ডা. মন্দানা বললেন, "অঙ্গ দান কেবলমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার প্রকাশ। প্রতিটি দান মানে নতুন এক জীবন।”

World Organ Donation Day 2025
শেষ আপডেট: 13 August 2025 18:19
কলকাতা: আইসিইউ-এর নীরবতা যেন রাতের গভীরে ছড়িয়ে পড়া চাঁদের মৃদু আলোর মতো। নরম অথচ ভারী। সেই শান্ত এবং গভীর মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ডা. কায়াপান্ডা মুথানা মান্দানা চোখ বন্ধ করলেন একটুখানি, যেন মিলিয়ে নিলেন চিকিৎসকের দায়িত্ব আর মানবিক আবেগের সীমারেখা। চোখের কোণে জমা হওয়া যে অনুভূতির সামনে কোনও যুক্তি টেকে না, সেই অনুভূতির জোরেই আজ তাঁর কণ্ঠস্বর চিকিৎসার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের অন্তরের ধ্বনি হয়ে উঠেছে।
ফোর্টিস হাসপাতালের কার্ডিওথোরাসিক ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের পরিচালক ও ভারতের অঙ্গ প্রতিস্থাপন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ডা. মান্দানা বললেন, "অঙ্গ দান কেবলমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার প্রকাশ। প্রতিটি দান মানে নতুন এক জীবন।”
বিশ্ব অঙ্গ দান দিবস ২০২৫-এর মূল বার্তা— "Answering the Call"। এটা শুধু ডাক্তারদের জন্য নয়, প্রত্যেক মানুষের জন্যই একটি আহ্বান। এই ডাকে সাড়া দেওয়া মানে, মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে জীবনকে ফিরিয়ে আনা।
ভারতের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পথচলা
নয়ের দশকে ভারতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিকে বছরে গড়ে মাত্র ২০০–২৫০টি ট্রান্সপ্লান্ট হত। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। তবুও, ডা. মান্দানা মনে করিয়ে দেন, এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে অসংখ্য গল্প, দাতাদের মহৎ সিদ্ধান্ত, পরিবারের সাহস এবং চিকিৎসকদের অটল নিষ্ঠা।
তাঁর ভাষায়, “একজন অঙ্গদাতা অন্তত তিনটি জীবন বাঁচাতে পারেন। ভাবুন—এক শিশুর হাসি ফিরে আসা, এক বৃদ্ধের পুনরায় হাঁটতে পারা, বা একজন দমকলকর্মীর নতুন করে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ—সবই এক হৃদয়ের দানে সম্ভব।”
যখন মেশিন থেমে যায়, তখনও হৃদয় কথা বলে
অঙ্গ দানের পথে সবচেয়ে কঠিন ধাপ হল ‘ব্রেন ডেথ’ বোঝানো। ডা. মান্দানার অভিজ্ঞতায়, “আইসিইউ-তে পরিবারের কাছে বলতে হয়, প্রিয়জন আর ফিরবেন না। সে মুহূর্তে যেন পুরো আকাশ ভেঙে পড়ে মাথায়।” এই সময়ে ট্রান্সপ্লান্ট কো-অর্ডিনেটর, নার্স ও চিকিৎসা কর্মীরা শুধুই পেশাদার নন, তাঁরা হয়ে ওঠেন সহমর্মিতার আলো দেখানো পথপ্রদর্শক।
মন্দানা জোর দিয়ে বলেন, “এই লড়াই শুধুমাত্র ডাক্তারদের নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের দায়িত্ব। মিডিয়া, শিক্ষক, ছাত্র, আইনপ্রণেতা, ধর্মীয় নেতা—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
নিঃশব্দ বীরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
যাঁরা প্রিয়জন হারিয়েও অন্যকে বাঁচাতে রাজি হন, তাঁদের ডা. মান্দানা বলেন “নিঃশব্দ বীর”। তাঁর মতে, “তাদের এই সিদ্ধান্ত এক মহৎ আত্মত্যাগ, যা মানবতার প্রকৃত উদাহরণ।”
আপনার হাতেও ভবিষ্যতের আলো
ডা. মান্দানা মনে করিয়ে দেন, ডাক্তার না হলেও প্রত্যেকেই এই ডাকে সাড়া দিতে পারেন। কীভাবে? অঙ্গদাতা হিসেবে নাম নথিভুক্ত করুন। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সচেতন করুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা ছড়িয়ে দিন। ভুল ধারণা ভাঙার জন্য আলোচনা শুরু করুন।
তাঁর মতে, “প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ একদিন বড় পরিবর্তনের জন্ম দিতে পারে।”
প্রতিটি হৃদয় একটি নতুন সূর্যোদয়
ডা. মান্দানার শেষ বার্তা, “মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সেই মৃত্যু যদি অন্যের কাছে জীবনের আলো ফিরিয়ে দিতে পারে, সেটাই সত্যিকারের জয়। আমাদের প্রয়োজন সাহসী পরিবার, সহানুভূতিশীল সরকার, এবং মানবিক সমাজ।”
আইসিইউ-এর শীতলতার মাঝেও যে প্রতিটি হৃদয় প্রতিস্থাপন ঘটে, সেটাই যেন নতুন দিনের প্রথম আলো।