কুখ্যাত এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ হওয়াকে ঘিরে ওঠা রাজনৈতিক ঝড়-বিতর্কের দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে দিতেই ভেনেজুয়েলায় হঠাৎ সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
.jpeg.webp)
প্রকাশিত নথিতে প্রয়াত যৌন অপরাধী ও শিশু-নারী পাচারকারী জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে বহু রাজনীতিকের নাম উঠে এসেছে।
শেষ আপডেট: 5 January 2026 18:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কুখ্যাত এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ হওয়াকে ঘিরে ওঠা রাজনৈতিক ঝড়-বিতর্কের দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে দিতেই ভেনেজুয়েলায় হঠাৎ সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিযোগ, যৌন অজাচার থেকে সংবাদের নজর ঘোরাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে আমেরিকায় নিয়ে আসাই ছিল এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। এই ইস্যুতে ট্রাম্প একা নন, তাঁর পূর্বসূরী বিল ক্লিনটন, জর্জ বুশ ও রোনাল্ড রেগনও একই পন্থা অবলম্বন করেছিলেন।
বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপে অনীহা এবং নিজেকে ‘আট ও এক-চতুর্থাংশ যুদ্ধের সমাধানকারী’ বলে দাবি করা ট্রাম্পের জন্য ৩ জানুয়ারির এই অভিযান যেমন বিস্ময়কর, তেমনই দ্রুত সফল। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই তাঁর নিজের সমর্থক শিবিরে অসন্তোষ বাড়ছিল এপস্টাইন ফাইল প্রকাশে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।
প্রকাশিত নথিতে প্রয়াত যৌন অপরাধী ও শিশু-নারী পাচারকারী জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে বহু রাজনীতিকের নাম উঠে এসেছে। সেই তালিকায় ট্রাম্পের নাম থাকায় ম্যাগা (MAGA) শিবিরের একাংশও ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। সামনে আমেরিকায় মধ্যবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াই, এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের দরকার ছিল একেবারে ভিন্ন ধরনের শিরোনাম। সমালোচকদের মতে, সেই প্রয়োজন মেটাতেই ‘বলির পাঁঠা’ হয়েছেন মাদুরো।
সময় নির্বাচন কি কাকতালীয়, নাকি অঙ্ক কষা চাল?
ভেনেজুয়েলা অভিযান শুরুর আগেই ইলিনয়সের গভর্নর জে বি প্রিটজকার সতর্ক করেছিলেন, এপস্টাইন বিতর্ক থেকে নজর ঘোরাতে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে পারেন। হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরাও প্রশ্ন তুলেছেন, এপস্টাইন ফাইল সংক্রান্ত সময়সীমার সঙ্গে মিলিয়ে এই হামলার ‘সুবিধাজনক’ সময় নির্বাচন নিয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেমস কারভিল সরাসরি অভিযোগ করেন, অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও এপস্টাইন কেলেঙ্কারি থেকে দৃষ্টি সরাতেই ভেনেজুয়েলা অভিযান ট্রাম্পের মরিয়া চেষ্টা। কেউ কেউ আবার বলছেন, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থে এই অভিযান চালিয়ে ট্রাম্প মার্কিন সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন দু’টিকেই লঙ্ঘন করেছেন।
ডেমোক্র্যাট সাংসদ আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মন্তব্য, মাদক নয়, এপস্টাইন বিতর্ক থেকেই নজর ঘোরানোই এই অভিযানের আসল উদ্দেশ্য। ডেমোক্র্যাটদের একাংশ এটিকে তেলস্বার্থে চালানো ‘সরকার বদলের অভিযান’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। এমনকী রিপাবলিকান সাংসদ থমাস ম্যাসিও এই অভিযানকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে কটাক্ষ করেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘এপস্টাইন –ভেনেজুয়েলা যোগসূত্র’
সোশ্যাল মিডিয়ায় জোরাল দাবি উঠেছে—ভেনেজুয়েলা হামলা আসলে এপস্টাইন ফাইল বিতর্ক থেকে নজর সরানোর কৌশল। এক্স (সাবেক টুইটার)-এ অনেকেই লিখেছেন, ভেনেজুয়েলায় হামলা হলে মানুষ এপস্টাইন ফাইল ভুলে যাবে। উল্লেখযোগ্যভাবে, হামলার পরপরই অনলাইন সার্চ ট্রেন্ডে ‘Epstein files’ শব্দবন্ধের খোঁজ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। অনলাইন মন্তব্যে কেউ বলছেন, সবটাই এপস্টাইনের জন্য, কেউ আবার মনে করছেন, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলভাণ্ডারই হামলার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য। যদিও ট্রাম্প সমর্থকদের একাংশ এসব অভিযোগকে উড়িয়ে দিচ্ছেন।
এপস্টিন ফাইলে ট্রাম্পের নাম
এপস্টাইন ফাইলে ট্রাম্পের নাম একাধিকবার উঠে এসেছে— মূলত প্রয়াত অর্থলগ্নিকারীর সামাজিক মহলের সদস্য হিসেবে। এখনও পর্যন্ত নতুন কোনও ফৌজদারি অভিযোগ না উঠলেও, ট্রাম্পের বিচার দফতরের ওপর চাপ বাড়ছে নথি কাটছাঁট করে ব্যাখ্যা করা ও আরও তথ্য প্রকাশের দাবিতে। এই চাপের মধ্যেই ভেনেজুয়েলা অভিযান ঘিরে প্রশ্ন আরও জোরাল হয়েছে।
তবে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের আগ্রহ দেখিয়ে আসছিলেন। প্রথম মেয়াদ থেকেই তিনি সে দেশের বিপুল তেলসম্পদের কথা উল্লেখ করে আসছেন। এপস্টাইন বিতর্ক তুঙ্গে ওঠার সময়ই ভেনেজুয়েলা নিয়ে তাঁর ভাষা আরও আক্রমণাত্মক হয়। বিতর্কিত তেলক্ষেত্র নিয়ে হুমকি, এমনকী যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভেনেজুয়েলানদের বিরুদ্ধে ‘এলিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট’ প্রয়োগের কথাও তোলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এগুলোই সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।
দেশীয় সংকটে বিদেশে যুদ্ধ: আমেরিকার পুরনো গল্প
দেশের ভিতরে যখনই কোনও কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক চাপ বা অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়েছে আমেরিকা, তখনই বিদেশে সামরিক অভিযান সেদেশের ইতিহাসে নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে মোনিকা লিউনস্কি কেলেঙ্কারি ও ইমপিচমেন্টের মুখে থাকা প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন হঠাৎই সুদান ও আফগানিস্তানে আল কায়েদা ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দেন। আফ্রিকায় মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দাবি করা হলেও ট্রাম্পের পার্টির রিপাবলিকানরা একে ‘ওয়াগ দ্য ডগ’ কৌশল বলে কটাক্ষ করেছিলেন।
২০০০-এর দশকের শুরুতে ৯/১১ হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার সমালোচনার মুখে থাকা জর্জ ডব্লু বুশ প্রশাসন ইরাকের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগ তুলে যুদ্ধের পথে হাঁটে, যার অস্তিত্ব পরে প্রমাণিত হয়নি। ১৯৮৬ সালে রোনাল্ড রেগন লিবিয়ায় বোমা হামলা চালান। বার্লিনে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখানো হলেও, সেই সময় তাঁর প্রশাসন ইরান–কন্ট্রা কেলেঙ্কারি, অর্থনৈতিক চাপ ও এইডস সংকট নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ছিল।
সমালোচকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অভিযানও সেই পুরনো পথেরই নতুন অধ্যায়।