টাং স্বীকার করেছিলেন, ওই সময়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। বেঁচে থাকার ইচ্ছে চলে যাচ্ছিল। তবু পরিবারের মুখ আর পাওনাদারদের কথা ভেবে তিনি স্থির করেন - শেষ নয়, জীবন আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।

টাং জিয়ান
শেষ আপডেট: 24 October 2025 19:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উনুন থেকে ধোঁয়া উঠছে, সসেজের (Sausage) গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। ভিড় জমেছে মানুষের। আর সেই ভিড়ের মাঝখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন টাং জিয়ান (Tang Jian)। একসময় তিনটি রেস্তরাঁর মালিক, আজ রাস্তার ধারে সসেজ বিক্রেতা। তবে এই ‘বিক্রেতা’ শব্দটা তাঁর জন্য আর প্রযোজ্য নয়। কারণ, এই ৫৭ বছরের মানুষটি এখন দিনে রোজগার করেন প্রায় ২০০,০০০ ইউয়ান - ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা!
চিনের (China) শানডং প্রদেশের উপকূলবর্তী শহর কিংদাও - এখান থেকেই টাং জিয়ানের জীবনের রূপকথা শুরু এবং শেষও হয়। তবে এই জায়গা থেকেই তাঁর দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে।
২০০০ সালের গোড়ায় টাং জিয়ানের রেস্তরাঁগুলি (Restaurants) ছিল কিংদাও শহরের আলোচনার কেন্দ্র। প্রতি মাসে তিন মিলিয়ন ইউয়ান পর্যন্ত আয় হত তাঁর ব্যবসা থেকে, যা ভারতীয় মুদ্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার সমান। কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত সব বদলে দেয়। অচেনা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, বিশেষত ম্যাপল কাঠের ব্যবসায় হাত দিয়েই নিজের সর্বস্ব খুইয়েছিলেন তিনি।
২০১৫ সালের মধ্যে টাং-এর ঋণ (Loan) বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ ৫৬ কোটি টাকারও বেশি। দেউলিয়া (Bankrupt) ঘোষণা করা হয় তাঁকে। টাং-কে বিক্রি করতে হয় সব সম্পত্তি, বন্ধ করতে হয় রেস্তরাঁ। ভেঙে যায় তাঁর সংসারও।
পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে টাং স্বীকার করেছিলেন, ওই সময়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। বেঁচে থাকার ইচ্ছে চলে যাচ্ছিল। তবু পরিবারের মুখ আর পাওনাদারদের কথা ভেবে তিনি স্থির করেন - শেষ নয়, জীবন আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।
যেমন ভাবা, তেমন কাজ। ঠিক তিন বছর পর ২০১৮ সালে, একেবারে নতুন করে শুরু করলেন টাং জিয়ান। নিজেরই আগের এক রেস্তরাঁর কয়েকশো মিটার দূরে একটি ছোট সসেজ স্টল (Sausage Stall) খোলেন তিনি। ব্যস, সেখান থেকেই জীবনের চাকা কার্যত উল্টো ঘুরতে শুরু করে তাঁর।
৩৫ ইউয়ান (প্রায় ৪৩০ টাকা) দামের এক সসেজ মেশিন আর ৭৪ বছরের মায়ের সহায়তায় সেই নতুন অধ্যায় গতি পায়। তবে মানুষের বিশ্বাস জেতা সহজ ছিল না। কিন্তু সেই জায়গাতেও বুদ্ধি খরচ করে বাজিমাত করেন টাং।
নামী সুপারমার্কেট থেকে উচ্চমানের মাংস কিনে তার বিলের কপি ঝুলিয়ে রাখতেন নিজের দোকানের সামনে। মানুষের নজরে এল তাঁর সততা, আর সেই সততার জেরেই টাং-এর দোকানের গল্প ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
কয়েক বছরের মধ্যেই টাং জিয়ানের ছোট স্টল পরিণত হয় এক বিশাল ব্র্যান্ডে। এখন তাঁর নিজস্ব কারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই টন সসেজ তৈরি হয়। দেশের নানা শহরে তাঁর দোকান ছড়িয়ে পড়েছে। বড় বড় শপিং মলে রয়েছে আউটলেট।
কোভিড মহামারির সময়ও থেমে থাকেননি টাং। লকডাউনের বাজারে যখন বহু ব্যবসা বন্ধ, তিনি তখন শুরু করেন লাইভ-স্ট্রিম বিক্রি। তাঁর প্রাণবন্ত কথা আর হাসিমাখা মুখের কারণে স্রেফ এক সম্প্রচারে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১.২ কোটি টাকার খাবার! আজ অনলাইন তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা ১২ লক্ষেরও বেশি।
এখনও টাং নিজের উপার্জনের বড় অংশ দিয়ে পুরনো ঋণ শোধ করেন। পরিকল্পনা করেছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে সমস্ত দেনা শোধ করবেন।
আজ চিনজুড়ে টাং জিয়ান এক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। পরিশ্রম, বিনয়, আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তাঁর গল্প প্রমাণ করে, জীবনে কখনও কখনও হেরে যাওয়া যায়, তবে হার মানতে নেই।