পেরেন্টিং ব্যাপারটা আসলে খুব মুশকিল। তবে, অনেক সময় যে বাবা-মাকে দোষ দেওয়া যায়, তাও নয় - বললেন মনোবিদ সৌমি চক্রবর্তী।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 13 October 2025 19:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাতারাতি প্রচারের আলোয় গুজরাতের গান্ধীনগরের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ইশিত ভাট (KBC child Ishit Bhatt)। কৌন বনেগা ক্রোড়পতি (KBC season 17) সিজন ১৭–এর মঞ্চে হাজির হয়েছিল সে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু সে নয়, কাঠগড়ায় উঠেছে তাকে বড় করে তোলার নেপথ্যে তার বাবা-মায়ের ভূমিকা (Parenting)।
অমিতাভ বচ্চনের সঞ্চালিত এই শোতে ইশিতের ‘অতিরিক্ত’ আত্মবিশ্বাসপূর্ণ ভঙ্গি (overconfident child on KBC), কথা বলার সুর এবং সহবত প্রশ্ন তুলে দিয়েছে তার পারিবারিক শিক্ষা নিয়ে।
তার আগে এক নজরে জেনে নেওয়া যাক, ঠিক কী হয়েছিল শো-তে?
শো চলাকালীন, ইশিত বচ্চনকে বলেন, “মেরে কো রুলস পতা হ্যায় ইস লিয়ে আপ মেরে কো রুলস সমঝানে মত বৈঠনা (আমি নিয়ম জানি, তাই নিয়ম বুঝিয়ে সময় নষ্ট করবেন না)।” এরপরেও সে একাধিকবার উত্তরের অপশন চেয়ে বসে, এমনকী বলে ওঠে, “আরে অপশন ডালো (দ্রুত অপশন দিন)।”
এক প্রশ্নে সে বলে, “স্যার একবার নয়, চারবার লক লাগাও।” তবে শেষ পর্যন্ত রামায়ণ সংক্রান্ত প্রশ্নে ভুল উত্তর দিয়ে যেটুকু পুরস্কার জিতেছিল তা খুইয়েই শো থেকে তাকে বিদায় নিতে হয়।
বাচ্চাকে ছোট থেকে বড় করে তোলা মানে একটা মাটির তালকে ইচ্ছেমতো আকার দেওয়া, সেই দায়িত্বটা বাবা-মায়েরই। বাচ্চা মানুষের মতো মানুষ হলেও যতটা সুনাম, বাচ্চার একটা ভুলে প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে বাবা-মায়ের সঠিক শিক্ষার পাঠ। সেই প্রসঙ্গে 'দ্য ওয়াল'-এর সঙ্গে কথা বললেন মনোবিদ সৌমি চক্রবর্তী (Psychologist Soumi Chakraborty)।
তাঁর কথায়, ‘‘মনস্তত্ব বলে, বাচ্চা যা দেখে সেটাই শেখে। বাচ্চা যদি চোখের সামনে দেখে বাবা-মা নিজেরাই খুব অধৈর্য, ঝগড়া করে, অশান্তি করে - তাহলে বাচ্চাদের মধ্যে অনেক সময় এমন ব্যবহার দেখা যায়। আরও একটা কথা যেটা একদমই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়, তা হল বাচ্চাকে বাড়িতে কতটা ‘কন্ট্রোল’ করা হচ্ছে। তখন অনেক সময় সেই জিনিসটাই সে বাইরেও প্রকাশ করতে পারে। বাচ্চাটিকে বকে তো কোনও লাভ হবে না, তবে কীভাবে সেটা শুধরে নেওয়া যায়, সেটা ভাবতে হবে।’’
তিনি যোগ করেন, ''দ্বিতীয় একটা কারণ এটাও হতে পারে যে, বাচ্চাটির হয়তো কোনও স্বভাবজনিত সমস্যা রয়েছে। ADHD-ও থাকতে পারে।''
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ADHD নিয়ে অনেক কথা কানে আসে। এই সমস্যাটি ঠিক কী?
সৌমির কথায়, ‘‘এটা হল এক ধরনের স্বভাবজনিত সমস্যা। এই সমস্যা থাকলে বাচ্চা মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে না, স্কুলে হোক বা বাড়িতে। রেস্টলেস হয়ে পড়বে বা উসখুস করবে, হাইপারঅ্যাক্টিভিটি বা অত্যাধিক চঞ্চলতা দেখা দেবে।
তবে, আরও একটি বিশেষ দিক মানুষের ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করেন মনোবিদ সৌমি চক্রবর্তী। তিনি মনে করেন, ‘‘বাচ্চাটির এই আচরণে মূলত বাবা মায়ের দিকে আঙুল তোলা হলেও এটা শোয়ের টিআরপি বাড়ানোর কোনও ছক নয় তো! শোয়ের নির্মাতারা তো এটা ভাল করেই জানেন, এরকম কিছু বিষয় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। লোক আরও বেশি করে এসব দেখতে চাইবেন। এটা চাইলেই ডিলিট করে দেওয়া যেতে পারত।’’
তবে মনোবিদ বলছেন, ‘‘হতেই পারে যে বাচ্চাটিকে হয়তো প্রপার ট্রেনিং-ই দেওয়া হয়নি রিয়েলিটি শোয়ে আসার আগে। কীভাবে তাকে কথা বলতে হবে, কেমন ব্যবহার হতে হবে, সেই ব্যাপারে সে কিছুই জানে না। কিন্তু প্রশ্ন তো এখানে আসবেই এরকম দুরন্ত বাচ্চাকে নির্মাতারা কেন নিলেন? কোনও উদ্দেশ্য কি ছিল তাদের? আরও একটু গাইড করা কি যেত না? আমরা কিন্তু দেখি যে আরও ছোট ছোট বাচ্চারাও ভাল ব্যবহার করে মন জয় করে নিচ্ছে সকলের।’’
বাবা-মায়ের প্রভাব তো রয়েছেই, কিন্তু শুধু কি তাই? বাচ্চা যে পরিবেশে মানুষ হচ্ছে, তার কি কোনও প্রভাব নেই?
মনোবিদের কথায়, ‘‘পরিবেশের প্রভাব তো রয়েছেই। আজকের যুগে মোবাইলে আটকে থাকার প্রবণতা অদ্ভুতভাবে ‘ডোপামিন’ ট্রিগার করছে। ফলে বাচ্চারা আরও বেশি করে মোবাইল দেখতে চাইছে, ফলস্বরূপ তাদের মধ্যে রেস্টলেসনেসও বাড়ছে।''
তবে বাচ্চাটির এই ব্যবহারের পিছনে আরও একটা কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন মনোবিদ। এই ব্যবহারের প্রভাব কোনওভাবে অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ‘‘বাচ্চারা অনেকটা সময় স্ক্রিনে কাটালে তাদের মধ্যে এক ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে যা স্ক্রিন অটিজম নামে পরিচিত। দেখা যায়, তারা বেশি কথা বলছে না, নেশাগ্রস্তের মতো স্ক্রিন ছাড়া কিছুই বুঝছে না। ADHD-এর প্রভাব বেড়ে যাচ্ছে,’’ বলেন সৌমি।
এক্ষেত্রে বাবা-মায়ের করণীয় কী?
সৌমির পরামর্শ, ‘‘বাবা-মাকেও প্রথম থেকে একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল রাখতে হবে আচার আচরণ। এখানে শুধু বাবা-মা নয়, ভূমিকা রয়েছে স্কুলেরও। যদি বাচ্চার মধ্যে এরকম কোনও সমস্যা দেখা দেয়, বাবা-মায়ের প্রথমেই উচিত স্ক্রিন টাইম কমানোর চেষ্টা করা। তার পাশাপাশি তার সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটানো, শারীরিক কসরতের মধ্যে রাখা। তাতে ওদের এনার্জিটা ঠিকঠাক চ্যানেলাইজ করা যায়, মনোযোগ বাড়ে। যোগাসনে ব্রেনে অক্সিজেন যায়, হ্যাপি হরমোন বাড়ায়, এগুলো বাধ্যতামূলক করা দরকার।’’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘যদি আচার আচরণে তেমন কিছু লক্ষ্য করেন, তাহলে বাবা-মাদের এটাই বলব যে, সময় করে বাচ্চাদের সাইকিয়াট্রিস্ট বা সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যান বা তার সঙ্গে আরও একটু বেশি সময় কাটানোর চেষ্টা। অ্যাক্টিভিটির মধ্যে ব্যস্ত রাখা যায়। এইসব বিষয়ে একটু ওয়াকিবহাল থাকা।’’
বাবা-মায়ের ভূমিকা নিয়ে কী মত মনোবিদের?
সৌমি মনে করেন, কেবিসির ক্ষেত্রে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে বাচ্চাটাকে তো দায়ী করা যায় না। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, বাবা-মা দু’জনেই কর্মরত, অতটা সময় দিতে পারছেন না। অনেকটা সময় বাড়ির বাইরে ক্রেশে থাকে। ঠিকঠাক গাইডেন্স পাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে অনেক সময় যে বাবা-মাকে দোষ দেওয়া যায়, তাও নয়। তাদেরও নিজস্ব কেরিয়ার আছে। কিন্তু এখানেও দরকার একটা ব্যালেন্স তৈরি করা চেষ্টা করা। বাবা-মা দু’জনেই ব্যস্ত, বাচ্চাকে মোবাইল দিয়ে দেওয়া হল। সে টানা রিল দেখছে, ফলে তার মনোযোগ কমছে।
সৌমি বারবার মনে করালেন, পেরেন্টিং ব্যাপারটা আসলে খুব মুশকিল, সহজে বাবা-মা হওয়া যায় না। বাবা-মা হতে গেলে, বাচ্চাটাকে ঠিকঠাক মানুষ করতে প্রচুর দায়দায়িত্ব থাকে।
বাচ্চার আচরণে সমস্যা, সহবত না শেখায় কি কোনওভাবে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির একাকিত্বও দায়ী নয়?
মনোবিদ বলছেন, ‘‘এটা তো আরও বড় সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, বাড়িতে বয়স্কদের অভাব থেকে যাচ্ছে। বয়স্করা গল্প বলছেন - এই পরিবেশ বাচ্চারা পাচ্ছে না, তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছে না। বাড়ির বড়রা গাইড করছেন, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, ভ্যালু শেখা – এসবে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে বাচ্চারা। ওরা কমিউনিকশন করে না, আমরা ছোটবেলায় খেলতাম, ওরা তো খেলে না। একা থাকতে থাকতে কমিউনিকেশন স্কিল তারা তৈরি করে উঠতে পারছে না।’’
বাবা-মাকে বিশেষ কী পরামর্শ দিলেন মনোবিদ?
‘‘ভ্যালু এডুকেশন দরকার, চারপাশে যা ঘটছে তা শেখানো। তাকে এটা বোঝানো, তুমি যদি কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করো, তাহলে কেউ তো তোমাকে ভালবাসবে না। এরকম ভাবে যদি ছোট থেকে তাকে গাইড করা যায়, ততই ভাল। তবে সামাজিক অবক্ষয়ের সময় এটা। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করতে হবে।
এখানেই শেষ নয়, এরপরও রিয়েলিটি শো হবে। বাচ্চারা অংশ নেবে। বাবা-মাকে কী পরামর্শ দেবেন মনোবিদ?
তাঁর কথায়, ‘‘হঠাৎ করে বাচ্চাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় না করিয়ে, তাকে আগে এটার গুরুত্ব বোঝানোর দরকার। তাকে এটা বোঝানো যে তুমি ক্যামেরার সামনে যাচ্ছ, সেখানে তুমি এই এই কাজ করতে পারবে না। তুমি বড় সেলিব্রিটির সঙ্গে কথা বলবে, তুমি এই এইভাবে কথা বলতে পার না।’’
এই যে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ঝড় উঠল, আমরা বাবা-মাকে নিয়ে খাপ বসালাম, বাচ্চাটিকে দোষারোপ করলাম - এটাও কি একরকম বুলিং নয়?
সৌমির কথায়, ‘‘আমরাও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বাচ্চাটিকে অতিরিক্ত বুঝিয়ে ফেলছি যে, এটা তোমার ঠিক হচ্ছে না। কেন ঠিক হচ্ছে না, সেটা বোঝার দরকার। সব কিছুরই তো একটা কারণ আছে। তার বাড়ির পরিবেশ কেমন, তার জেনেটিক কোনও সমস্যা আছে কি না, সব কিছু দেখে আমাদের সিদ্ধান্তে আসা উচিত। ঘটনাটি নিয়ে আমাদের ভাবনাচিন্তা করা পর্যন্ত ঠিক আছে। তবে একটু ধৈর্য ধরে এটাও বোঝা উচিত যে, ও তো একটা বাচ্চাই। আমাদের বোধ হয় এতটা জাজমেন্টাল হওয়ারও খুব একটা দরকার নেই।’’