে চলছে ইরানের ভবিষ্যৎ?
শেষ আপডেট: 18 March 2026 15:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একের পর এক টার্গেটেড হামলা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আলি লারিজানি (Ali Larijani)-র হত্যাকাণ্ড হয়তো সেই মোড় ঘোরানো ঘটনা, যা এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘ ও জটিল করে তুলতে পারে (Ali Larijani death impact Iran war)। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (Ali Khamenei)-র মৃত্যু থেকে যে শুরুটা হয়েছিল, লারিজানির মৃত্যু সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে (Iran power structure)।
যদিও খামেনেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের মুখ ছিলেন, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার কাঠামোর ভিতরে লারিজানির ভূমিকা এবং তাঁর মৃত্যুর সময়কাল, দুটিই যুদ্ধের গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
খামেনেই-পরবর্তী ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইজরায়েল যৌথ হামলায় খামেনেই নিহত হওয়ার পর সেটিকে ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের অনেককেই চমকে দিয়ে ইরানের ক্ষমতা কাঠামো দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নেয়।
একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয় এবং ক্ষমতার ভার সরে যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দিকে, বিশেষ করে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মতো সংস্থার কাছে।
বিভিন্ন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও আগেই বলা হয়েছিল, ইরানের শাসনব্যবস্থা বহুস্তরীয় হওয়ায় শুধু সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দিলেই গোটা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না। অর্থাৎ, খামেনেইয়ের মৃত্যু প্রতীকীভাবে বড় ধাক্কা হলেও কাঠামোগতভাবে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
কেন আলাদা লারিজানির ভূমিকা
আলি লারিজানি শুধু একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিকই ছিলেন না, তাঁকে অনেকেই ‘ব্যাকরুম পাওয়ারব্রোকার’ এবং ইরানের নিরাপত্তা নীতির অন্যতম স্থপতি হিসেবে বর্ণনা করেন। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করতেন।
তাই শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁর প্রভাব ছিল বহুস্তরীয়। এই জায়গাতেই মূল পার্থক্য - খামেনেই ছিলেন ক্ষমতার প্রতীক, কিন্তু লারিজানি সেই ক্ষমতাকে কার্যকর রাখার মূল চালিকাশক্তি।
নেতৃত্ব নয়, সমন্বয়ে বড় ধাক্কা
বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানির মৃত্যু ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় আরও তাৎক্ষণিক ও বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি করেছে।
এতে দেশের বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, ফলে চাপের মুখে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে। বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গাতেই বড় ধাক্কা লেগেছে। কারণ, লারিজানি ছিলেন সেই কেন্দ্রবিন্দু, যার ওপর নির্ভর করেই ইরানের পাল্টা কৌশল গড়ে উঠছিল।
কেন যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতে পারে
পরিস্থিতি আরও জটিল করার সম্ভাবনাও রয়েছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, দেশের শাসনব্যবস্থা কোনও এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
তাঁর কথায়, “ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী। কোনও একজন ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সেই কাঠামোকে প্রভাবিত করে না।” তবুও বাস্তবে লারিজানির অনুপস্থিতি কয়েকটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে—
১. ডিসেন্ট্রালাইজড সংঘাত বৃদ্ধি
সমন্বয়ের অভাবে IRGC ইউনিট বা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলি নিজেদের মতো করে পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. কট্টরপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধি
লারিজানি তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে আরও কট্টর অবস্থান নেওয়া গোষ্ঠীগুলির প্রভাব বাড়তে পারে, ফলে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ কমবে।
৩. আলোচনার পথ সংকীর্ণ
গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগে লারিজানির মতো ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন। সেই জায়গা ফাঁকা হয়ে গেলে শান্তি আলোচনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
মোড় ঘোরানো মুহূর্ত?
খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরই ইরান জোরালো পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালীতে প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ব তেল সরবরাহেও প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। কিন্তু লারিজানির মৃত্যু যুদ্ধকে অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে - যেখানে অনিশ্চয়তা বেশি, নিয়ন্ত্রণ কম।
সহজভাবে বললে খামেনেইয়ের হত্যাকাণ্ড ছিল “মাথা কেটে ফেলা”, আর লারিজানির মৃত্যু সেখানে যেন গোটা সিস্টেমের “স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত”। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার বদলে আরও দীর্ঘ, জটিল এবং অনির্দেশ্য হয়ে ওঠার আশঙ্কাই এখন বেশি।