আলি লারিজানি ছিলেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক “ইনসাইডার”। প্রায় ৫ দশকের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন টানা ১২ বছর।
.jpg.webp)
নিহত ইরানের নিরাপত্তা প্রধান (ফাইল ছবি )
শেষ আপডেট: 18 March 2026 10:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একের পর এর ইরানের শীর্ষ নেতাকে খতম করছে ইজরায়েল। ইজরায়েলের (Israel Iran War) বিমান হামলায় এবার নিহত হয়েছেন ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আলি লারিজানি (Ali Larijani)। তাঁর মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আল জাজিরা ও সিএনএন-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ছিলেন ইরানের নিরাপত্তা নীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কার্যত দেশের মুখ্য কৌশল নির্ধারক।
কে ছিলেন আলি লারিজানি? (Who was Ali Larijani?)
আলি লারিজানি ছিলেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক “ইনসাইডার”। প্রায় ৫ দশকের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন টানা ১২ বছর। পারমাণবিক আলোচনায় ইরানের প্রধান মুখও ছিলেন লারিজানি। তা ছাড়া ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরে (IRGC)-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, লারিজানি ছিলেন এমন এক নেতা যিনি রাজনীতি, সামরিক ও কূটনীতির মধ্যে সেতুবন্ধন করতে পারতেন।
লারিজানি শুধু রাজনীতিবিদই নন, তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদও। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি করেছিলেন তিনি। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টে-এর উপর গবেষণা ছিল তাঁর। গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে শিক্ষিত ছিলেন। এই কারণেই তাঁকে অনেকে বলতেন, ‘দার্শনিক-রাজনীতিক’।
আল জাজিরা-র তথ্য অনুযায়ী, এমনিতে লারিজানি ছিলেন বেপরোয়া। যুদ্ধের মধ্যে প্রকাশ্য সভায় যোগ দিচ্ছিলেন। ইজরায়েলের এক বিমান হামলায় মৃত্যু হয়েছে ইরানের এই শীর্ষ সারির নেতার। ইরানের সরকারি সূত্র জানিয়েছে, তাঁর সঙ্গে ছেলে ও নিরাপত্তাকর্মীরাও হামলায় মারা গেছে।
সিএনএন-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লারিজানি ছিলেন—ইরানের ডি ফ্যাক্টো (প্রকৃত) নেতা, বিশেষত আয়াতোল্লাহ খামেনেইর মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ ছিলেন তিনি। যুদ্ধ ও কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখার ক্ষমতা ছিল তাঁর। জার্মান ইনস্টিটিউটের গবেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, “এই ধরনের বহুমুখী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নেতাকে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর মৃত্যু—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে। কারণ লারিজানির মৃত্যুর পর শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা আরও কঠিন করে তুলতে পারে ইরান। কেননা আর ভারসাম্যের কূটনীতি বজায় রাখার কেউ তেমন নেই তেহরানে। লারিজানি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্রিত করে সম্ভাব্য সমঝোতার পথে আনতে পারতেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই প্রক্রিয়া আরও জটিল হবে।
আল জাজিরা জানাচ্ছে, লারিজানি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছেন যাদের অনেকেই ইরানের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তাঁর ভাই সাদেক লারিজানি ছিলেন বিচারবিভাগের প্রধান। পরিবারটি এতটাই প্রভাবশালী যে একসময় তাদের বলা হত ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’।
যুদ্ধের শুরুতে তুলনামূলকভাবে সংযত থাকলেও পরে তাঁর ভাষণ হয়ে ওঠে অত্যন্ত কড়া ও আক্রমণাত্মক। তিনি সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য ইরানের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছিলেন।
লারিজানির মৃত্যু নতুন করে কয়েকটি প্রশ্ন তুলে দিল—ইরানের নেতৃত্বে কে নেবে তাঁর জায়গা? যুদ্ধ কি আরও তীব্র হবে? নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও দূরে সরে যাবে?