কারণ যাই হোক না কেন, এতদিন যিনি বাজারের সবচেয়ে জোরালো, সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন, তাঁর চুপ করে যাওয়াটা ফুটবল রাজনীতির বড় ইঙ্গিত। প্রশ্ন একটাই—এ নীরবতার পরে কি ঝড় আসবে, নাকি ইত্তিহাদের পশ্চিমে ধীরে ধীরে গাঢ় হবে সান্ধ্যবিষাদ?

পেপ গোয়ার্দিওলা
শেষ আপডেট: 12 August 2025 14:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন: ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি?’
এই পঙক্তিটিকেই একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন রাখা যায়: ট্রান্সফারের জলসায় নীরব কেন পেপ?
ম্যাঞ্চেস্টার সিটির ম্যানেজার তিনি। পেপ গোয়ার্দিওলার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে খোলা চেকবই, দুনিয়ার সেরা প্রতিভা যাঁর টার্গেট লিস্টে আর মরশুম শুরুর আগে খোলনলচে বদলে স্কোয়াড নতুন মেজাজে সাজানো। বার্সেলোনায় ইব্রাহিমোভিচ, বায়ার্নে গোটজে-থিয়াগো, সিটিতে ডি ব্রুইনে, রদ্রি, গ্রিলিশ, হালান্ড—তালিকা ক্রমশ দীর্ঘায়িত হয়েছে! ২০০৮ থেকে এখনও পর্যন্ত পেপের অধীনে থাকা সমস্ত ক্লাব মিলিয়ে ট্রান্সফার মার্কেটে ব্যায়ের অঙ্ক প্রায় ১.৭ বিলিয়ন পাউন্ড। শুধু সিটিতেই ২০১৬-২৪ সময়পর্বে খরচ ১.১ বিলিয়ন ছুঁয়েছে।
এহেন বিনিয়োগের বহরে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কারও দাবি, পেপ গোয়ার্দিওলার গরিমা টিকেই রয়েছে ক্লাবের বদান্যতায়, খরচের আতিশয্যে। তিনি দল গোছাতে ফুটবলার কেনেন না, ময়দানে নামার আগে বাকিদের কুপোকাত করতে প্রভূত অর্থ ঢেলে নিজেদের নিশ্ছিদ্র করে তোলেন। তাঁর অধীনে মাঝারি মানের ফুটবলার কেরিয়ারের সেরা ফর্ম ছুঁয়েছেন—এমন হিসেব হাতেগোনা। মোটামুটি ভাল খেলোয়াড়কে শীর্ষে তুলে দিতে ব্যর্থ পেপ গোয়ার্দিওলা।
এর উলটো হিসেব নিশ্চয় তুলে ধরা সম্ভব। কিন্তু অতি বড় পেপ-সমর্থকও একবাক্যে মেনে নিতে বাধ্য: বিনিয়োগ ছাড়া একটি সিজনেও তিনি সাফল্য পাননি। তাহলে এবার এই হিসেব পালটে গেল কেন? বিষয়টা কি গোয়ার্দিওলার হাত থেকে রাশ ফসকে যাওয়া? নাকি সিটির রণকৌশল পরিবর্তন?
কারণ যাই হোক, চলতি গ্রীষ্মের ট্রান্সফার মার্কেটে তাঁর নীরবতা নজর কেড়েছে। গত বছর যেখানে জোসকো গার্দিওল, মাতেও কোভাচিচ, জেরেমি ডকু, মাতেউস নুনেসের মতো খেলোয়াড় এনেছিলেন—খরচ হয়েছিল প্রায় ২১৫ মিলিয়ন পাউন্ড—এবার সেই চমক দেখা যাচ্ছে না।
নীরবতার প্রথম কারণ হয়তো মাঠের বাইরে। যা সিটির নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ১১৫টি ‘ফিনান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’ ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছে। আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি। শাস্তি হলে মোটা অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে পয়েন্ট কাটা—সবই সম্ভব। এমন জাঁতাকলে পড়ে বোর্ড হয়তো বাজেট খরচে হাত গুটিয়েছে!
এই অভিযোগের আগে পর্যন্ত পেপ সবসময় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ উপভোগ করেছেন—কাকে নিতে হবে, কত দামে নিতে হবে—শেষ কথা তিনিই বলতেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আর্থিক ঝুঁকি সামলানোই বোর্ডের অগ্রাধিকার। ফলে পেপের সেই স্বাধীনতা খানিকটা খর্ব হয়েছে ঠিকই।
আর এই প্রসঙ্গে ঘনিয়ে উঠেছে আরেকটা বড় প্রশ্ন—পেপ কি নিজে থেকেই বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন? জল্পনাটা আরও উসকে উঠেছে দু’বছর আগে একটি সাক্ষাৎকারের সূত্রে। ২০২৩ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সিটির সঙ্গে সময় সীমিত। চিরদিন তো ক্লাবে থাকব না!’ চুক্তি শেষ হচ্ছে এ বছর। আর ইতিহাস বলছে—এক জায়গায় ৪-৫ বছরের বেশি পেপ গোয়ার্দিওলা থাকেন না। সিটিতে ইতিমধ্যে নয় নম্বর মরশুম চলছে। তাই যদি বিদায় ঘনিয়ে আসে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে তাঁর আগ্রহ না থাকাটাই স্বাভাবিক। নতুন স্কোয়াড গড়ে তোলার বদলে হাতে থাকা খেলোয়াড়দের নিয়েই হয়তো শেষপ্রহরের লড়াইটা চালিয়ে যেতে চাইছেন!
তবে নীরবতার আরও একটি সম্ভাব্য কারণ—সিটি তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। এখন পেপের হাতে এমন স্কোয়াড, যা যথেষ্ট স্থিতিশীল। ফোডেন, রদ্রি, বের্নার্দো, হালান্ড, ডি ব্রুইনে—সবাই চূড়ান্ত ফর্মে। চূড়ান্ত একাদশে এখনও কোনও বড় ফোঁকর নেই। এমন অবস্থায় হুট করে ৮০-৯০ মিলিয়ন পাউন্ড উড়িয়ে কেনাকাটা করাটা বাতুলতা। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ: সিটি এখন ‘টার্গেটেড রিক্রুটমেন্ট’ মডেলে সরে গিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে শুধু ব্যাক আপ বা ফিউচার প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা হবে। এর বড় উদাহরণ জেরেমি ডকু কিংবা নুনেস। তাঁদের কেনা হয়েছিল নির্দিষ্ট স্কোয়াড গ্যাপ পূরণের উদ্দেশ্যে, বাজারে দাপট দেখাতে নয়।
ট্রান্সফার বাজার এই মুহূর্তে অস্বাভাবিকভাবে স্ফীত। মাঝারি মানের প্রতিভাও ৫০ মিলিয়নের কমে পাওয়া যায় না। রিয়াল মাদ্রিদ এমবাপ্পেকে কার্যত ‘বিনামূল্যে’ (ফ্রি ট্রান্সফার) পেলেও সাইনিং বোনাস বাবদ বিপুল অর্থ দিয়েছে। আর্সেনাল, চেলসি, লিভারপুল—সবাই প্রচুর খরচ করলেও বাজারের দৃষ্টিতে সেটা অনেক সময় ‘ওভারপে’। সিটি সেই দৌড়ে শামিল হয়নি। আর্থিক সতর্কতা ও স্কোয়াডের স্থিতিশীলতা—দুটো মিলে তারা একধরনের বিচক্ষণ কৌশল অবলম্বন করেছে।
কারণ যাই হোক না কেন, এতদিন যিনি বাজারের সবচেয়ে জোরালো, সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন, তাঁর চুপ করে যাওয়াটা ফুটবল রাজনীতির বড় ইঙ্গিত। প্রশ্ন একটাই—এ নীরবতার পরে কি ঝড় আসবে, নাকি ইত্তিহাদের পশ্চিমে ধীরে ধীরে গাঢ় হবে সান্ধ্যবিষাদ?