এই ধরনের ডায়েট কি আদৌ নিরাপদ? তা-ও আবার ভারতের মতো দেশে, যেখানে ডায়েট ও স্বাস্থ্য সমস্যার ধরনটাই আলাদা?

বলিউডের প্রখ্যাত প্রযোজক বনি কাপুর
শেষ আপডেট: 24 July 2025 20:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ৬৯ বছর বয়সে এসে বলিউডের প্রখ্যাত প্রযোজক বনি কাপুর সম্প্রতি ওজন ঝরিয়ে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছবিতে তাঁকে একেবারে নতুন রূপে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে, তিনি জিমে না গিয়েই ২৬ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলেছেন। তার পেছনে রয়েছে স্ট্রিক্ট ডায়েট। রাতের খাবার বাদ, সকালে শুধুই ফল, জুস আর জোয়ার রুটি।
ভাইরাল ভায়ানির ইনস্টাগ্রাম পোস্ট বলছে, “বনি কাপুর এখন ইন্টারনেটের নতুন সেনসেশন। ক্যাজুয়াল বা সেমি-ফর্মালে তাঁকে দেখে চেনার উপায় নেই। জিমে না গিয়ে একমাত্র খাওয়া-দাওয়ার নিয়ন্ত্রণ আর স্ট্রিক্ট নিয়ম মেনেই এই ট্রান্সফরমেশন সম্ভব হয়েছে।”
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। এই ধরনের ডায়েট কি আদৌ নিরাপদ? তা-ও আবার ভারতের মতো দেশে, যেখানে ডায়েট ও স্বাস্থ্য সমস্যার ধরনটাই আলাদা? এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের গ্যাস্ট্রো ও ওয়েটলস বিশেষজ্ঞ অরুণ প্রসাদ।
ডিনার বাদ দিলে ওজন কমে, কিন্তু…
ডাঃ প্রসাদ বলেন, “জিমে না গিয়ে ওজন কমানো সম্ভব। কিন্তু সেটা যেন দীর্ঘস্থায়ী ও স্বাস্থ্যকর হয়, তার জন্য সঠিক পদ্ধতি ও নিয়ম মেনে ডায়েট জরুরি। হঠাৎ ডিনার বাদ দেওয়া বা শুধুই ফলমূল খাওয়ায় শরীরের পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, অনেকেই ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ করেন। ১৬:৮ ডায়েট (১৬ ঘণ্টা উপোস, ৮ ঘণ্টার মধ্যে খাবার খাওয়া)। এতে অনেকের ওজন কমে ঠিকই, কিন্তু সবার শরীর তা মানিয়ে নিতে পারে না। বরং দেখা দিতে পারে ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, রাত্রে অতিরিক্ত খিদে এবং অনিয়ন্ত্রিত স্ন্যাকিংয়ের প্রবণতা।
বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস, হাই ব্লাডপ্রেশার বা ফ্যাটি লিভার আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ডিনার বাদ দিলে বিপদ আরও বেড়ে যায়। রক্তে শর্করার মারাত্মক ওঠানামা হতে পারে।
শুধুই ফল দিয়ে ব্রেকফাস্ট?
ফল খাওয়া স্বাস্থ্যকর, এতে ফাইবার, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। কিন্তু শুধু ফল খেয়ে প্রোটিন ও ফ্যাটের ঘাটতি হয়, যা এনার্জি কমিয়ে দেয়, খিদে বাড়ায় এবং মাংসপেশির ক্ষয় ডেকে আনে।
ভারতের অনেক জনপ্রিয় ফল যেমন কলা, আম, আঙুর - এসবেই চিনি অনেক বেশি। ফলে ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স যাঁদের আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ফল-নির্ভর ব্রেকফাস্টে ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে।
ডাঃ প্রসাদ বলেন, “ফলের সঙ্গে চাই প্রোটিনও। সেদ্ধ ডিম, পনির, দই, ভেজানো বাদাম বা মুগ স্প্রাউটসের মতো কিছু যোগ করলে ব্লাড সুগার স্থিতিশীল থাকে, আর দীর্ঘক্ষণ খিদে পায় না।”
স্ট্রিক্ট ডায়েটে ওজন কমলেও শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়
দ্রুত ওজন কমাতে গিয়ে অনেকেই একসঙ্গে অনেকটা ক্যালোরি কমিয়ে দেন, বা একবেলার খাবার বাদ দেন। এতে ওজন কমলেও সেটা মূলত ফ্যাট নয়, পেশি ক্ষয় হয়। ফলে মেটাবলিজম কমে যায়, শরীর দুর্বল হয়।
ভারতীয় খাদ্যতালিকা সাধারণত বেশি কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ (ভাত, রুটি, আলু), সেখানে কম প্রোটিন আর ফাইবার থাকে। তার উপরে মিষ্টি, তেল-মশলা আর ফাস্ট ফুড তো আছেই। ফলে ভারতীয়দের মধ্যে বহুজন রয়েছেন ‘TOFI’ ক্যাটেগরিতে - মানে "Thin Outside, Fat Inside", বাইরে থেকে রোগা দেখালেও ভিতরে ভিসারাল ফ্যাট জমে থাকে।
ওজন কমাতে কী করবেন? পরামর্শ দিলেন ডাঃ প্রসাদ
তাঁর মতে, গুছিয়ে খাওয়া এই ক্ষেত্রে ভীষণ দরকার। পাতে থাকুক রকমারি সবজি, সীমিত পরিমাণে তাজা ফল, ব্রাউন রাইস, ওটস বা মিলেট। প্রোটিনে থাকুক ডাল, ডিম, পনির, দই, গ্রিল্ড মাছ বা চিকেন। বাদাম ও সিডস থেকে পাওয়া যেতে পারে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট।
ভারতীয় রান্নার মশলা যেমন হলুদ, আদা, দারচিনি—রক্তচাপ ও ব্লাড সুগারের জন্য উপকারী।
পাশাপাশি, হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, যোগব্যায়াম বা হালকা এক্সারসাইজ খুব কার্যকর।
সতর্কতা: যাঁদের আগে থেকেই অসুস্থতা আছে যেমন ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ - তাঁদের জন্য রাতের খাবার বাদ দেওয়ার মতো নিয়ম বিপজ্জনক হতে পারে। তাঁদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিজের শরীর ও রুটিন অনুযায়ী ডায়েট ঠিক করা।