প্রতিভা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে এর ফসল ঘরে তুলেছেন মেসি। শেষ বিচারে তাঁর ফ্রি-কিকও তাই কিছুটা ফিজিক্স, কিছুটা কাব্য।

লিওনেল মেসি
শেষ আপডেট: 20 June 2025 18:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ম্যাজিকে মায়া আছে। আর আছে বিজ্ঞান।
একইভাবে লিওনেল মেসির ফ্রি-কিক যতই মোহবিস্তার করুক না কেন, অনুগত ভক্তের দেহে-মনে জেগে উঠুক পুলক, তাকে স্রেফ ‘জাদুময়’ কিংবা ‘অবিশ্বাস্য’ আখ্যা দেওয়া যায় না। আড়ালে থাকা বিজ্ঞানেও আলো ফেলা জরুরি।
পোর্তোর বিরুদ্ধে ক্লাব বিশ্বকাপে কেরিয়ারের ৬৮তম ফ্রি-কিক গোলের পর মেসির অবিসংবাদী শ্রেষ্ঠত্ব আলাদা মাত্রা পেয়েছে। সামনে স্রেফ পেলে (৭০) এবং জুনিনহো (৭৭)। ব্রাজিলের এই দুই ফুটবলারই সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন। ৩৭ বছর বয়সে ফুটবলের জমকালো মঞ্চে এখনও কীভাবে নিজের ক্যারিশমা ধরে রেখেছেন মেসি?
তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন যারা, বিশেষ করে বার্সেলোনার অ্যাকাডেমিতে, তাঁরা অবশ্য একবাক্যে স্বীকার করবেন, পরিশ্রম ছাড়া কোনও রসায়ন নেই। বার্সায় যখন ছিলেন, বয়স পনেরো পেরিয়ে ষোলো, তখন ট্রেনিং গ্রাউন্ডে বলের উপর বসে নিবিষ্টচিত্তে দেখে যেতেন রোনাল্ডিনহোর ফ্রি-কিক। নিজে মারতেন না। একটিও না। তখন তিনি দ্রষ্টা, স্রষ্টা নন।
তারপর যখন জতীয় দলে গেলেন, এলেন দিয়েগো মারাদোনার ছত্রচ্ছায়ায়, তখন দুটি পরামর্শকে গুরুমন্ত্র মেনে নিলেন। লিওর ফ্রি-কিকের ধার বাড়াতে মারাদোনার উপদেশ ছিল: ‘বলের মাঝখানে মারো’ এবং ‘এত জলদি বলের থেকে পা সরিয়ে দিও না’। ব্যাস! এই ছোট্ট টোটকাতেই কাজ হাসিল। ফ্রি-কিক মারার নেশা চেপে বসে মেসিকে। প্র্যাকটিস শেষে নাগাড়ে তেকাঠি লক্ষ্য করে কিক মেরে যেতেন। তাতে স্কিল আরও ধারালো হয়। ধীরে ধীরে কৃৎকৌশল আসে নিয়ন্ত্রণে।
এই অভ্যাস কেরিয়ারের প্রান্তলগ্নেও ধরে রেখেছেন মেসি। ইভান রাকিটিচ, বার্সেলোনায় মেসির সতীর্থ, স্বীকার করেন, শুধু ম্যাচের দিন নয়, ট্রেনিংয়েও ফ্রি-কিক থেকে করা গোলে মেসির সাফল্যের হার ঈর্ষণীয়! অর্থাৎ, এর মানে দাঁড়ায়, নব্বই মিনিটের লড়াই যতটা দামি, ঠিক ততটাই গুরুত্বের সঙ্গে অনুশীলন চালাতেন আর্জেন্তিনীয় তারকা। যার ফসল এতদিন পেয়েছে বার্সেলোনা, আর্জেন্তিনা। এবার ঘরে তুলছে ইন্টার মায়ামি।
কিন্তু অনুশীলনই কি সব? বিজ্ঞানের কারবারি যারা, তাঁরা এই দাবি মানতে নারাজ। পাল্টা তুলে এনেছেন বলের ঘূর্ণি ও তজ্জনিত 'ম্যাগনাস এফেক্টে’র তত্ত্ব। ব্যাখ্যার ছলে বলেছেন: মেসি যখন কিক মারেন, তখন বল বাতাসে ঘুরপাক খায়। ফুটবল যখন ঘুরতে ঘুরতে এগোয়, তখন তার এক পাশে বায়ুর চাপ কমে, আরেক পাশে বাড়ে। ফলে তা গোঁত্তা মারে—কখনও ডানদিকে, কখনও বাঁ-দিকে, আবার কখনও গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে উপর থেকে নেমে আসে। একেই পদার্থবিদ্যায় ‘ম্যাগনাস এফেক্ট’ বলে।
ঘূর্ণির পাশাপাশি কোণ, স্পিন আর গতির নিখুঁত সমন্বয়কেও কাজে লাগান মেসি। যেভাবে পা বসান, যে কৌশলে পায়ের পাতা দিয়ে বলের নির্দিষ্ট অংশে আঘাত করেন, তাতে বলের উপর ঘূর্ণি এবং গতি নিখুঁতভাবে চারিয়ে যায়। নিচে আঘাত দিলে বল ওপরে উঠে। একটু পাশ ঘেঁষে মারলে সাইড স্পিন হয়। আবার ব্যাকস্পিনে ফুটবল হঠাৎ ঝপ করে নীচে নামে।
এ তো গেল ফিজিক্সের সূত্র ও তাকে নিক্তি মেপে কাজে লাগানোর কৌশল। পাশাপাশি মনের হিসেবও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। অর্জুন তীর হাতে শুধুমাত্র পাখির চোখেই মন পেতেছিলেন। ফ্রি-কিকের মুহূর্তে মেসি কিন্তু শুধু বলটাই দেখেন না — তিনি নজর রাখেন: সামনে দাঁড়ানো মানবপ্রাচীর, গোলকিপারের দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা, বাতাস কোন দিকে কীভাবে বইছে—সমস্ত দিকে। যাবতীয় তথ্য একবার চোখ দিয়ে স্ক্যান করে নেওয়ামাত্র মনে মনে একটা প্লট ছকে নেন। এই গোটা প্রক্রিয়া এক ধরনের ‘ইন্সটিংক্টিভ ফিজিক্স’, যা সাধারণ চোখে দেখা না গেলেও খেলায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব!
পদার্থবিদ্যা গেল, গণিতও। বাকি রইল শারীরবিজ্ঞান। একেও পুরোদস্তুর ব্যবহার করেছেন লিওনেল মেসি। তাঁর শরীর তুলনায় ছোটখাটো। কিন্তু শক্তি, নমনীয়তা আর পায়ের গঠন অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। অস্ত্র বাঁ-পা। তার গোড়ালি ও পাতা একটি নির্দিষ্ট কোণে ঘুরে এসে বলকে এমনভাবে আঘাত করে, যা অধিকাংশ খেলোয়াড়ের কাছে স্বপ্নের টেকনিক!
শুনতে লঘু মনে হলেও, এই প্রসঙ্গে একটাই কথা বলার। বই আর লাইব্রেরি সবার জন্য উন্মুক্ত। তাকে কেউ কাজে লাগাতে পারে, কেউ পারে না। স্নায়ু-পেশি-পাতা-গোড়ালি নিয়ে গড়ে উঠেছে মানবশরীর। বিজ্ঞানের ভাণ্ডারও উদার, তাতে সবার সমান অধিকার। কিন্তু প্রতিভা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে এর ফসল ঘরে তুলেছেন মেসি। শেষ বিচারে তাঁর ফ্রি-কিকও তাই কিছুটা ফিজিক্স, কিছুটা কাব্য।
এরপর? ‘কিছু মায়া রয়ে গেল…’