বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডা. ছেত্রীর জীবনযাপন বিশ্লেষণ করলে বিশ্বের দীর্ঘায়ুসম্পন্ন দেশগুলির জীবনধারার সঙ্গে তার আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়, বিশেষ করে জাপানের ক্ষেত্রে। জাপান বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘায়ুসম্পন্ন দেশ হিসেবে পরিচিত।

দীর্ঘায়ুর আড়ালে কী আছে?
শেষ আপডেট: 6 April 2026 18:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১০৬ বছর বয়সেও যিনি ছিলেন কর্মক্ষম (Active), শৃঙ্খলাবদ্ধ (Discipline) এবং মানসিকভাবে দৃঢ় —প্রয়াত কিংবদন্তি চিকিৎসক ডাঃ মণি ছেত্রীর (Dr. Mani Kumar Chetri ) জীবন যেন দীর্ঘায়ুর এক জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর প্রয়াণে শেষ হল এক শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়া এক অনন্য অধ্যায়, কিন্তু রেখে গেলেন এমন এক জীবনদর্শন, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
দীর্ঘায়ুর (Long life) রহস্য নিয়ে একাধিকবার কথা বলেছেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন, জিনগত বৈশিষ্ট্য বা genetic makeup একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর জন্ম কালিম্পং-এ। যদিও পরিবারের অন্য কেউ শতায়ু হননি, তবুও তিনি মনে করতেন তাঁর শরীরের বিশেষ জিনগত গঠনই এই দীর্ঘ জীবনের একটি কারণ হতে পারে। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করতেন—শুধু জিন নয়, জীবনযাপনই আসল।
ভোরে ওঠার অভ্যাস, নিয়মিত হাঁটা এবং সংযমী খাদ্যাভ্যাস—এই তিনকে তিনি দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র মনে করতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, “খাবার খাবে প্রসাদের মতো”, অর্থাৎ অল্প আহারই সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি। নিজেও সব ধরনের খাবার খেতেন (আমিষ-নিরামিষ), কিন্তু অল্প, এবং সেদ্ধ খাবারই বেশি পছন্দ করতেন।
১০৬ বছর বয়সে শারীরিক দুর্বলতা থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু তাঁর মানসিক শক্তি ছিল বিস্ময়কর। কোভিডের আগে পর্যন্ত নিয়মিত এসএসকেএম হাসপাতালে যেতেন এবং রোগী দেখতেন। ১০১ বছর বয়সেও স্বাচ্ছন্দ্যে রোগী দেখেছেন তিনি। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন, দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটত কর্মোদ্যমে। হতাশা বা ক্লান্তির কোনও স্থান ছিল না তাঁর জীবনে। সৌজন্য ও ভদ্রতার প্রতিমূর্তি ছিলেন তিনি।
তাঁর ছাত্রদের কথায়, ঘড়ি ধরে কাজ করতেন তিনি—এক মিনিটও সময়ের হেরফের হত না। সেই কারণেই একসময় প্রচলিত ছিল, “সবার আগে ওঠে কাক, আর তারও আগে ওঠেন ডা. মণি ছেত্রী।”
জাপানের দীর্ঘায়ুর রহস্য: কীভাবে মিল খুঁজে পাওয়া যায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডা. ছেত্রীর জীবনযাপন বিশ্লেষণ করলে বিশ্বের দীর্ঘায়ুসম্পন্ন দেশগুলির জীবনধারার সঙ্গে তার আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়, বিশেষ করে জাপানের ক্ষেত্রে। জাপান বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘায়ুসম্পন্ন দেশ হিসেবে পরিচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের দীর্ঘ জীবনের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে জীবনযাত্রার ধরণে। বিশেষ করে Okinawa Prefecture-কে বিশ্বের ‘ব্লু জোন’-গুলির মধ্যে ধরা হয়, যেখানে মানুষের আয়ু বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ তুলনামূলক কম।
সংযমী খাদ্যাভ্যাস
ওকিনাওয়ার মানুষের খাদ্যাভ্যাস মূলত উদ্ভিদ-নির্ভর। মিষ্টি আলু, টোফু, সামুদ্রিক শৈবাল এবং সীমিত পরিমাণ মাছ—এই সবই তাঁদের খাদ্যতালিকার অংশ। যা এরাজ্যের নিরিখে ভাত, ডাল, বিভিন্ন শাক-সবজি, হালকা রান্না করা তরকারি, সয়াবিন/পনির এবং পরিমিত মাছ গ্রহণের সমান — তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘Hara Hachi Bu’—অর্থাৎ ৮০ শতাংশ পেট ভরে খাওয়ার অভ্যাস। ডা. মণি ছেত্রীর সংযমী খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এর স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়।
জীবনের উদ্দেশ্য: ‘Ikigai’ ও কাজের আনন্দ
শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, জাপানি সংস্কৃতিতে ‘Ikigai’ বা জীবনের উদ্দেশ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকা মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। ডা. ছেত্রীর ক্ষেত্রেও তা স্পষ্ট—শেষ বয়স পর্যন্ত চিকিৎসা, পড়াশোনা এবং লেখালিখির মধ্যে নিজেকে সক্রিয় রেখেছিলেন তিনি।
সামাজিক বন্ধন পারে ভাল রাখতে
শুধু তাই নয়, সুস্থ থাকতে সামাজিক সংযোগ যা মানসিক চাপ কমায় ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব (Positive Mindset) গড়ে তোলে সেই সংযোগ দৃঢ় করা জরুরি। শতায়ু চিকিৎসক ডা. ছেত্রীও ১০০ বছর বয়স পেরিয়ে গেলেও এখন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে এর দৃঢ় ও গভীর সম্পর্ক গড়ে বজায় রেখে চলতেন। জীবনের প্রতি এই ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখা খুব দরকার। তবেই সুস্থভাবে অনেকদিন বেঁচে থাকা যায়। জাপানের ওকিনাওয়ায় ‘Moai’ নামে সামাজিক সমর্থনের একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে মানুষ একে অপরের পাশে থাকে আজীবন। সামাজিক সংযোগ মানসিকভাবে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি সেটা তাঁরা মেনে চলেন।
নিয়মিত শরীরচর্চা দরকার
জাপানের মানুষ নিয়মিত শরীরচর্চাকে (Daily Exercise) দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিয়েছেন। ‘Radio Taiso’ নামে সকালে ব্যায়ামের একটি অভ্যাস রয়েছে। তাই নিয়মিত হাঁটা এবং সক্রিয় জীবনযাপন সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়লেও ডাঃ ছেত্রী এই অভ্যাস ছাড়েননি। এর পাশাপাশি তাঁর জীবনে হতাশা বা ক্লান্তির কোনও স্থান ছিল না—এটাই তাঁর মানসিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
মানসিক প্রশান্তি: স্ট্রেস কমানোর অভ্যাস
জাপানি জীবনযাত্রায় মানসিক প্রশান্তি (Mental peace) ও স্ট্রেস (Stress) কমানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মেডিটেশন, চা-অনুষ্ঠান বা ইকেবানার মতো চর্চা মানুষকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখে। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং প্রবীণদের প্রতি সম্মান—এই বিষয়গুলিও জাপানি দীর্ঘায়ুর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজে সক্রিয় থাকা এবং সম্মান পাওয়া প্রবীণদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘায়ু কোনও একক কারণের ফল নয়। এটি তৈরি হয় জিনগত বৈশিষ্ট্য, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন, সংযমী খাদ্যাভ্যাস, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক সংযোগের সম্মিলনে। তাই এটা ঠিক যে, নিয়ম মেনে, সংযমে এবং সক্রিয় থেকে চললেই দীর্ঘায়ুর পথে এগোনো সম্ভব।
একটি শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়া জীবন থেমে গেলেও, ডাঃ ছেত্রীর জীবনযাপনের এই শিক্ষা আগামী প্রজন্মের কাছে হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার এক অমূল্য সম্পদ। জাপানীদের জীবনদর্শনও সেই একই কথা বলে, নিয়ম মেনে, সংযমে এবং সক্রিয় থেকে বাঁচলেই দীর্ঘায়ুর পথে এগোনো সম্ভব।