বালুচ বিদ্রোহীরা একযোগে প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালায়। লক্ষ্যবস্তু ছিল সাধারণ মানুষ, একটি হাই সিকিউরিটি জেল, পুলিশ স্টেশন এবং আধাসামরিক বাহিনীর শিবির।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক দশকগুলিতে এটি জঙ্গিদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
শেষ আপডেট: 1 February 2026 10:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাকিস্তানের অশান্ত দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশ বালুচিস্তানে অন্তত ১২টি জায়গায় আত্মঘাতী হানা ও সেনা-বিদ্রোহী সংঘর্ষে অন্তত ১২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শনিবার পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই হামলায় ৩৩ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ১৮ জন সাধারণ মানুষ এবং ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। পাল্টা অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনী ৯২ জন বালুচ বিদ্রোহীকে হত্যা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক দশকগুলিতে এটি জঙ্গিদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
সেনা সূত্রে জানা গিয়েছে, বালুচ বিদ্রোহীরা একযোগে প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালায়। লক্ষ্যবস্তু ছিল সাধারণ মানুষ, একটি হাই সিকিউরিটি জেল, পুলিশ স্টেশন এবং আধাসামরিক বাহিনীর শিবির। যদিও বালুচিস্তান ও পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে বালুচ বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানি তালিবান নিয়মিত নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালায়। এত বড় পরিসরে সমন্বিত আক্রমণ খুবই বিরল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় বালুচিস্তানে মোট ১৩৩ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৯২ জন মারা যায় শুধু শনিবারই।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি দাবি করেছেন, এই হামলার পিছনে ভারতের মদত রয়েছে। তবে নয়াদিল্লি এই অভিযোগের কোনও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। অতীতেও ভারত এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। পাকিস্তানে নিষিদ্ধ বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। হামলার সময় কয়েকটি ব্যাঙ্কে লুটপাট চালানো হয়, একটি পুলিশ স্টেশন ও বহু গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
বিএলএ প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, নারী যোদ্ধারাও হামলায় অংশ নিয়েছে। যা সংগঠনের প্রচার কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে, যাতে নারীদের ভূমিকা তুলে ধরা যায়। বালুচিস্তানের স্বঘোষিত সরকারের মুখপাত্র শাহিদ রিন্দ জানিয়েছেন, অধিকাংশ হামলাই নিরাপত্তা বাহিনী ব্যর্থ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এর আগের দিনই সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, প্রদেশের দুইটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৪১ জন বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়েছে।
প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে লিখেছেন, নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিদের তাড়া করছে। তাঁর দাবি, গত এক বছরে প্রায় ৭০০ জন বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। শনিবার ভোরে জঙ্গিরা রেললাইন ধ্বংস করায় পাকিস্তান রেলওয়ে বালুচিস্তান থেকে দেশের অন্যান্য অংশে ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। হামলার লক্ষ্য ছিল পুলিশ, জেল, আধাসামরিক বাহিনী ও সাধারণ যাত্রী।
প্রাদেশিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী বখত মোহাম্মদ কাকার জানান, প্রায় একই সময়ে প্রদেশজুড়ে হামলা শুরু হয়। কোয়েটায় পুলিশের একটি গাড়িতে গ্রেনেড হামলায় দুই পুলিশকর্মী নিহত হন। পরিস্থিতির জেরে রাজ্যের সব হাসপাতালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। মাস্তুঙ জেলায় একটি জেলে হামলা চালিয়ে ৩০ জনের বেশি বন্দিকে মুক্ত করে দেয় জঙ্গিরা। নুশকি জেলায় আধাসামরিক বাহিনীর সদর দফতরে হামলার চেষ্টা হলেও তা প্রতিহত করা হয়।
ডালবন্দিন জেলায় এক সরকারি আধিকারিকের দফতরে গ্রেনেড ছোড়া হলেও দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়ায় হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। বালিনচা, টুম্প ও খারান জেলায় নিরাপত্তা পোস্টে হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পাশনি ও গোয়াদরে বাসে যাত্রীদের অপহরণের চেষ্টাও চালানো হয়। বিএলএ পাকিস্তানে নিষিদ্ধ এবং আমেরিকার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। পাকিস্তানের দাবি, এই সংগঠন ভারতের সমর্থন পায়। যে অভিযোগ ভারত বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। পাকিস্তান আরও অভিযোগ করেছে, বালুচ বিদ্রোহী ও পাকিস্তানি তালিবান আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। তবে কাবুল এই অভিযোগ নাকচ করেছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর পরিচালক আবদুল্লাহ খান সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, বালুচিস্তানে একদিনে এত সংখ্যক জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) তাদের হামলা বাড়িয়েছে। টিটিপি আলাদা সংগঠন হলেও আফগান তালিবানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যারা ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসে। দীর্ঘদিন ধরেই বালুচিস্তান পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।