ফিফার এই প্রকল্পে আরও জল ঢেলে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভিসা নীতি। আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশকেই ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাম্প সরকার। যার জেরে গ্যালারি পুরোপুরি দর্শক শূন্য।

ফাঁকা স্টেডিয়ামে হচ্ছে ক্লাব বিশ্বকাপ
শেষ আপডেট: 19 June 2025 14:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্লাব বিশ্বকাপ (FIFA Club World Cup) নিয়ে বলতে গেলে এক কথায় জুয়া খেলেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো (FIFA President Jianni Infantino)। এর আগে ক্লাব বিশ্বকাপ হত মহাদেশগুলির চ্যাম্পিয়ন দলগুলিকে নিয়ে। সাতটি দেশ অংশগ্রহণ করত ও সাতটি ম্যাচ হতো। কিন্তু এবার অংশ নিচ্ছে ৩২টি দল আর ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬৩। এবং অর্থের পরিমাণ ১৬.৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে এক বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু ইনফ্যান্তিনোর মস্তিষ্কপ্রসূত এই টুর্নামেন্ট নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। প্রধান কারণ হল অ্যাপিয়ারেন্স ফি। যে টাকা রিয়াল মাদ্রিদ চেলসি বা ম্যানচেস্টার সিটিকে দেওয়া হচ্ছে তার এক তৃতীয়াংশও পাচ্ছে না নিউজিল্যান্ডের ক্লাব অকল্যান্ড সিটি। পাশাপাশি অনেক প্রাক্তন ফুটবলারই প্রশ্ন তোলেন, মরশুমের শেষে এই টুর্নামেন্ট, বড় দলগুলি কতটা আগ্রহ দেখাবে এই প্রতিযোগিতাকে নিয়ে।
এদিকে পরের বছরই রয়েছে বিশ্বকাপ। ফুটবলাররা চোট-আঘাতের ভয়ে সেরাটা উজার করে দেবেন না। পরের মরশুমের কথা ভেবে ক্লাবগুলিও তাদের ফুটবলারদের ক্লান্ত করতে চাইবে না। এবং বাস্তবিকই সেটা দেখা যাচ্ছে এবারের টুর্নামেন্টে। হয়তো এই প্রতিযোগিতা ফুটবলকে আরও বিশ্বজনীন করেছে, কিন্তু যতটা আগ্রহ দেখা যাবে ভাবা গিয়েছিল, ততটা কিন্তু হয়নি। ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার হলেও টিআরপি কিন্তু খুবই কম। ফুটবল-বিশ্বেরও সেই অর্থে আগ্রহ নেই।
আসলে ফুটবলপ্রেমীরা এখনও এই ধারণাটি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি। টিকিট বিক্রি কম। ফিফা অবশ্য দাম কমিয়ে আংশিকভাবে অর্থ ফেরত দিয়েছে। ইন্টার মিয়ামি-আল আহলি ম্যাচের জন্য শিক্ষার্থীদের টিকিটের দাম রাখা হয়েছিল মাত্র চার ডলার। কিছু দর্শককে বিনামূল্যেও ঢুকতে দেওয়া হয়।
তবে ফিফার এই প্রকল্পে আরও জল ঢেলে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভিসা নীতি (Trump's VISA policy)। আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশকেই ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাম্প সরকার। যার জেরে গ্যালারি পুরোপুরি দর্শক শূন্য।
গত সোমবার আটলান্টার মার্সিডিজ–বেঞ্জ স্টেডিয়ামে লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির বিপক্ষে ম্যাচ ছিল চেলসির। সেই ম্যাচ শেষে অবাক চেলসির কোচ এনজো মারেসকা বললেন “একটা অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ। কেমন জানি লাগছিল।” আসলে মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৭০ হাজারের বেশি। কিন্তু সেদিনের ম্যাচ দেখতে গ্যালারিতে ছিলেন মাত্র ২২ হাজার দর্শক। মানে তিন ভাগের এক ভাগ মাঠও ভরেনি।
ইউরোপজুড়ে ভরা গ্যালারির উন্মাদনায় খেলতে অভ্যস্ত ইপিএলের ক্লাব চেলসি। এ রকম ফাঁকা মাঠে খেলতে কোচের কাছে তো অদ্ভুত লাগবেই। অথচ ম্যাচটা ছিল ক্লাব বিশ্বকাপের!
এদিকে প্রাক-মরশুমে প্রীতি ম্যাচ খেলতে শেষবার চেলসি যখন আমেরিকা গিয়েছিল, প্রতি ম্যাচে গড়ে দর্শক হয়েছিল ৫০ হাজারের মতো। অথচ সেই চেলসির ক্লাব বিশ্বকাপের ম্যাচে দর্শক মাত্র ২২ হাজার।
শুধু ওই একটি ম্যাচ নয়, এখনও পর্যন্ত ক্লাব বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচেই গ্যালারির বেশির ভাগ অংশ ছিল খালি। আটলান্টা, সিয়াটল, নিউ জার্সি, অরল্যান্ডো, সব মাঠেই একই চিত্র।
অথচ ফিফা বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে নতুন ফরম্যাটের ক্লাব বিশ্বকাপ শুরু করেছে এবার। ফিফার সভাপতি জানিয়েছিলেন, এটি হতে চলেছে স্বপ্নের টুর্নামেন্ট। ইনফ্যান্তিনো বলেছিলেন, “এটা হবে ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব।” কিন্তু কোথায়!
ফাঁকা গ্যালারির কারণ হিসাবে প্রথমেই উঠে আসছে ফিফার ‘লুটেরা’ নীতি। টিকিটের দাম অত্যন্ত চড়া। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রথমে হয়তো ভেবেছিল, আমেরিকানরা সব সময় পয়সা খরচের ফন্দিফিকির খোঁজে। নিশ্চই তারা এই মেগা টুর্নামেন্টের টিকিট কাটতে কৃপণতা দেখাবে না। তাই গত বছরের ডিসেম্বরে যখন প্রথম টিকিট ছাড়া হল, উদ্বোধনী ম্যাচের সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম ছিল ২২৩ ডলার। সাধারণ গ্রুপ ম্যাচের টিকিটের দাম ১০০ ডলারের উপর। এর সঙ্গে রয়েছে খাবার, পানীয়, পার্কিং। সব মিলিয়ে একটি ম্যাচ দেখতে যা খরচ, সেটা হিসাব করে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল–সমর্থকদের সংগঠন ইনডিপেনডেন্ট সাপোর্টার্স কাউন্সিল তো সরাসরি বলে দিয়েছিল, ফুটবল-ভক্তদের শোষণ করা হচ্ছে।
এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর অবশ্য ফিফার টনক নড়েছে। বিক্রিবাট্টা একদমই নেই দেখে বাধ্য হয়েই টিকিটের দাম কমিয়েছে। গ্রুপ পর্বের ৩৩টি ম্যাচের টিকিটের দাম ২৫ শতাংশের বেশি কমানো হয়েছে। মে মাসের শেষের দিকে, ৪৮টি গ্রুপ ম্যাচের ২৬টির টিকিট ৫০ ডলারের কমে পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু তত দিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে। দর্শকদের উৎসাহের পারদ একদম নেমে গিয়েছিল।
দর্শক শূন্য হওয়ার আরও একটা কারণ রয়েছে। সেটি হল, বেছে বেছে সব বড় স্টেডিয়ামে খেলা ফেলা। ইয়াহু স্পোর্টসের এক প্রতিবেদন বলছে, এ ক্ষেত্রে ফিফা তার আমেরিকান প্রতিনিধিদের পরামর্শ কানে নেয়নি। তাঁরা ছোট স্টেডিয়ামে খেলা আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেখানে ধারণক্ষমতা কম হলেও গ্যালারি ভরা থাকত। কিন্তু ফিফা বেছে নিয়েছে বিশাল বিশাল ফুটবল স্টেডিয়াম। যার অনেকগুলোর ধারণক্ষমতা ৭০-৮০ হাজার। আর ৮০ হাজার আসনের স্টেডিয়ামে যদি মাত্র ২০ হাজার দর্শক হয়, গ্যালারি তো ফাঁকা মনে হবেই।
এক্ষেত্রে আরও একটি কারণ উঠে এসেছে। ক্লাব বিশ্বকাপের প্রচার নিয়ে সেভাবে উদ্যোগী হয়নি ফিফা। সেই সঙ্গে তারা এমন কিছু প্রচার শুরু করেছিল, যা পুরোটাই গোলমেলে। ঠাসা সূচির মধ্যে এমন একটা বড় টুর্নামেন্ট খেলতে চায়নি ইউরোপের বড় ক্লাবগুলি। তারা সরাসরি এর বিরোধিতা করেছিল।
এরপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সৌদি আরবের আর্থিক সমর্থনে একটি সম্প্রচার চুক্তি করে ফিফা এই টুর্নামেন্ট শুরু করে। কিন্তু তারা ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের বোঝাতেই পারেনি যে, কেন তারা এই টুর্নামেন্ট করছে।
আসলে ফিফা সভাপতির মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি ঝলমলে ট্রফি বানিয়ে নিজের প্রচার। আর এ জন্য তাঁর বেশ কিছু মন্তব্য ছিল খুবই চটকদার। শূন্যগর্ভ সেই মন্তব্যগুলি ভালভাবে নেয়নি ফুটবল-বিশ্ব। ইনফ্যান্তিনো বারবার একটা কথাই বলে গিয়েছেন, এই ক্লাব বিশ্বকাপ হবে ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও সেরা টুর্নামেন্ট। বিশ্বের সেরা ৩২টি ক্লাবের সেরা খেলোয়াড়েরা খেলবেন। আমেরিকায় আসবেন প্রচুর দর্শক। আর ঘরে বসে দেখবেন ৪০০-৫০০ কোটি দর্শক। কিন্তু কোনওটাই হয়নি। এটি শেষ পর্যন্ত একটি প্রীতি টুর্নামেন্টের চেয়ে বেশি কিছু নয়।
তবে দর্শক সংখ্যা হয়তো কিছুটা বাড়ত। কিন্তু তাতে বাধ সেধেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অদ্ভুত ভিসা নীতি। তবুও যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলা দেখতে আগ্রহী ছিলেন, তাঁদের উৎসাহে ভাটা পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া ভিসা নীতির কারণে।
ট্রাম্প প্রশাসন অনেক দেশের নাগরিকদেরই ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন বেশ কড়া নীতি নিয়েছে। মিশরের ক্লাব আল আহলির সমর্থকরা জানিয়েছেন, তাঁরা খেলা দেখতে চেয়েছিলেন। সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদন করেছিলেন এবং ১৮৫ ডলার ফি–ও দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের আবেদন বাতিল হয়ে যায়। পাশাপাশি খরচের কথাও চিন্তা করে অনেক দর্শক পিছিয়ে এসেছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল বিশ্বকাপে খেললেও বা আয়োজন করলেও দেশটি আসলে ফুটবলপ্রেমী নয়। তাদের দেশে অনেক বেশি জনপ্রিয় রাগবি, অ্যাথলেটিকস বা জিমনাস্টিকস। তারা ম্যান সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ বা চেলসির নাম শুনেছেন। কিন্তু বোতাফোগো, এসপেরান্স তিউনিস, অকল্যান্ড সিটি তাদের কাছে অচেনা। কেনই বা তারা এই সব দলের খেলা দেখবেন পয়সা খরচ করে।
এদিকে ফিফা ম্যাচগুলির যে সময়সূচি রেখেছে তাও অদ্ভুত। আটলান্টা, নিউ জার্সি বা সিয়াটলে ম্যাচের সময় ছিল বেলা ৩টা বা দুপুরের ১২টা, তা–ও আবার সপ্তাহের কর্মদিবসে। টেলিভিশনের বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দর্শকদের ধরতে এ রকম সময়সূচি ঠিক করেছে ফিফা। কিন্তু স্থানীয় দর্শকদের কাছে মাঠে গিয়ে খেলা দেখার জন্য এটা মোটেও ভাল সময় নয়।
শূন্য গ্যালারি দেখে ম্যান সিটির প্রাক্তন ডিফেন্ডার ড্যানি মিলস বলেছেন, এই টুর্নামেন্ট পুরোপুরি অর্থহীন। মিলস বলেন, “আমি বুঝি না ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের কী মূল্য আছে। অকল্যান্ড সিটির মতো ছোট ক্লাবের জন্য এটা হয়তো একটা দারুণ অভিজ্ঞতা, কিন্তু পিএসজি, রিয়াল মাদ্রিদ বা ম্যানচেস্টার সিটির মতো ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবের খেলোয়াড়েরা কি তাঁদের কেরিয়ারের শেষে এই ক্লাব বিশ্বকাপ জেতার জন্য সত্যিই গর্বিত হবেন? এটা আসলে ফিফার টাকা উপার্জনের জন্য একটি সাজানো টুর্নামেন্ট, এর বেশি কিছু নয়।”