লিভার সুস্থ রাখতে শুধু মদ্যপান কমানোই যথেষ্ট নয়, প্রতিদিনের কয়েকটি আপাত নিরীহ অভ্যাসই নিঃশব্দে লিভারকে বিপদে ঠেলে দেয়।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 20 January 2026 13:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লিভারের সমস্যা (liver damage) এখন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য-সঙ্কটগুলির মধ্যে একটি। বিশেষত নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD), যা এখন মেটাবলিক ডিসফাংশন–অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোস্ক লিভার ডিজিজ (MASLD) নামেও পরিচিত, দেশে দ্রুত বাড়ছে। অ্যালকোহল নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য নানা এমন কারণ, যা সাধারণত বড় কোনও সমস্যা বলে মনে না হলেও চুপিসারে ক্ষতি করছে লিভারের (lifestyle habits damaging liver)।
লিভারে চর্বি জমে যাওয়ার ফলেই এই সমস্যা দেখা দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে MASLD থেকে লিভার স্ক্যারিং বা সিরোসিস হতে পারে। এমনকি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে তা লিভার ক্যানসার পর্যন্তও পৌঁছয়।
Journal of Clinical and Experimental Hepatology-এর তথ্য বলছে, ভারতে প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক বা শিশুর মধ্যে একজনের NAFLD রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষতি অনেকটাই সেই রকম, যেরকম দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণে হয়। তাই লিভার সুস্থ রাখতে শুধু মদ্যপান কমানোই যথেষ্ট নয়, প্রতিদিনের কয়েকটি আপাত নিরীহ অভ্যাসই নিঃশব্দে লিভারকে বিপদে ঠেলে দেয়।
ডাঃ জ্ঞানরঞ্জন রাউত, কনসালট্যান্ট, মেডিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি (ভুবনেশ্বর মণিপাল হাসপাতাল) বলেন, “লিভারের সমস্যার কথা ভাবলেই আমরা প্রথমে অ্যালকোহলকেই দোষ দিই। অথচ আমাদের নিত্যদিনের বেশ কিছু অভ্যাস, উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার বহু আগেই, এই অঙ্গটির ওপর চুপিসারে চাপ তৈরি করে। ৫০০-র বেশি কাজ করে লিভার - পুষ্টি পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে টক্সিন ছাঁকা হোক বা ইমিউন সাপোর্ট। আর এই ছোট ছোট সমস্যাগুলোই বছরের পর বছর ধরে সময় নেয়, আর বড় কোনও রোগে পরিণত হয়।”
চিকিৎসকের কথায়, অ্যালকোহল ছাড়াও যে ৬ অভ্যাস লিভারের ক্ষতি করছে
১. অতিরিক্ত চিনি ও আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার
কোল্ড ড্রিঙ্ক, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট - এসবের অতিরিক্ত চিনি, বিশেষত ফ্রুকটোজ, লিভারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। লিভার যখন বেশি মাত্রার ফ্রুকটোজকে ভাঙতে বাধ্য হয়, তখন চর্বি জমতে জমতে তা NAFLD-র দিকে ঠেলে দেয়।
একইভাবে, অতিরিক্ত প্রসেসড খাবারের অ্যাডিটিভ, প্রিজারভেটিভ ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট ডিটক্সিফিকেশনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
২. অত্যন্ত অলস ও 'বসে থাকা' জীবনযাপন
ঘন্টার পর ঘন্টা ডেস্কে বসে থাকা বা স্ক্রিনের সামনে কাটানো মানেই তা শরীরের মেটাবলিজম স্লো করে দেয়। ফলে লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ে।
নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ায় ও লিভারে ফ্যাট জমার সম্ভাবনা কমায়।
৩. পেইনকিলার বা নিজে কিনে খাওয়া ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার
প্যারাসিটামল, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বা নানা হারবাল সাপ্লিমেন্ট বারবার, কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া - লিভারের ওপর বিপজ্জনক চাপ তৈরি করে।
বেশি মাত্রায় বা দীর্ঘদিন গ্রহণে এই ওষুধগুলো লিভার ইনফ্ল্যামেশন বা টক্সিসিটি ঘটাতে পারে, যা শেষে সিরোসিস ও স্থায়ী ক্ষতির দিকে এগোয়।
৪. নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি
দীর্ঘসময় ঘুম কম হলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ে এবং মেটাবলিক পথ ব্যাহত হয়। ফলে লিভারের ফ্যাট ও টক্সিন মেটাবলিজম ব্যাহত হয়। খারাপ ঘুম হরমোন ব্যালান্সও বিঘ্নিত করে, যা পরোক্ষে লিভার ক্ষতি বাড়ায়।
৫. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ (Stress)
কমতে থাকা ঘুম, বাড়তে থাকা ইনফ্ল্যামেশন, হাই কর্টিসলের মাত্রা - এই তিন মিলেই চর্বি জমা, রক্তে শর্করা বৃদ্ধি ও বিপাকের গোলমাল বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো লিভারের কার্যক্ষমতা সরাসরি কমিয়ে দেয়।
৬. পরিবেশের টক্সিনের সংস্পর্শে আসা
বাড়ির ক্লিনার, দূষিত বাতাস, বিভিন্ন রাসায়নিক - যা শরীরের ভেতরে নিশ্বাস বা ত্বকের মাধ্যমে ঢোকে, তা লিভারের টক্সিক লোড বাড়ায়।
সময়ের সঙ্গে এই চাপ লিভারের স্বাভাবিক ডিটক্সিফাই করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
কীভাবে লিভারের যত্ন নেবেন?
বিশেষজ্ঞের মতে, ছোট ছোট অভ্যাসই বড় ফল দেয় -
ডাঃ রাউতের সাফ কথা, “লিভার কিন্তু নীরবে ২৪ ঘণ্টাই কাজ করে। আজ সামান্য যত্ন রাখতে পারলে আগামী দিনের গুরুতর জটিলতা রোখা সম্ভব।”