স্ট্রেস ভেবে পার্কিনসনের লক্ষণ এড়িয়ে যাচ্ছেন? দেশে তরুণদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে এই রোগ। প্রাথমিক উপসর্গ, চিকিৎসকের সতর্কবার্তা ও জেনেটিক কারণ-সহ বিস্তারিত জানুন।

এআই দিয়ে তৈরি ছবি
শেষ আপডেট: 29 November 2025 17:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফরিদাবাদের স্কুলশিক্ষক দিব্যাংশু গোয়েল (Divyanshu Goel)। বয়স মাত্র ৩৮। সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার তাড়া, ক্লাস নেওয়া, খাতা দেখা, ঠিক করা মানে তীব্র ব্যস্ততা। কিন্তু তারই মাঝে শরীর দিচ্ছিল অন্য সংকেত। হাঁটার সময় হঠাৎ গতি কমে যাওয়া। হাতের লেখা (Handwriting) ছোট হয়ে আসা। শরীর মাঝে মাঝে এমন শক্ত (Stiffness) হয়ে যাওয়া, যেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সমস্ত স্বাভাবিক ছন্দ।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, শীতের ঠান্ডা, দীর্ঘক্ষণ টানা বসে কাজ করা, আর স্ট্রেসের ফলেই (Stress) এসব হচ্ছে। বয়স তো মাত্র ৩৮ কোনও রোগ ছুঁতে পারে, সে ধারণাই ছিল না।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই এই ছোট ছোট পরিবর্তন বাড়তে শুরু করে। ডাক্তারের কাছে গেলে জানা যায়, তিনি আক্রান্ত হয়েছেন আর্লি অনসেট পার্কিনসনস ডিজিজে (Early-onset Parkinson’s disease), যা সাধারণত ষাটোর্ধ্ব মানুষজনের হতে পারে বা দেখা যায় বেশি। আর তাঁর ক্ষেত্রে এর উৎস গভীরভাবে জেনেটিক। চিকিৎসকরা বলছেন, পার্কিন জেনে মিউটেশন থেকে হতে পারে বয়স্কদের।
এই রোগের কথা শুনে রীতিমতো চমকে যান শিক্ষক। কোনও উপসর্গ ছাড়াই এমনও হতে পারে? জিজ্ঞাসা করতে থাকেন চিকিৎসকদের।
দিল্লির অমৃতা হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান ডঃ সঞ্জয় পাণ্ডে জানালেন, দিব্যাংশুর মতো রোগী এখন আর বিরল নন। তিনি বলেন, “অনেকেই প্রথমে ভাবেন এটা স্ট্রেস বা ক্লান্তি। তাই রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়। কিন্তু কম বয়সিদের মধ্যে পার্কিনসনের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এখন বাড়ছে।”
পরীক্ষায় দেখা যায়, দিব্যাংশুর পার্কি জেনে মিউটেশন হয়েছে। এই জিন মূলত শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। জিনে সমস্যা তৈরি হলে নড়াচড়ার ছন্দ নষ্ট হয়, শরীর শক্ত হয়ে যায়, হাত কাঁপে, সব মিলিয়ে পার্কিনসনের উপসর্গ দেখা দেয়।
দেশে বাড়ছে 'তরুণদের পার্কিনসন', নতুন গবেষণার ইঙ্গিত
ভারতে সাম্প্রতিক গবেষণা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এক বড় স্টাডিতে ৬৭৪ জন ৫০ বছরের নীচে থাকা পার্কিনসন রোগীর ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—
- এই তিনটি জিনের পরিবর্তন দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে এই রোগ বাডা়চ্ছে। অর্থাৎ জেনেটিক কারণে অল্প বয়সে পার্কিনসন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা দশ বছর আগেও এতটা মারাত্মক হারে ছিল না।
বিশ্বজুড়ে গবেষণাও দিচ্ছে একই বার্তা
নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি 'Commander gene complex' আবিষ্কার করেছেন। মস্তিষ্কে প্রোটিন রিসাইক্লিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই কমপ্লেক্স। ত্রুটি হলে-
এটাই পার্কিনসনের মূল কারণগুলির একটি।
এই আবিষ্কার আন্তর্জাতিক স্তরে পার্কিনসনের আগাম শনাক্তকরণ নিয়ে নতুন দিশা দেখাতে পারে।
ভারতে কেন বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতে গড় আয়ু বাড়ছে দ্রুত। ফলে আগামী দশকে নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ (Neurodegenerative Disorders) যেমন পার্কিনসন, অ্যালজাইমার বাড়বে বহু গুণ, মনে করছেন চিকিৎসকরা। তাই তাঁদের মতে-
ডঃ পাণ্ডে বলেন, 'জেনেটিক পরীক্ষা আজ আর বিলাসিতা নয়। চিকিৎসার কৌশল নির্ধারণে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
দিব্যাংশুর পরিবর্তন, চিকিৎসা বদলে দিয়েছে জীবন
দিব্যাংশুর চিকিৎসা শুরু হয়
এই প্রক্রিয়ায়—
DBS করার কয়েক মাসের মধ্যে,
দিব্যাংশু বলেন, “আমি ভাবতাম পার্কিনসন শুধু বয়স্কদের রোগ। কিন্তু আমার ক্ষেত্রেও হল। তবে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে আমি হয়তো পড়াতে ফিরতেই পারতাম না।”
তার কাহিনি মনে করিয়ে দিচ্ছে, ভারতে পার্কিনসন আর শুধু ‘বুড়ো বয়সের রোগ’ নয়। ৩০–৪০-এর তরুণদেরও ধরছে ফলে সতর্ক হোন। উরসর্গ দেখা দিলে বুঝুন ও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।