শেষ আপডেট: 11 September 2025 13:49
নিয়মিত মাথাব্যথা কি লুকিয়ে রাখছে প্রাণঘাতী টিউমারের সংকেত? অবহেলা করলেই বাড়তে পারে বিপদ—সতর্ক করলেন নিউরো সার্জন ড. রুপান্ত কুমার দাস।
কলকাতা: প্রায় সবারই কখনও না কখনও মাথাব্যথা হয়েছে। কিন্তু সেই পরিচিত উপসর্গটাই কখনও হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী মস্তিষ্কজনিত অসুস্থতার প্রথম সতর্কবার্তা। বিশেষত, ব্রেন টিউমারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে মাথাব্যথা দেখা দিলেও, অনেকেই সেটিকে অবহেলা করেন। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে সেই ভুলের মাশুল হতে পারে ভয়ঙ্কর। এই প্রসঙ্গে আনন্দবাজার অনলাইন-কে বিস্তারিত জানালেন বিশিষ্ট নিউরো সার্জন ড. রুপান্ত কুমার দাস।
সব টিউমার কি ক্যানসার?
ড. দাস বলেন, ‘‘শরীরের অন্যান্য অংশের মতো মস্তিষ্কেও টিউমার হতে পারে। এই টিউমার মূলত দুই ধরনের—বি-৯ (নন-ক্যানসারাস) ও ম্যালিগন্যান্ট (ক্যানসারাস)। ম্যালিগন্যান্ট টিউমার শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, এখানেই এর ভয়াবহতা।’’
নন-ক্যানসারাস টিউমারের মধ্যে অন্যতম মেনিনজিওমা, যা মস্তিষ্কের বাইরের আবরণে হয়। এগুলোর বৃদ্ধি ধীর হলেও, মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে, কিছু টিউমার ব্রেন টিস্যুর গভীরে গড়ে উঠে, যেগুলোর ঝুঁকি অনেক বেশি।
সব মাথাব্যথা এক নয়—কখন সতর্ক হবেন?
মাথাব্যথার পাশাপাশি যদি দেখা যায়—
বমি বমি ভাব বা বমি
ঝিমুনি বা ঘুম ঘুম ভাব
ক্লান্তি, দুর্বলতা
বিকেল বা রাতে মাথাব্যথা বেড়ে যাওয়া
—তাহলে সেটি হতে পারে ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক ইঙ্গিত। ড. দাস বলেন, ‘‘এই উপসর্গগুলো অনেকেই অবহেলা করেন। মাথা ধরলেই পেইনকিলার খেয়ে নেন। ফলে রোগ শনাক্তে দেরি হয়, চিকিৎসাও জটিল হয়ে যায়।’’
ব্রেন টিউমার মানেই কি মৃত্যু?
‘‘একেবারেই না,’’—সরাসরি বললেন ড. দাস। লো গ্রেড টিউমার হলে, সময় মতো চিকিৎসা শুরু করলে রোগী একেবারে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। আর হাই গ্রেড ক্যানসারাস টিউমার হলেও চিকিৎসা, রেডিওথেরাপি, নিয়মিত ফলো-আপে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ড. দাসের কথায়, ‘‘রোগীরা ভয় পান—যদি খারাপ কিছু ধরা পড়ে! অথচ CT স্ক্যান বা MRI-ই একমাত্র উপায় টিউমার শনাক্ত করার। আজকাল সরকারি হাসপাতালেও এই স্ক্যানগুলি সুলভে করা যায়। সময় নষ্ট না করে স্ক্যান করানোই বুদ্ধিমানের কাজ।’’
শিশুদের ক্ষেত্রেও বাড়ছে ঝুঁকি
ড. দাস জানালেন, বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও ব্রেন টিউমার দেখা যাচ্ছে। তাই সতর্ক থাকতে হবে অভিভাবকদের। লক্ষণগুলি হল:
শিশুর মাথা অস্বাভাবিক বড়
খেতে অনীহা
ঘন ঘন বমি
নিস্তেজ ভাব, চোখের সমস্যা
—এই উপসর্গগুলি অবহেলা করা ঠিক নয়।
সার্জারির পর স্বাভাবিক জীবন
সার্জারির পর রোগীর জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক হতে পারে, বিশেষ করে যদি টিউমার লো গ্রেড বা নন-ক্যানসারাস হয়। তবে হাই গ্রেড ক্যানসারাস টিউমার হলে সার্জারির পরও ফলো-আপ, রেডিওথেরাপি এবং চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ প্রয়োজন। রেকারেন্সের আশঙ্কাও থেকে যায়, তাই নজরদারি জরুরি।।
নিউরোলজিস্ট নয়, কখন সরাসরি নিউরো সার্জনের পরামর্শ নেবেন?
নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো থাকলে দেরি না করে নিউরো সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
প্রতিদিন মাথাব্যথা, বিশেষ করে বিকেলে বা রাতে
বমি বা বমি ভাব
দুর্বলতা, ঝিমুনি
চোখে সমস্যা বা ঝাপসা দেখা
খিচুনি বা স্মৃতিভ্রংশ
—দেরি করা মানে বিপদের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
ড. রুপান্ত কুমার দাসের শেষ বার্তা খুব স্পষ্ট—“ব্রেন টিউমার মানেই শেষ নয়। সময় মতো ধরা পড়লে চিকিৎসায় সাফল্য সম্ভব। ভয় নয়, সচেতনতা জরুরি।” মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, বমি—এসব উপসর্গ অবহেলা না করে চিকিৎসা নেওয়াই হল সঠিক সিদ্ধান্ত। সচেতন থাকুন, নিজের সঙ্গে সঙ্গে অন্যকেও সচেতন করুন।