গত কয়েক বছরে নীরবে বদলে গেছে এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরের প্রকৃতি–পরিবেশ। আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে পর্যটনের মানও। এবার ঠান্ডার টান নয়, আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে সুখিয়া পোখরির
.jpeg.webp)
সুখিয়া পোখরিতে নতুন পর্যটন-জোয়ার
শেষ আপডেট: 26 November 2025 11:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দার্জিলিংয়ের (Darjeeling) হিমশীতল শহর সুখিয়া পোখরি (Sukhia Pokhri) বহু বছর ধরেই পরিচিত ছিল ‘সবচেয়ে ঠান্ডার জায়গা’ হিসেবে। কুয়াশা, বরফ আর কাঠের আগুনের উনুন—এই ছিল এখানকার পরিচয়। ঠান্ডার টানে পর্যটকের ভিড়ও ছিল উপচে-পড়া। কিন্তু গত কয়েক বছরে নীরবে বদলে গেছে এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরের প্রকৃতি–পরিবেশ। আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে পর্যটনের মানও। এবার ঠান্ডার টান নয়, আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে সুখিয়া পোখরির—চিতাবাঘ(Sukhia Pokhri leopard Trail)!
রাতে গাড়ির আলোয় ধরা পড়ে চিতার চোখ–এ আর নতুন খবর নয়!
এখন প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয়দের গাড়ির হেডলাইটে ধরা পড়ে—ধূসর-হলদেটে লোম, দুলতে থাকা লম্বা লেজ, আর স্থির দু’টি চোখ। তারপর নিঃশব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। যা একসময় ছিল ‘শুনেছি’—এখন তা সুখিয়া পোখরির ‘প্রতিদিনের দৃশ্য’। স্থানীয়দের কথায়,“আগে শুনতাম চিতা আছে (Sukhia Pokhri leopard sighting)। এখন তো রোজ হেঁটে বেড়ায় বাড়ির পেছনের জঙ্গলেই!”
জঙ্গলের পুনর্জন্ম—কীভাবে বাড়ল বন্যপ্রাণের আনাগোনা? (Sukhia Pokhri Jungle)
দশ-পনেরো বছর আগেও সুখিয়া পোখরিকে ঘিরে থাকা বেশিরভাগ পাহাড় ছিল প্রায় খোলা ঘাসজমি। কাঠ পোড়ানো ছিল রান্না ও জল গরম রাখার মূল উপায়। ফলে—অতিরিক্ত কাঠ সংগ্রহে জঙ্গল কমে গিয়েছিল। মানুষের বসতি থেকে দূরে চলে গিয়েছিল সব বন্যপ্রাণী। কিন্তু সময় বদলেছে। উন্নত সড়ক, বাড়তি আয়, এলপিজি ও বিদ্যুতের ব্যবহার ও কাঠ সংগ্রহে কড়াকড়ি জঙ্গল ফের বাড়তে শুরু করেছে। এবং সেই জঙ্গলের টানেই ফিরে এসেছে চিতাবাঘ, মুনিয়া, বার্কিং ডিয়ার, সিভেটসহ অসংখ্য প্রাণী। এখন ঘরবাড়ির ব্যাকইয়ার্ড পর্যন্ত উঠে এসেছে ঘন সবুজ জঙ্গল।
চিতার সঙ্গে সহাবস্থান—ঝুঁকি কম, উত্তেজনা বেশি
এ অঞ্চলে গবাদিপশুর সংখ্যা কম। খুব কম বাড়িতেই ছাগল বা গরু আছে। ফলে চিতার মূল শিকার—স্ট্রে ডগ বা রাস্তার কুকুর। তাই মানব-চিতার সংঘাত আপাতত কম। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—যদি কুকুর কমে যায়, চিতা বাধ্য হয়ে অন্য শিকারের দিকে ঝুঁকতে পারে। একটি মাত্র দুর্ঘটনাই মানুষের মনোভাব বদলে দিতে পারে—মহারাষ্ট্র ও উত্তরাখণ্ডে যেমন দেখা গেছে।
পর্যটনের নতুন আকর্ষণ—‘ Sukhia Pokhri Leopard Trail Package’
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিও, রাতের সাফারি-স্টাইল ট্যুর, প্রশিক্ষিত গাইড—সব মিলিয়ে সুখিয়া পোখরি এখন ওয়াইল্ডলাইফ-ট্যুরিজমের নতুন ট্রেন্ডসেটার। ট্যুর অপারেটররা তৈরি করেছে বিশেষ প্যাকেজ—‘Leopard Trail Package’। যেখানে ভোর বা সন্ধ্যায় বিশেষ গাইডেড ট্যুরে পর্যটকদের ঘোরানো হয় সেইসব জায়গায়, যেখানে চিতার আনাগোনা বেশি। রুমা পত্রনবীশ নামে এক পর্যটক বললেন, “এত কাছে চিতা দেখার রোমাঞ্চ উত্তরবঙ্গে আর কোথাও পাইনি!” হোটেল মালিকরা জানাচ্ছেন—ক্রিসমাস, নিউ ইয়ার পর্যন্ত প্রায় সব বুকড। সবার মুখে একটাই শব্দ— লেপার্ড স্পটিং (Leopard Spotting)।
বনের ফেরার গল্প–মন্ত্রীর ব্যাখ্যা
বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা ‘দ্য ওয়াল’-কে বলেন—“মানুষ কাঠ পোড়ানো কমিয়েছে, সচেতনতা বেড়েছে, পুরনো জঙ্গলও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বন্যপ্রাণ সংখ্যায় বেড়েছে, প্রজাতিও ফিরেছে। এ কাজে আমাদের বনকর্মীদের পরিশ্রমই সবচেয়ে বড় শক্তি।”
কিন্তু ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অগোছালো পর্যটন (Sukhia Pokhri Tourism)
বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে—চিতা দেখার জন্য ভিড় করে যাওয়া, ভিডিও তুলতে আলো ঝলকানি, রাতে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ—এসব আচরণ চিতার স্বাভাবিক চলাফেরা বদলে দিচ্ছে। ফরেস্ট দফতর তাই বারবার বলছে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন, খাবার ছুঁড়ে দেবেন না বা ফ্ল্যাশলাইট ব্যবহার করবেন না।
এক বনকর্তার সতর্ক করে বলেছেন, “মানুষ-প্রাণীর সম্পর্ক বিপন্ন হলে ক্ষতি হবে পুরো অঞ্চলের—বন্যপ্রাণ আর পর্যটন—দুটোরই।”
সুখিয়া পোখরি ছাড়াও ঘুম, মিরিক, সোনাদা, লেপচাজগত—সর্বত্রই রাতের রাস্তায় চিতার চলাচল বাড়ছে। কোথাও চা-বাগানের শ্রমিক আক্রান্ত, কোথাও বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। ক্যামেরা ট্র্যাপ স্টাডিগুলো দেখাচ্ছে—জনবসতি এলাকায় চিতার যত দেখা মিলছে, ততটাই দেখা যাচ্ছে রিজার্ভ ফরেস্টেও! তবে, চিতা কতগুলো আছে? তারা কোন পথ ধরে চলে? কোথায় শিকার বেশি? এই তথ্যগুলো নিয়ে এখনও কোনও সুষ্ঠু গবেষণা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—নতুন ক্যামেরা ট্র্যাপ, জেনেটিক স্যাম্পলিং,নিয়মিত গণনা জরুরি। না হলে পরবর্তী সংঘাত রুখে দেওয়া অসম্ভব। এমনকি বনবিভাগের কর্মীরাও বলছেন—অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।
সুখিয়া পোখরি কীভাবে পৌঁছাবেন? (How to reach Sukhia Pokhri)
বাগডোগরা বিমানবন্দর → ৭৪ কিমি
নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন → ৭৮ কিমি
দার্জিলিং থেকে ঘুম হয়ে মিরিক রোড ধরে সহজেই পৌঁছানো যায়।
কোথায় থাকবেন? (Sukhia Pokhri best Homestay)
ছোট-বড় হোটেল, রিসর্ট এবং অসংখ্য হোমস্টের সুযোগ আছে। তবে সুখিয়া পোখরির কাছে একটা নতুন হোমস্টে হয়েছে যাদের আতিথেয়তা এক কথায় অনবদ্য। হোমস্টের নাম হল হিলটোপিয়া (HILLTOPIA, Ramji busty, Parmaguri Khasmahal, Sukhia Pokhari, Contact: 81002 23340)।
কখন যাবেন? (Sukhia Pokhri best time to visit)
সুখিয়া পোখরি যাওয়ার সেরা সময় হল, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ।