বীরভূমের ১৩ বছরের নীলা মণ্ডলের ছোট্ট জীবনজুড়ে ছিল এক অজানা ভয়ের ছায়া—হঠাৎ হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে ওঠে, নিঃশ্বাস চেপে আসে, মন অস্থির হয়ে পড়ে। ঘণ্টাখানেক এমনই চলত।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 14 May 2025 13:50
অসুস্থতার কারণে যখন একের পর এক দরজা বন্ধ হচ্ছিল, তখন নতুন জীবনের জানালা খুলে গেল চিকিৎসার হাত ধরে। বীরভূমের ১৩ বছরের নীলা মণ্ডলের ছোট্ট জীবনজুড়ে ছিল এক অজানা ভয়ের ছায়া—হঠাৎ হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে ওঠে, নিঃশ্বাস চেপে আসে, মন অস্থির হয়ে পড়ে। ঘণ্টাখানেক এমনই চলত। দিনের পর দিন এই যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করে যেতে হয়েছে তাকে। স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলো কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন—সবকিছুতেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার অসুস্থতা। অথচ অনেক সময়েই এই সমস্যাগুলোকে ‘পরীক্ষার টেনশন’ কিংবা ‘মনের ভয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু নীলার জীবনে আশার আলো জ্বালান কলকাতার বিএম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টারের চিকিৎসক ডঃ রাকেশ সরকার। এই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও ইলেক্ট্রোফিজিওলজিস্ট নীলাকে শুধু চিকিৎসা নয়, ফেরত দেন তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ।
ডঃ সরকার বলেন, ''বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরীর ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দনের সমস্যা মানসিক রোগ বলেই ধরেন অনেকেই। কিন্তু নীলার উপসর্গগুলো ছিল খুবই স্পষ্ট।'' সৌভাগ্যবশত, ইসিজি রিপোর্টে ধরা পড়ে আসল সমস্যা—সুপ্রাভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া (SVT)। চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, নীলার হার্টে এক বৈদ্যুতিক সিগন্যাল তৈরি হয়েছে, যার ফলে এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এরপর শুরু হয় নীলার জীবন পালটে দেওয়ার প্রক্রিয়া—রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন (RFA) নামের এক আধুনিক চিকিৎসা। বিএম বিড়লা হাসপাতালের অত্যাধুনিক ক্যাথ ল্যাবে রয়েছে ইলেক্ট্রোফিজিওলজি। এই ল্যাবে করা হয় এই অতি জটিল, কিন্তু মাইক্রো-ইনভেসিভ চিকিৎসা।
থ্রিডি ম্যাপিং, রিয়েল টাইম ফ্লুরোস্কোপি আর বিশেষ ইপিই রেকর্ডিং সিস্টেমের সাহায্যে, ডঃ সরকার ও তাঁর দল ছোট ক্যাথেটার ব্যবহার করে পৌঁছে যান নীলার হৃদয়ের অভ্যন্তরে। তারপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বৈদ্যুতিক পথটিকে আটকে ফেলা হয়। “এই প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা হৃদয়ের বৈদ্যুতিক ছন্দকে চোখের সামনে দেখতে পাই। এটা শুধু রোগনির্ণয় নয়—এটা নিখুঁত থেরাপি,” বলেন ডঃ সরকার।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে সফল অস্ত্রোপচারের পর এখন আবার স্কুলে যাচ্ছে নীলা, আগের মতোই খেলছে, হাসছে, বাঁচছে। যার দিনরাত কেটেছে আতঙ্কে, সেই মেয়ের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। তাঁর বাবা-মা আজ কৃতজ্ঞ, চিকিৎসকের কাছে নয় শুধু, এই হাসপাতালের আধুনিক পরিকাঠামোর কাছেও। ডঃ সরকার বলেন, “হৃদয় বা হার্ট কেবল একটি অঙ্গ নয়—এটা ছন্দ, অনুভব আর জীবন। বিএম বিড়লায় আমরা এই তিনটিকে একসঙ্গে রক্ষা করতে পেরেছি।''
চারপাশের অনেকেই ভেবেছিলেন, এ বুঝি শুধু মানসিক চাপ বা পরীক্ষার টেনশন। কিন্তু বাস্তবটা ছিল অনেক গভীর। কলকাতার বিএম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টারের অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগলবন্দিতে সেই ভয়কে জয় করে আজ আবার হাসছে নীলা—একেবারে নতুন প্রাণ নিয়ে।