লুকা জিদানের আলজিরিয়া বেছে নেওয়া কোনও আপস নয়। এটা পরিচয়ের প্রতি সম্মান, পারিবারিক শিকড়ের স্বীকৃতি আর নিজের কেরিয়ার গড়ার সচেতন সিদ্ধান্ত।

লুকা ও জিনেদিন জিদান
শেষ আপডেট: 26 December 2025 11:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তির গাঢ়, ঘনিষ্ঠ ছায়া। জন্ম ফ্রান্সে। ফুটবল শিক্ষাও ফরাসি কাঠামোয়। তবু আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফ্রান্স নয়, আলজিরিয়ার (Algeria) জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন লুকা জিদান (Luca Zidane)। সিদ্ধান্তটা হঠাৎ নয়, আবেগেরও কিছু বেশি। পারিবারিক শিকড়, নিজের পরিচয়ের খোঁজ আর কেরিয়ারের বাস্তব হিসেব—এই তিনের মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে লুকার আলাদা পথচলা।
শিকড়ের টান: দাদুর দেশ, নিজের পরিচয়
লুকা জিদানের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর পারিবারিক ইতিহাস। পিতৃকুলের শিকড় আলজিরিয়ার কাবাইলি অঞ্চলে। পরিবারে দাদু স্মাইল জিদান ও দিদা মালিকার দেশটাই বরাবর আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। লুকা নিজেই বারবার জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই বাড়ির ভেতরে আলজিরিয়ান সংস্কৃতির (Algerian culture) প্রবল উপস্থিতি। তাঁর কথায়, ‘আলজিরিয়া বললেই আমার প্রথমে দাদুর মুখটা মনে পড়ে।’জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার আগে যাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। মুহূর্তটা ছিল আবেগে ভরা। আজও প্রতিবার আন্তর্জাতিক দলে ডাক পেলে দাদুর ফোন আসে—গর্বিত কণ্ঠস্বরে! এই আবেগটাই লুকার সিদ্ধান্তকে শুধু ফুটবলীয় নয়, ব্যক্তিগত স্তরেও অর্থবহ করে তুলেছে।
বাবার ছায়া থেকে বেরনোর লড়াই
বাবা জিনেদিন জিদান (Zinedine Zidane)—ফ্রান্সের (France) ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আইকন। স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া হয়েছিল, লুকাও একদিন ফরাসি জাতীয় দলের জার্সিতেই নামবেন। যুব স্তরে ফ্রান্সের হয়ে খেললেও সিনিয়র দলে তাঁর অভিষেক হয়নি। ফলে নিয়ম অনুযায়ী অন্য দেশের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল লুকার সামনে।
এই জায়গাতেই বাবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জিনেদিন কখনও ছেলের উপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। উলটে তাঁকে নিজের মতো করে ভাবতে বলেছেন। সেই স্বাধীনতাটাই লুকাকে নিজের পথ বেছে নিতে সাহায্য করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফিফা (FIFA) লুকার দেশবদলের অনুমোদন দেয়। এরপর ডিসেম্বরে আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস বা আফকনে (AFCON) সুদানের বিরুদ্ধে অভিষেকে ক্লিন শিট—স্ট্যান্ডে বসে সেই ম্যাচ দেখেছেন জিনেদিন নিজেই।
বাস্তব হিসেব: সুযোগ যেখানে, সেখানেই বাজি
আবেগের পাশাপাশি কেরিয়ারের হিসেবও গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সের সিনিয়র দলে গোলকিপার পজিশনে প্রতিযোগিতা ভয়ানক। সেখানে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া কঠিন। আলজিরিয়ার ‘ডেজার্ট ফক্সেসে’ কিন্তু ছবিটা আলাদা। এখানে লুকা দ্রুতই প্রথম পছন্দের গোলকিপার হয়ে উঠেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনাও বাস্তব।
ক্লাব ফুটবলেও তাঁর পথচলা স্থির। রিয়াল মাদ্রিদে (Real Madrid) পেশাদার কেরিয়ার শুরু, তারপর স্পেনের সেগুন্ডা ডিভিশনে একের পর এক ক্লাব—রেসিং সান্তান্দার, রায়ো ভায়েকানো, এইবার, এখন গ্রানাডা সিএফ (Granada CF)। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের জায়গা পাকা করছেন।
সব মিলিয়ে, লুকা জিদানের আলজিরিয়া বেছে নেওয়া কোনও আপস নয়। এটা পরিচয়ের প্রতি সম্মান, পারিবারিক শিকড়ের স্বীকৃতি আর নিজের কেরিয়ার গড়ার সচেতন সিদ্ধান্ত। বাবার নাম নয়, নিজের পারফরম্যান্সেই পরিচিত হতে চান লুকা। আলজিরিয়ার জার্সিতে সেই গল্পটাই সবে লেখা শুরু হয়েছে।