মাঝেমধ্যে পেশিতে ক্র্যাম্প হওয়া সাধারণত ক্ষতিকর নয়, কিন্তু সমস্যা (muscle cramps in legs) যখন ঘন ঘন ফিরে আসে, তখন তার কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।

শেষ আপডেট: 15 January 2026 14:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শীত পড়তেই নতুন এক সমস্যা। মাঝরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে গেল, পায়ের পেশিতে তীব্র টান (Leg muscle cramps at night)। ঘুমের দফারফা তো বটেই, কখন সারবে (How to fix muscle cramps in legs) তার কোনও ঠিক নেই। কখনও বা হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ ক্র্যাম্প (muscle cramp)। পায়ের পেশির এই খিঁচুনি (লেগ ক্র্যাম্প) খুব বিরল বা অস্বাভাবিক কিছু নয়, সব বয়সের মানুষের মধ্যেই কমন এবং নিউরোমাসকুলার সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম একটি।
খুব অস্বাভাবিক নয় বলেই অনেক সময় এই সমস্যাকে একটু বেশিই ‘স্বাভাবিক ব্যাপার’ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বারবার বা তীব্র খিঁচুনি হলে তা শরীরের ভেতরের কোনও ঘাটতি (lack of nutrients), জীবনযাপনের ভুল অভ্যাস (lifestyle bad habits) বা কোনও লুকিয়ে থাকা শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও (hidden health risks) হতে পারে, যা অবহেলা না করাই ভাল।
পেশির খিঁচুনি (muscle risk) হল এক বা একাধিক পেশির হঠাৎ, অনিচ্ছাকৃত সংকোচন, যা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। মাঝেমধ্যে খিঁচুনি হওয়া সাধারণত ক্ষতিকর নয়, কিন্তু সমস্যা যখন ঘন ঘন ফিরে আসে, তখন তার কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
পায়ের পেশিতে খিঁচুনির ৮টি সবচেয়ে সাধারণ কারণ ও র সমাধান
১) ডিহাইড্রেশন (Dehydration)
হালকা ডিহাইড্রেশনও পেশির স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলতে পারে। শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স ও স্নায়ুর সঠিক সংকেত আদানপ্রদানে জল অত্যন্ত জরুরি। শরীরে জলের পরিমাণ কমে গেলে পেশিতে কনট্র্যাকশন বা অনিচ্ছাকৃত সংকোচনের প্রবণতা বাড়ে।
শুধু তেষ্টা পেলেই নয়, দিনভর অল্প অল্প করে জল খেতে থাকুন। গরমকালে বা শরীরচর্চার সময় সোডিয়াম ও পটাশিয়ামযুক্ত ইলেকট্রোলাইট পানীয় উপকারী।
২) ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা
ইলেকট্রোলাইট পেশির কনট্র্যাকশন ও রিল্যাক্সেশনের জন্য ভীষণ প্রয়োজনীয়। অস্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিহীন খাদ্যাভ্যাস, হজমের সমস্যা বা অতিরিক্ত ঘাম - এই সব কারণে ঘাটতি তৈরি হলে খিঁচুনি হতে পারে।
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন কলা, ডাবের জল, সবুজ শাকসবজি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, বাদাম, বীজ ও ডাল। প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট নিতে পারেন, তবে অবশ্যই তা হতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
৩) অতিরিক্ত পরিশ্রম বা পেশির ক্লান্তি
অতিরিক্ত ব্যায়াম, দীর্ঘক্ষণ হাঁটা বা বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলে পেশির উপর চাপ পড়ে এবং খিঁচুনির ঝুঁকি বাড়ে।
ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ান, নিয়মিত বিশ্রামের দিন রাখুন। শরীরচর্চার আগে ও পরে স্ট্রেচিং করুন। পর্যাপ্ত ঘুমও পেশি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।
৪) রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা
রক্তপ্রবাহ কমে গেলে পেশি পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না, ফলে খিঁচুনির সম্ভাবনা বাড়ে। যাঁরা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন বা যাঁদের রক্তনালির সমস্যা আছে, তাঁদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
দীর্ঘক্ষণ পা গুটিয়ে বসে থাকবেন না। মাঝেমধ্যে হাঁটাহাঁটি করুন, বিশ্রামের সময় পা একটু উঁচুতে রাখুন। হাঁটা বা সাইক্লিংয়ের মতো লো-ইমপ্যাক্ট ব্যায়াম উপকারী।
৫) স্নায়ুর চাপ বা মেরুদণ্ডের সমস্যা
কোমরের নিচের দিকে ডিস্কের সমস্যা বা স্পাইনাল ডেজেনারেশনের কারণে মাসল কম্প্রেশন হলে পায়ের পেশিতে ভুল সংকেত পৌঁছতে পারে, যার ফলে খিঁচুনি হয়।
সঠিক ভঙ্গিতে বসা ও দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে বসা এড়িয়ে চলুন। খিঁচুনির সঙ্গে যদি পিঠে ব্যথা, ঝিনঝিন বা অবশভাব থাকে, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৬) সারাদিন নড়াচড়া কম হওয়া
অতিরিক্ত পরিশ্রম যেমন সমস্যা, তেমনই নড়াচড়ার অভাবও বিপজ্জনক। যেসব পেশি নিয়মিত ব্যবহার বা স্ট্রেচ করা হয় না, সেগুলি সহজেই ছোট হয়ে গিয়ে খিঁচুনি ধরাতে পারে।
রোজ হালকা স্ট্রেচিং, যোগব্যায়াম বা ছোট ছোট হাঁটার অভ্যাস করুন। এতে পেশি নমনীয় ও সক্রিয় থাকে।
৭) কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ
ডাইইউরেটিকস, স্ট্যাটিনস এবং কিছু হাঁপানি বা রক্তচাপের ওষুধ শরীরের জল ও মিনারেলসের ভারসাম্যে বদল এলে খিঁচুনির কারণ হতে পারে।
নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ বন্ধ করবেন না। ঘন ঘন খিঁচুনি হলে চিকিৎসককে জানান। প্রয়োজনে তিনি ডোজ বদলাতে বা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন।
৮) ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি
ভিটামিন বি১২ স্নায়ুর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভিটামিনের ঘাটতি নিরামিষাশী, বয়স্ক বা যাঁদের পুষ্টি শোষণের সমস্যা রয়েছে এমন মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায় - যা খিঁচুনি ও স্নায়ুজনিত সমস্যার কারণ হতে পারে।
ফর্টিফায়েড খাবার, দুধ, ডিম খাদ্যতালিকায় রাখুন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নিন।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
পায়ের খিঁচুনি হলে চিকিৎসা পরামর্শ জরুরি, যদি -
পায়ের পেশির খিঁচুনি খুবই সাধারণ সমস্যা, কিন্তু সব সময় তা “এমনিই হচ্ছে” বলে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি শরীরের পাঠানো একটি সতর্কবার্তা - ডিহাইড্রেশন, পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে। সময়ে এই সংকেতগুলি বুঝে নিয়ে সামান্য জীবনযাপনের পরিবর্তন আনলেই ভবিষ্যতে বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব।