দেশে ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভুগছেন। শুধু হাড় দুর্বল হওয়াই নয়, কম ভিটামিন ডি-এর প্রভাব পড়ছে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, মেজাজ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপরও।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 15 October 2025 15:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত এমন এক দেশ, যেখানে বছরের প্রায় প্রতিদিনই সূর্যের আলো থাকে। তবু বর্তমান পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। আশ্চর্যের বিষয়, দেশের ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভুগছেন। যথেষ্ট পরিমাণ রোদে থাকার সুযোগ সত্ত্বেও কেন এই ঘাটতি?
আধুনিক জীবনযাত্রা, ঘরবন্দি রুটিন, সানস্ক্রিন, এবং বায়ুদূষণ - সব মিলিয়ে আমাদের 'সানশাইন ভিটামিন'-এর থেকে ক্রমে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে হাড়ের স্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। প্রভাবিত হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যও।
কী বলছে গবেষণা?
ভারতের আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকা সত্ত্বেও, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭০–৯০ শতাংশ মানুষ ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিতে ভুগছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় পুষ্টিগত ঘাটতিগুলির মধ্যে একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভিটামিন ডি শরীরের জন্য শুধু একটি ভিটামিন নয় - এটি হরমোনের মতো কাজ করে। এটি ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, হাড় মজবুত রাখা, মস্তিষ্ক ও ইমিউন সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এর অভাবে ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ, পেশির ব্যথা বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
সূর্যের দেশেও কেন এমন সংকট?
বেশিরভাগ শহুরে ভারতীয় দিনের আলোতে অফিস, ক্লাসরুম বা জিমে থাকেন। অথচ কাচের জানালা UVB রশ্মি প্রায় সম্পূর্ণ আটকে দেয়, যা ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি করতে সাহায্য করে।
ডার্মাটোলজিস্টরা বারবার ত্বকরক্ষার জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহারের কথা বলছেন। তারও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। তবে SPF ৩০-এর সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে UVB রশ্মির ৯৫% পর্যন্ত রোধ করা সম্ভব। এর সঙ্গে শরীর ঢাকা পোশাক ও দূষণ মিলে সূর্যের উপকারিতা আরও কমিয়ে দেয়।
Journal of Photochemistry and Photobiology B-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতে PM ২.৫ মাত্রার বেশি হওয়ায় সূর্যের UVB রশ্মি ৬০%-এর বেশি কমে যায়।
ভারতীয়দের ত্বকে মেলানিনের মাত্রা বেশি থাকে, যা প্রাকৃতিকভাবে সূর্যের রশ্মি ফিল্টার করে দেয়। ফলে ফর্সা ত্বকের তুলনায় চাপা ত্বকের মানুষদের ৩-৫ গুণ বেশি সময় রোদে থাকতে হয় পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য।
রাঁচির রাজেন্দ্র ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসের (RIMS) জরুরি বিভাগের চিকিৎসক গগন গুঞ্জন বলেন, “অনেক সময় রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে সূর্যালোকের অভাবেই তাঁদের শরীরে ভিটামিন ডি কমে যাচ্ছে। দৈনন্দিন কিছু সহজ পরিবর্তন - যেমন নিয়মিত রোদে হাঁটা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন হলে সাপ্লিমেন্ট - এই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করতে পারে।”
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিতে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি
শুধু হাড় দুর্বল হওয়াই নয়, কম ভিটামিন ডি-এর প্রভাব পড়ছে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, মেজাজ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপরও।
National Institutes of Health (NIH)-এর রিপোর্ট বলছে, শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষে ভিটামিন ডি-এর রিসেপ্টর থাকে। যখন এই রিসেপ্টর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন প্রদাহ বাড়ে, পেশি দুর্বল হয় এবং মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ অভিনব মিশ্র, ভগবান মহাবীর মণিপাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট, বলেন, “গত কয়েক বছরে ভিটামিন ডি ঘাটতির রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অনেকেই শরীরব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা বা ক্লান্তি নিয়ে আমাদের কাছে আসেন আর তাঁদের রক্তপরীক্ষায় এই বিশেষ ভিটামিনের ঘাটতি ধরা পড়ে।”
কতক্ষণ রোদে থাকা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে অন্তত তিন দিন, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে ১৫-২০ মিনিট খোলা রোদে থাকা দরকার, বিশেষ করে হাত-পা খোলা রেখে। একদম সকালে বা বিকেলের সূর্যালোকে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায় না।
তবে জায়গা, বাতাসের কোয়ালিটির প্রভাব রয়েছে ভিটামিন ডি-এর সংশ্লেষণে। অনেকের ক্ষেত্রে, শুধু সূর্যালোক যথেষ্ট নয় বিশেষত শীত বা বর্ষায়।
ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI) এখন দুধ, সিরিয়াল ও তেলজাতীয় খাবারে ভিটামিন ডি ফোর্টিফিকেশন চালু করেছে, যাতে এই ঘাটতি কমানো যায়।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ করবে এই সব খাবার
কীভাবে বুঝবেন যে এবার সাপ্লিমেন্ট দরকার?
রক্তে ভিটামিন ডি মাত্রা ২০ এনজি/এমএল-এর নিচে থাকলে চিকিৎসকেরা সাধারণত কিছু সময়ের জন্য হাই ডোজের সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দেন।
ICMR-NIN 2021 নির্দেশিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক ৬০০–৮০০ IU ভিটামিন ডি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফ্যাটজাতীয় খাবারের সঙ্গে এটি খেলে শোষণ ভাল হয়। তবে অতিরিক্ত গ্রহণ করলে ক্যালসিয়াম বেড়ে গিয়ে বমি বা কিডনি সমস্যা হতে পারে।
ঘাটতির সাধারণ লক্ষণগুলি কী কী?
ডাঃ অভিষেক কে. রামাধিন, ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি, বলেন, “প্রতিদিন যে রোগীদের আমরা দেখি, তাঁদের প্রায় ৪০%-এরই ভিটামিন ঘাটতি থাকে। অনেক সময় উপসর্গ এত সূক্ষ্ম যে ডায়গনিসিসে ভুল হয়ে যেতে পারে।”
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
সরকারি উদ্যোগে এখন খাদ্যে ফোর্টিফিকেশন প্রকল্প আরও প্রসারিত হচ্ছে। গমের আটা, তেল ইত্যাদি পণ্যে ভিটামিন ডি যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশা, সচেতনতা ও সূর্যালোকের সঠিক ব্যবহার মিলিয়ে আগামী দশকে ভারত এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠবে।