
বিশ্ব তামাক-বিরোধী দিবসে হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার নিয়ে সচেতন করলেন ডাঃ শ্রেয়া ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: 31 May 2024 16:22
কনসালট্যান্ট, হেড অ্যান্ড নেক অঙ্কোলজি এবং মাইক্রোভাসকুলার সার্জেন
নারায়ণা হসপিটাল, হাওড়া
আজ আন্তর্জাতিক তামাক-বর্জন দিবস। ১৯৮৭ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর বার্ষিক সাধারণ সম্মেলনে প্রথম তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের বিপদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ততদিনে বিশ্বায়নের আগমনে তামাক একদিকে যেমন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মুদ্রা আয়ের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহারে অসুস্থতার বহরও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ১৯৮৮ সালে প্রথম এই নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে ৭ এপ্রিলকে 'বিশ্ব ধূমপান-বিরোধী দিবস' ও ৩১ মে তারিখকে 'বিশ্ব তামাক-বিরোধী দিবস' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
যে কোনও তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহারে ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেশি থাকে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের প্রকোপ। যার মধ্যে অন্যতম হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার। আর এর জন্য অনেকাংশেই দায়ী আমাদের লাইফস্টাইল।
হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার কী?
কোনও কারণে যখন শরীরের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে এবং শরীর যখন তাঁর উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন সেই কোষ টিউমারে পরিণত হয়। সেই টিউমার বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারকেই ক্যান্সার বলে। এই ম্যালিগন্যান্ট টিউমার যখন নাক, নাকের গহ্বর, সাইনাস, ঠোঁট, মুখগহ্বর, গলার ভেতরে ল্যারিংস বা স্বরযন্ত্র, লালাগ্রন্থি, থাইরয়েড ইত্যাদিতে হয় তখন তাকে হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার বলা হয়।
হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার কেন হয়?
এর প্রধান কারণ তামাক সেবন, ধূমপান এবং মদ্যপান। যাঁরা একই সঙ্গে তামাকজাত দ্রব্য সেবন ও মদ্যপান করেন, তাঁদের হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি।
একজন মানুষ কীভাবে বুঝবেন তিনি হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারে আক্রান্ত? বা প্রাথমিক পর্যায় এর কী কী উপসর্গ থাকে?
১) দীর্ঘদিন ধরে ঘা, যেটা কিছুতেই শুকতে চায় না
২) হঠাৎ করে দাঁত নড়া
৩) মাড়িতে ব্যথা
৪) মুখ দিয়ে রক্তপাত
৫) গলায় ব্যথা
৬) একদিকের নাক দিয়ে রক্তপাত বা নাক বন্ধ
৭) গলায় কোনও ফোলা ভাব বা ডিসচার্জ
৮) কন্ঠস্বরে পরিবর্তন
৯) খাবার গিলতে সমস্যা
এইধরনের কোনও উপসর্গ নজরে এলে একটুও সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রোগ নির্ণয় কীভাবে?
শুরু থেকেই হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দরকার। এ ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা খুবই জরুরি। হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার ওপিডে–তে আসা রোগীদের অধিকাংশকেই পরীক্ষা করে দেখা যায় তাঁরা মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টর্চের আলো দিয়ে মুখের অভ্যন্তর পরীক্ষা করে সন্দেহজনক কিছু অনুমান করতে পারেন।
গলার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে রয়েছে এন্ডোস্কোপি। এন্ডোস্কোপি দু’ভাবে করা যায়। ১. সরাসরি, যেটাকে বলে হপকিন্স শূন্য ডিগ্রি। যেটা সাধারণত ওপিডি–তেই করা হয় এবং ২. অনেক সময় ল্যারিঙ্গস্কোপি করতে হয়।
কানের ক্যান্সার শণাক্তকরণে রয়েছে ওটোস্কোপি।
কোথাও কোনও সন্দেহজনক কিছু নজরে এলে বায়োপ্সির পর রেডিওলজিস্টের কাছে যাবার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং রেডিওলজিস্টের তত্ত্বাবধানে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করা হয়। যে অংশতে হাড়ের নৈকট্য বেশি সেখানে সিটি স্ক্যান এবং যেখানে নরম টিস্যু রয়েছে যেমন জিভ, সেখানে এমআরআই করা হয়। বায়োপ্সির পর সিটি স্ক্যানে কোষের পরিবর্তনগুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
এর চিকিৎসা কী রয়েছে?
ক্যান্সার কোন স্টেজে বা পর্যায়ে রয়েছে এবং কোথায় হয়েছে সেই অনুযায়ী শুরু হয় চিকিৎসা। যে কোনও ক্যান্সারের চিকিৎসার মতো হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারের চিকিৎসা চলে সার্জারি, কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপির মাধ্যমে। মুখ গহ্বরের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে জরুরি সার্জারি, তারপর কেমো এবং রেডিওথেরাপি। জিভের পেছনে অর্থাৎ টনসিলের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সার্জারি করা হয় না, কেমো এবং রেডিওথেরাপির মাধ্যমে চলে চিকিৎসা। ল্যারিংস বা স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার একদম আর্লি স্টেজে বা প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে লেজার সার্জারি বা রেডিয়েশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। মাঝারি পর্যায়ে স্বরযন্ত্রকে বাঁচিয়ে চলে নন–সার্জিক্যাল চিকিৎসা। আর ক্যান্সার অ্যাডভান্স স্টেজে চলে গেলে তখন সার্জারি করতে হয়। গ্ল্যান্ড বা থাইরয়েড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে জরুরি সার্জারি।
হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারে সুস্থ হবার সম্ভাবনা কতটা?
এর সবটাই নির্ভর করছে ক্যান্সার কোন স্টেজে ধরা পড়েছে তার উপর। আর্লি বা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সুস্থ জীবনে ফেরার সম্ভাবনা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। আর তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেজে ধরা পড়লে এটা কমে দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে।
প্রতিরোধে কী করণীয়?
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়। হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার প্রতিরোধে সবার আগে দরকার ওরাল স্ক্রিনিং। ওরাল স্ক্রিনিংয়ে চিকিৎসক টর্চের সাহায্যে ভালো করে মুখের অভ্যন্তর পরীক্ষা করে দেখেন। উপরে বলা উপসর্গগুলো বা যাঁরা নিয়মিত তামক সেবন, ধূমপান, মদ্যপান করেন তাঁদের জন্য জরুরি এই স্ক্রিনিং। আর এই স্ক্রিনিং যে কোনও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ বা জেনারেল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছেও করাতে পারেন। হঠাৎ করে স্বাভাবিক কোষ ক্যান্সারে পরিণত হয় না, অনেকটাই সময় লাগে। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মধ্যে থাকলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে।
১) ধূমপান, মদ্যপান এবং যে কোনও তামাকজাত দ্রব্যের সেবন বন্ধ করতেই হবে।
২) অনেক সময় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস থেকেও ওরাল ক্যান্সার হয়। হিউম্যান প্যাপিলোমা প্রতিরোধে রয়েছে ভ্যাকসিন।
৩) বংশগত ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে সচেতন থাকতে হবে।
৪) পরিবেশে থাকা বিভিন্ন কার্সিনোজেনিক উপাদান থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।
হাওড়া নারায়ণা হেলথে হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যবস্থা কেমন রয়েছে?
এখানে রয়েছে কম্প্রিহেনসিভ ক্যান্সার কেয়ার ইউনিট। অর্থাৎ এক ছাদের নীচে রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা এবং সার্জারি–পরবর্তী রিহ্যাবিলিটেশন ব্যবস্থা রয়েছে। চিকিৎসাক দলে রেডিও–অঙ্কোলজিস্ট থেকে শুরু করে মেডিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট, সার্জেন সবাই থাকেন। যে কোনও ক্যান্সারের চিকিৎসায় সার্জারি করে দিলাম আর দায়িত্ব শেষ, এমনটা নয়। সার্জারি–পরবর্তী রিহ্যাবিলিটেশনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর এইসবের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে হাওড়া নারায়ণা হেলথে।