অনেকেরই বিশ্বাস, ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘ফিক্সড’ ফর্মেশন বলে কিছু থাকবে না। ৪-৩-৩ দলও বল হারালে ৪-১-৪-১ হয়ে যায়। ৪-২-৩-১ দল পজেশন নিলে ২-৩-৫ হয়ে দাঁড়ায়।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 December 2025 18:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেউ মাঝমাঠে ডবল পিভটের পক্ষপাতী৷ কেউ তিন ইঞ্জিনে মিডফিল্ড সচল রাখতে চান৷ কোনও দল কাউন্টার অ্যাটাক-ভিত্তিক, উইঙ্গারদের বাড়তি কদর৷ কোথাও আবার পজেশনাল প্লে-ই পরম অন্বিষ্ট! ময়দানে পারফর্ম করাটা পর্দায় দেখি৷ কিন্তু আড়ালে সলতে পাকানো শুরু হয় ড্রেসিং রুমের চক-বোর্ডে! সেখানেই আঁক কষা: কোন ফর্মেশনে টিম বল পায়ে, বল ছাড়া শেপ নেবে। জোনাল মার্কিং নাকি ম্যান মার্কিংয়ের রাস্তায় হাঁটা হবে!
৪-২-৩-১: আধুনিক ফুটবলের ‘সেফ মোড’
এই ফর্মেশনকে অনেকেই বলে থাকেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে নিরাপদ নকশা। কারণ এর ভিত বানানো ভারসাম্যের উপর। চার ডিফেন্ডারের সামনে দুইজন মিডফিল্ডার (ডবল পিভট)। এরাই মাঝমাঠে বল কাড়বে, আবার পজেশন ধরেও রাখবে!
বড় সুবিধা দুটি—
১. ডিফেন্সে নামলেই দল হয়ে যায় ৪-৪-২–এর মতো কমপ্যাক্ট ব্লক। উইঙ্গাররা নিচে নেমে গেলে দুই লাইন তৈরি হয়। যা ভাঙতে প্রতিপক্ষের রীতিমতো ঘাম ছুটে যায়। জার্মানি, ফ্রান্স—ঐতিহ্যগতভাবে এই নকশাতেই সাফল্য পেয়েছে।
২. আক্রমণে উঠে গেলেই মাঠ লম্বা আর চওড়া দু’দিকেই খোলে। ফুল-ব্যাকরা উইংয়ে ওঠেন। ‘নম্বর ১০’ ঢুকে পড়েন হাফ-স্পেসে। কাউন্টার বা সেট অ্যাটাক—দুটোতেই সুবিধা।
ফ্রান্সের উদাহরণ ধরা যাক। মাঝমাঠে কামাভিঙ্গা–চুয়ামেনি ডবল পিভট, সামনে গ্রিজম্যানের স্বাধীনতা, উইংয়ে এমবাপে। এই ফর্মেশনই ওদের সবচেয়ে ‘অর্গ্যানিক’ সিস্টেম।
কেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটা জনপ্রিয়?
জাতীয় দলে ক্লাব ফুটবলের মতো সময় নিয়ে জটিল অটোমেশন তৈরির সুযোগ নেই। ডবল পিভট দ্রুত রসায়ন তৈরি করে দেয়—ডিফেন্সের সামনে দেয়াল, আক্রমণে পাস-চক্র শুরু। ২০২৬-এ অনেক দলই তাই ‘ডিফল্ট বেট’হিসেবে ৪-২-৩-১-এ নামবে।
৪-৩-৩: নিয়ন্ত্রণের দর্শন
৪-২-৩-১ যেখানে ভারসাম্যের, ৪-৩-৩ সেখানে পুরোটা নিয়ন্ত্রণের খেলা। বল দখলে রাজত্ব করতে চাইলে এটাই অন্যতম পন্থা। বিশেষ করে যেসব দল বলের দখল রাখতে চায়, পজেশনাল প্লে-তে বিশ্বাসী—ওদের কাছে এই ফর্মেশন মন্ত্রের মতো। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকে সিঙ্গল পিভট। এই জায়গায় খেলা ফুটবলার টেম্পো সেট করেন, রিদম ধরে রাখেন, ডিফেন্স ও আক্রমণের সেতু হিসেবে কাজ করে। এর তিনটি মূল স্তম্ভ:
১. মিডফিল্ড ট্রায়াঙ্গেল যেটা পাস-চক্র সহজ করে। এক পিভট+দুই ইন্টারিওর মিডফিল্ডার—এই ত্রিভুজ সবচেয়ে কার্যকর বিল্ডআপ কাঠামোগুলির একটি।
২. উইঙ্গাররা মাঠ চওড়া করেন। থাকেন উপরে, যাতে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে টেনে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে! এতে সেন্ট্রাল লাইন খুলে যায়।
৩. অন্যতম কৌশল হাই প্রেস। বিপদ জমতেই দমন। আর্জেন্তিনা–স্পেন–ব্রাজিল—তিন দেশই এই হাই প্রেসের উপর দাঁড়িয়ে বিশ্বসেরা।
বড় উদাহরণ আর্জেন্তিনা! স্কালোনি ৪-৩-৩ কে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যাতে এটা মুহূর্তে ৪-৪-২ বা ৪-২-৩-১ হয়ে যেতে পারে। মেসি ‘ডান উইঙ্গার’হলেও বাস্তবে নামেন মিডফিল্ড–অ্যাটাক সংযোগস্থলে। পুরো খেলাটা নিয়ন্ত্রণ করেন সিঙ্গল পিভট (এনজো/পারেদেস)। এখন বিশ্বের ৮০% এলিট ক্লাব এই সিস্টেমের ভ্যারিয়েশন খেলছে। যে কারণে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়েরা এই কাঠামোয় স্বচ্ছন্দ।
৩-৪-৩ বা ৩-৫-২: বিশেষ পরিস্থিতিতে ভয়ঙ্কর
অনেকেই ভাবেন, ব্যাক–থ্রি মানে রক্ষণাত্মক ফুটবল। কিন্তু আদতে উল্টোটা ঠিক। ব্যাক–থ্রি ফর্মেশন এমন দলই খেলে যাদের—উইংয়ে আছে প্রবল দৌড়ে ফ্ল্যাঙ্ক কভার করার ক্ষমতা, বল পায়ে আত্মবিশ্বাসী তিনজন সেন্টার-ব্যাক আর দল হিসেবে যারা প্রতিপক্ষকে সেন্ট্রাল জোনে ঠেকিয়ে রাখতে প্রস্তুত!
ব্যাক–থ্রি ফর্মেশন কেন কার্যকর?
১. দুই স্ট্রাইকারের বিরুদ্ধে তিন ডিফেন্ডার—সংখ্যাগত সুবিধা। অনেক আন্ডারডগ দল বড় দলের বিরুদ্ধে এটাই ব্যবহার করে।
২. উইং-ব্যাকরা ওয়াইড ওভারলোড তৈরি করে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া—এই মডেলেই প্রতিপক্ষকে অবাক করে দিয়েছে বারবার।
৩. ট্রানজিশন—সুযোগ পেলেই তিন পাসে বক্সে। ৩-৪-৩–এ ফ্ল্যাঙ্ক দিয়ে কাউন্টার অ্যাটাক ভয়ঙ্কর! ইংল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়া পরিস্থিতি অনুযায়ী এই ফর্মেশন ব্যবহার করতে পারে।
এখন ফুটবলে সবচেয়ে কঠিন পজিশন যদি কিছু থাকে, তা হল—ফুল-ব্যাক/উইং-ব্যাক। এরা আধুনিক ফুটবলের অজানা নায়ক—প্রতিটি সিস্টেমে বিরাট ভূমিকা। ওভারল্যাপ, আন্ডারল্যাপ, ক্রস, ইনভার্ট হয়ে মিডফিল্ডে ঢোকা, প্রেস ট্রিগার শুরু করা, ট্রানজিশনে পেছনে ছুটে এসে কভার… অর্থাৎ এক পজিশনে চার পজিশনের দায়িত্ব সামলাতে হয়। যে দেশে ফুল-ব্যাক প্রতিভা রয়েছে—সেই দেশের ফর্মেশন অপশনও বেশি। স্পেন–ফ্রান্স–ইংল্যান্ড এই জায়গায় এগিয়ে। পেছনে ব্রাজিল–পর্তুগাল!
যে কারণে অনেকেরই বিশ্বাস, ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘ফিক্সড’ ফর্মেশন বলে কিছু থাকবে না। ৪-৩-৩ দলও বল হারালে ৪-১-৪-১ হয়ে যায়। ৪-২-৩-১ দল পজেশন নিলে ২-৩-৫ হয়ে দাঁড়ায়। ৩-৪-৩ দল বিল্ড–আপে ৩-২-৫ আবার রক্ষণে ৫-৪-১। অর্থাৎ: জিতবে সেই দল যাদের খেলোয়াড়রা একাধিক রোলে স্বচ্ছন্দ। আধুনিক ফুটবল এখন এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে বল দখল, পজিশনিং, প্রেসিং—সবটাই এক সুতোয় বাঁধা। যে দল এই সুতোটাকে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে কাজে লাগাবে, তারাই উত্তর আমেরিকার মাটিতে হাতে তুলবে কাপ!