আজকের দিনে যেখানে সমর্থক-সংস্কৃতি অনেকটাই কোরিওগ্রাফড—নির্দিষ্ট গান, নির্দিষ্ট নাচ—সেখানে মিচেল কুকা দেখালেন, নৈঃশব্দ্যও বিপ্লব হতে পারে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 January 2026 16:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্কুলে আমরা অনেকেই ‘গো স্ট্যাচু’ খেলেছি। ছুঁমন্তরে অকম্পিত মূর্তি বনে যাওয়া নয়, ভাবলেশহীন কায়দায় ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা যে কী কঠিন কম্ম, জানি বিলক্ষণ। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম ওভাবে? কেউ কয়েক সেকেন্ড। কেউ বড়জোর কয়েক মিনিট!
কিন্তু সেকেন্ড পেরিয়ে মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টা… বিশেষ একটিমাত্র পোজে মূর্তিবৎ দাঁড়িয়ে থাকা, তাও আশপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি যখন উত্তাল, বেজে চলেছে ভুভুজেলা, তালবাদ্যে মুখরিত স্টেডিয়াম, মাঠে খেলা, উপরন্তু সবার নজর আপনার দিকে, সেই অবস্থায় ওভাবে নির্বিকার কায়দায় নিজেকে ধরে রাখা যে কী কঠিন, ভেবে দেখেছি কি কখনও?
ভাবনা, কল্পনা আর বাস্তবের সীমারেখা এবার মুছে দিলেন মিচেল কুকা এমবোলাডিঙ্গা (Michel Kaku Omangila)। ভালবাসেন ফুটবল। কঙ্গোর সমর্থক। কিন্তু ভক্ত যদি কারও হন, তিনি একজন… প্যাট্রিস লুমুম্বা (Patrice Lumumba)। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মুখ! তাঁকে স্মরণ করেই দেশের ফুটবলাররা যখন মাঠে লড়ে চলেছেন, গ্যালারিতে নিস্পন্দ, নিষ্পলক কায়দায় লুমুম্বার বিশেষ একটি মূর্তির পোজ অনুকরণ করে ঠায় ৪৩৮ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন মিচেল কুকা, ওরফে ‘লুমুম্বা ভিয়া’!
নীরবতা যখন প্রতিবাদ, ফুটবল যখন ইতিহাসের মঞ্চ
আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস (AFCON 2025) মানেই চেনা ছবি—ঢাকঢোল, ভুভুজেলা, পতাকার ঢেউ, উন্মাদনা। শব্দ আর রঙের এই উচ্ছ্বাসের মধ্যেই আফকন ২০২৫-এ জন্ম নিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি! কোনও গান নেই, স্লোগান নেই, নেই শরীরী নড়াচড়া। আছে কেবল স্থৈর্যে ফুটে ওঠা সমাদর। ৪ ম্যাচ। মোট ৪৩৮ মিনিট। মিচেল কুকা দাঁড়িয়ে রইলেন এক ভঙ্গিতে—ডান হাত উঁচু, চোখ সামনে, শরীর অনড়। যে ভঙ্গি দেখলেই কঙ্গোর ইতিহাস জানা মানুষদের চোখে ভেসে উঠল লুমুম্বার ছবি। স্বাধীনতার মুখ, ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রতীক।
এই ভঙ্গি কোনও আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। কুকার চোখে লুমুম্বা কেবল রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি স্বজাতির আত্মসম্মানের ভাষা। তিনি সেই মানুষ, যিনি বলেছিলেন—‘মাথা নত করে বাঁচার চেয়ে মাথা উঁচু করে মরাই শ্রেয়!’ কুকার নীরব দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিমূর্ত দর্শনকেই মূর্তি করে তুলল।
স্টেডিয়ামের ক্যামেরা প্রথমে কৌতূহলে লেন্স ঘোরাল তাঁর উপর। একবার। পরে অবাক হয়ে বারবার ফিরে এল। কারণ আশপাশের গ্যালারিতে যখন ঢেউ উঠছে, তখন একমাত্র তিনিই অনড়, প্রস্তরবৎ স্থির। যে বৈপরীত্যই কুকাকে আলাদা করে তুলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে ছবি, ভিডিও। আলোচনা ফুটবল থেকে বাঁক নিয়েছে, ঘুরে গিয়েছে কঙ্গোর ইতিহাসে, লুমুম্বার হত্যা আর আফ্রিকার ‘অসমাপ্ত স্বাধীনতা’য়। দীর্ঘ পদযাত্রা, রাজনৈতিক স্লোগান যা পারেনি, তা করে দেখালেন এক সমর্থক। বুঝিয়ে দিলেন—ফুটবল শুধু নব্বই মিনিটের খেলা নয়, হয়ে উঠতে পারে স্মৃতি ও পরিচয়ের বাহনও!
কান্নার মুহূর্ত: প্রতীক থেকে মানুষ
কিন্তু আদর্শ আর প্রতীকের বাইরেও মানুষী আবেগ অনেক সময় জিতে যায়। সবচেয়ে শক্ত মানুষটিও একসময় ভেঙে পড়েন। আর সেই ভাঙন কখনও কখনও হয়ে ওঠে সবচেয়ে গভীর, মর্মস্পর্শী, করুণাঘন।
কঙ্গো বনাম আলজেরিয়া কোয়ার্টার ফাইনাল সেই মুহূর্তের জন্ম দিল। ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। স্কোরলাইন নড়ছে না। গ্যালারি টানটান। ১১৯ মিনিটে আলজেরিয়ার গোল। কঙ্গোর বিদায়। ঠিক তখনই, প্রায় দু’ঘণ্টা পর প্রথমবার নড়লেন কুকা। উঁচু করা হাত নামল। মুখ ঢেকে ধরলেন। ভিজে উঠল চোখের পাতা। আর এই এক মুহূর্তই তাঁকে ‘লিভিং স্ট্যাচু’ থেকে রক্তমাংসের মানুষে রূপান্তরিত করল। আর এক লহমায় সেই ছবি, ছবির আড়ালে সুপ্ত বার্তা হয়ে উঠল আরও শক্তিশালী। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল মন্তব্য—‘স্ট্যাচু কাঁদছে’, ‘এটা শুধু হার নয়, ইতিহাসের ভার’!
এই কান্না কেবল ম্যাচ হারার যন্ত্রণা নয়। এই কান্না এক দীর্ঘ ইতিহাসের বঞ্চনার বেদনা। লুমুম্বার অসমাপ্ত স্বপ্নের যন্ত্রণা। আফ্রিকার বারবার ভেঙে পড়া, আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্পের করুণ পরিশেষ। কুকা আর একা রইলেন না। লক্ষ মানুষ তাঁর সঙ্গে কাঁদল।
গ্যালারি পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে সম্মান
ভাইরাল মুহূর্ত সাধারণত ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু কুকার ক্ষেত্রে তা ছাড়িয়ে গেল গ্যালারি আর স্ক্রিনের সীমারেখা। তাঁর নীরব প্রতিবাদ নজর কাড়ল প্রশাসনেরও। আলজেরিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (Algerian Football Federation) আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে সম্মান জানাল। উপহার হিসেবে দেওয়া হল আলজেরিয়ার জাতীয় দলের জার্সি—পিঠে লেখা তাঁর ডাকনাম, ‘লুমুম্বা’। প্রতিপক্ষ দেশের পক্ষ থেকে এমন সম্মান বিরল। কিন্তু এখানেই কুকার শক্তি। তিনি ফুটবলীয় শত্রুতাকে ছাপিয়ে এক সমর্থকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে সমষ্টিগত শ্রদ্ধায় বদলে ফেলেছেন। একাহাতে। এখানে জয়-পরাজয় গৌণ। মুখ্য আবেগ, ইতিহাস আর আত্মপরিচয়।
আজকের দিনে যেখানে সমর্থক-সংস্কৃতি অনেকটাই কোরিওগ্রাফড—নির্দিষ্ট গান, নির্দিষ্ট নাচ—সেখানে মিচেল কুকা দেখালেন, নৈঃশব্দ্যও বিপ্লব হতে পারে। কোনও ব্যানার ছাড়া, স্লোগান ছাড়া! ৪৩৮ মিনিট। কোনও শব্দ নেই। চটুল ভঙ্গিমা নেই। অথচ জোরালো বার্তা ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত।
কখনও কখনও সবচেয়ে প্রবল উচ্চারণ আসে নীরবতা থেকে!