সম্ভবত একটাই জিনিস বাকি—আফ্রিকার কোনও দেশের বিশ্বকাপ জয়। সেটাই হতে পারে গেমচেঞ্জার। যতদিন না হচ্ছে, ততদিন আফকন হয়তো ফিফার বুলিংয়ের শিকার হবে, ইউরোপের তাচ্ছিল্য শুনবে।

ছবি: গুগল
শেষ আপডেট: 29 December 2025 14:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যাঁরা দেখেন, জানেন, এই টুর্নামেন্ট কী ভয়ংকর রোমাঞ্চকর! কিন্তু যাঁরা দেখেন না, তাঁদের চোখে এই প্রতিযোগিতা এখনও ইউরো (Euro) আর কোপা আমেরিকার (Copa America) দরিদ্র আত্মীয়। আফ্রিকান নেশনস কাপ—সংক্ষেপে আফকন (AFCON)—নিয়ে দোলাচল আজ নয়, বহুদিনের। অথচ ইতিহাস মেপে দেখলে এর বয়স ইউরো বা কোপার চেয়ে কম নয়। সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবেও আফ্রিকার ফুটবল অগভীর—এমনটা ভাবা মুশকিল। তবু বিশ্ব ফুটবলের সামগ্রিক আলোচনায় আফকন যেন এখনও প্রান্তিক।
বিভেদের কারণ
আসলে বৈষম্যের শিকড় অনেক বিস্তৃত। ইতালির ’৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের গোলকিপার থমাস এন’কোনোকে (Thomas N’Kono) দেখে গোলকিপার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ইতালির কিংবদন্তি জিয়ানলুইজি বুফোঁ (Gianluigi Buffon)। শুধু তাই নয়, নিজের প্রথম ছেলের নামও রেখেছিলেন এন’কোনোর নামে। ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ডাকনামের গোলকিপার ছিলেন রঙিন প্রতিচ্ছবি—যাকে ইউরোপ আফ্রিকান ফুটবলের স্টিরিওটাইপ বলে চেনে: রঙিন পোশাক, উদ্দাম উদযাপন, কখনও আবার হাস্যকর অভিযোগ—ম্যাচের মধ্যেই ‘কালো জাদু’করার অভিযোগে গ্রেপ্তার পর্যন্ত হন! এন’কোনো একা নন। আফ্রিকান ফুটবল বরাবরই ইউরোপীয় চোখে রোমাঞ্চকর, কিন্তু দিনের শেষে সেই ‘অপর’!
উজ্জ্বল আফকন
তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকা দিয়েছে একের পর এক বিশ্বমানের তারকা। জর্জ ওয়েহ (George Weah) সেরি আ-র (Serie A) আইকন। স্যামুয়েল এতো (Samuel Eto’o), দিদিয়ের দ্রোগবা (Didier Drogba), মহম্মদ সালাহ (Mohamed Salah)—ক্লাব ফুটবলের একেক জমানার পোস্টার বয়! আফ্রিকা বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে, ২০৩০ সালে সহ-আয়োজকও বটে। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ৬২টি ক্লাবে খেলছেন ১২৪ জন আফ্রিকান ফুটবলার। স্কাউটরা আজও আফ্রিকার প্রতিটি কোণে ঢুঁ মেরে বেড়ান—যেমন একসময় ঘুরতেন সোনা বা হিরের খোঁজে। বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর পারফরম্যান্সও ক্রমশ উন্নত। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর (Morocco) সেমিফাইনাল—নেহাত কাকতালীয় নয়, বরং উত্থানের ঘোষণা।
আফকন কেন ব্রাত্য?
একটা বড় কারণ ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্ব ফুটবলের গল্প লেখে ইউরোপ। তাদের চোখে আফকন প্রায়শই ‘লিগ-স্পয়লার’। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক য়ুর্গেন ক্লপের (Jurgen Klopp) মন্তব্য। যিনি একসময় আফকনকে বলেছিলেন ‘ছোট টুর্নামেন্ট’। পরে অবশ্য ব্যাখ্যা দেন, প্রশংসাও করেন। কিন্তু ক্ষতিটা যা হওয়ার হয়ে গিয়েছিল। ইউরোপীয় ক্লাব কোচেরা প্রায় নিয়ম করেই আফ্রিকান ফুটবলারদের দেশের হয়ে খেলতে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। দরকষাকষি চলে। শেষমেশ চাপের মুখে ফিফা (FIFA) খেলোয়াড় ছাড়ার সময়সীমা কমিয়ে আনে—দু’সপ্তাহ থেকে ছ’দিনে।
সূচি-সমস্যাও বড় শত্রু। ২০২৫ সালের আফকন হওয়ার কথা ছিল জুন-জুলাইয়ে। কিন্তু ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো (Gianni Infantino) ক্লাব বিশ্বকাপ ঢোকাতে গিয়ে টুর্নামেন্ট পিছিয়ে দেন। এর দায় আফ্রিকান কনফেডারেশনের (CAF) চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থার। আয়োজনে বিঘ্নও নতুন নয়। ২০১২ সালের পর খুব কম বারই নির্ধারিত দেশ ও ক্যালেন্ডার মেনে আফকন হয়েছে। কখনও গৃহযুদ্ধ, কখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা, কখনও ইবোলা, কখনও ভঙ্গুর পরিকাঠামো। ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার—দারিদ্র্য ও সংঘাত—আজও আফ্রিকার বাস্তবতা।
ফিফার দ্বিচারিতা
ফিফা অবশ্য এই অবহেলিত মহাদেশকে ভালবাসে… ভোটের জন্য। ৫৪টি ভোট—বিশ্বে সবচেয়ে বড় ভোটব্যাঙ্ক। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ আফ্রিকায়। বাজার বিশাল। কিন্তু হৃদয় পড়ে সেই ইউরোপেই। ফুটবলের মান, বলা হয়, ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-স্পেনের মতো ‘সিস্টেম্যাটিক’ নয়। অথচ আফ্রিকার ফুটবল যে অন্যরকম—স্বতঃস্ফূর্ত, দ্রুত, শারীরিক, নাটকীয়—একথা কেউ উচ্চারণ পর্যন্ত করে না!
এই দ্বিচারিতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘লয়্যালটি টেস্ট’। আইভরি কোস্টের (Ivory Coast) স্ট্রাইকার সেবাস্তিয়ান হালার (Sebastien Haller) একবার প্রশ্ন শুনে ক্ষেপে গিয়েছিলেন—‘ক্লাব ছেড়ে দেশের হয়ে খেলতে যাবেন?’ জবাব ছিল শানিত: ‘এই প্রশ্নটাই আফ্রিকার প্রতি অসম্মান। ইউরোর আগে কি কোনও ইউরোপীয়কে এমন প্রশ্ন করা হয়?’
কেন দেখবেন আফকন?
সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আফকন এক নিখাদ বিনোদন। গোল আছে, নাটক আছে, ‘বিশৃঙ্খল সৌন্দর্য’ আছে। মরক্কোর ইউসেফ এল কাবির (Youssef El Kaabi) বাইসাইকেল কিক—টুর্নামেন্টের আইকনিক মুহূর্ত। গড় গোলসংখ্যা ২.২—কোপার চেয়ে বেশি, ইউরোর সমান। মাত্র একটিই গোলশূন্য ম্যাচ। এমন প্রতিযোগিতা, যেখানে গ্রুপ পর্বেই চারবারের চ্যাম্পিয়ন ঘানা (Ghana) ছিটকে যায়। নাইজেরিয়া (Nigeria) বিশ্বকাপেও উঠতে ব্যর্থ। অঘটন যেখানে নিয়ম, সেই আয়োজনকে ‘সফল’ না বলে উপায় আছে?
এই টুর্নামেন্ট নতুন তারকার জন্ম দেয়। ১৯ বছরের ইয়ান ডিওমঁদে (Yan Diomande), ফারেস শাইবি (Fares Chaibi), তাওয়ান্ডা মাসওয়ানহিসে (Tawanda Maswanhise)—নামগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসছে। কেউ ইউরোপে পৌঁছয়, কেউ পৌঁছবে। ঔপনিবেশিক বাস্তবতা আজও বদলায়নি—আফ্রিকার রত্ন উজ্জ্বল হয় ইউরোপের বাজারে। তবু প্রতিরোধের গল্পও আছে। ১৯৯৩ সালের বিমান দুর্ঘটনায় ১৮ জন খেলোয়াড় হারানো জাম্বিয়া (Zambia) ১৯ বছর পর জেতে আফকন।
প্রাপ্য সম্মান কবে মিলবে?
সম্ভবত একটাই জিনিস বাকি—আফ্রিকার কোনও দেশের বিশ্বকাপ জয়। সেটাই হতে পারে গেমচেঞ্জার। যতদিন না হচ্ছে, ততদিন আফকন হয়তো ফিফার বুলিংয়ের শিকার হবে, ইউরোপের তাচ্ছিল্য শুনবে। কিন্তু যাঁরা দেখেন, জানেন—আফকন নিছক টুর্নামেন্ট নয়… আনন্দ, উন্মাদনা আর ফুটবলের আদিম সুখ। ইউরোপ-সুগন্ধি তিরস্কার সত্ত্বেও, আফ্রিকান নেশনস কাপ দেখার মতো, ভালোবাসার মতো… এবং অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়ার মতোই।