নেশনস লিগ ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে নামার আগে যে মেজাজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন, গাইলেন ইয়ামালের গুণকীর্তন…তাতে সকলে একবাক্যে স্বীকার করেছেন এই রোনাল্ডো আর সেই রোনাল্ডো নেই। তিনি বদলে গেছেন।

রোনাল্ডো ও ইয়ামাল
শেষ আপডেট: 8 June 2025 18:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘দয়া করে ওকে বেড়ে উঠতে দিন। অযথা ঘাড়ে প্রত্যাশার বোঝা চাপাবেন না।‘
কথাগুলো বলা হল যাকে নিয়ে, তিনি ইতিমধ্যে বিশ্বফুটবলে হিল্লোল তুলেছেন। উপমান খুঁজতে হাঁকপাঁক করছেন বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকারদের বড় অংশ। কেউ সামনে টানছেন মেসিকে। কেউ ওজনে ভারী বুঝে তুলনায় কিঞ্চিৎ খাটো ডাচ কিংবদবন্তি রবেনে এসে ঠেকছেন।
তুলনা-প্রতিতুলনার খেলা চলুক। কিন্তু ‘প্রতিশ্রুতিমানে’র তকমা ঝেড়ে বেরোনো লামিল ইয়ামাল যে ইতিমধ্যে গটমটে মেজাজে ফুটবল দুনিয়া শাসন করতে শুরু করেছেন, একথা শত্রু-মিত্র সকলে একবাক্যে স্বীকার করছেন। কিন্তু খোলস ভেঙেই পতপত করে উড়ে বেড়ানো স্বাস্থ্যকর নয়। রয়েসয়ে পরিভ্রমণ জরুরি। তাতে পাখার শক্তি বাড়ে, উড়ান হয় দীর্ঘমেয়াদী।
যে কোনও উদীয়মান তারকা যখন সবে ফুটবলের ময়দানে ভূমিষ্ঠ হচ্ছেন, তখন দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার সবিশেষ যত্ন-আত্তি নিয়ে থাকেন। মিডিয়ার কালো নজর এড়িয়ে, সমর্থকদের গগনচুম্বী প্রত্যাশার বেলুনকে দূরে সরিয়ে চেষ্টা করেন সেই খেলোয়াড়কে নিরালায়-নিভৃতে পরিশোধন, সংশোধনের পর আরও শানিত করে তুলতে।
এই যুক্তি যদি ঠিক হয়, তাহলে প্রতিবেদনের একদম গোড়ায় বলা উক্তিটি কার?—এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে, আশা করি, দশজনের দশজনই বুদ্ধি খাটিয়ে জবাব দেবেন: স্পেনের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে। আজ মধ্যরাতে পর্তুগালের বিরুদ্ধে হাইভোল্টেজ ম্যাচ। তার আগে সাংবাদিকদের ক্ষুরধার নজর এড়িয়ে তুরুপের তাসকে আস্তিনে লুকিয়ে রাখতেই এই মন্তব্য করেছেন লুই, অনুমান করবেন সকলে।
বিনীতভাবে জানাতে চাই, এ অনুমান ভুল। গোল্লা। দশে শূন্য। আদতে যিনি লামিল ইয়ামালের ঘাড়ে অযথা চাপের পাহাড় চাপাতে নিষেধ করেছেন, তিনি আর কেউ নন, আসন্ন লড়াইয়ে তাঁর যুযুধান প্রতিপক্ষ রোনাল্ডো… ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো!
উল্টোদিকের শিবিরের তুখোড় খেলোয়াড়কে মানসিকভাবে পিষে না দিয়ে, ফুটবল ময়দানের চালু বুলি ‘মাইন্ড গেমে’ বিপর্যস্ত না করে, রোনাল্ডো যে এভাবে মাইল-কে-মাইল জমি ছেড়ে দিলেন ইয়ামালের সামনে—এটা ঠিক ‘বিচিত্র’ নয়? কেরিয়ারে নিকটতম, প্রবলতম প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিকেও কি কখনও, কোনওদিন এভাবে রেয়াত করেছেন রোনাল্ডো? এক ইঞ্চিও জমি দিয়েছেন? এ কি নেহাতই সৌজন্য? নাকি অনুজের প্রতি বাড়তি বদান্যতা? নাকি এটাই এবার থেকে সিআরসেভেনের ধোঁয়াশাময় রণকৌশল… নিউ নর্মাল?
উত্তরটা হয়তো অবসরের পর কোনওদিন আন্তরিক কোনও সাক্ষাৎকারে মেলে ধরবেন ক্রিশ্চিয়ানো… হয়তো করবেন না। কিন্তু নেশনস লিগ ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে নামার আগে যে মেজাজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন, গাইলেন ইয়ামালের গুণকীর্তন…তাতে সকলে একবাক্যে স্বীকার করেছেন এই রোনাল্ডো আর সেই রোনাল্ডো নেই। তিনি বদলে গেছেন।
নাকি বৃদ্ধ হলেন?
বৃদ্ধ হোন না হোন, বয়স বাড়ুক চায় না বাড়ুক, বনস্পতির ছায়া যে আঠারোয় পা রাখা ইয়ামালের উপর প্রলম্বিত হয়েছে, তা ড্যাবড্যাবে চোখে সকলে দেখেছেন, বিস্মিত হয়েছেন আর কারণ খুঁজেছেন!
সাংবাদিকরা তো বাইনারির কারবারি। একে ওর বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে, অমুককে তমুকের সামনে ভিড়িয়ে মজা লোটেন… থুড়ি হেডলাইন খোঁজেন। তাই দুই দলের লড়াই, এই মুহূর্তে ইউরোপের দুটি ইন ফর্ম টিমের প্রতিদ্বন্দ্বীতা নিয়ে ‘টেকনিক্যাল’ প্রশ্ন করার বদলে সবাই দল বেঁধে লামিলকে নিয়ে পড়েন। ধেয়ে আসে ‘তুলনা’র সওয়াল।
কিন্তু সফট ড্রিঙ্ক নয়, স্বচ্ছ-সাদা বোতলের ছিপি খুলে কয়েক সেকেন্ড অন্তর জল খেয়ে চলা রোনাল্ডো অবতীর্ণ হন ছকভাঙা মেজাজে। কোথায় সেই ঔদ্ধত্য! কোথায় ক্রোধ! পুঁচকে ছেলের সঙ্গে তাঁর তুলনা টানা হচ্ছে দেখে মুহূর্তে রেগে কাঁই রোনাল্ডো আজ অতীত। প্রায় দার্শনিকের মেজাজে ভেসে আসে জবাব, ‘প্রজন্ম বদলে যায়। নতুন আসে। পুরনো বিদায় নেয়। যদি আপনারা আমায় বিদায়ী প্রজন্মের হিসেবে দেখতে চান… তাহলে… ঠিকই আছে।‘
শেষ বাক্যে স্বভাবসিদ্ধ চিমিটি। লুকোতে চেয়েও লুকোতে পারেন না রোনাল্ডো। কিন্তু ফের ফিরে আসা ‘নিউ নর্ম্যালে’। সরাসরি প্রসঙ্গে ঢুকে বলে দেন, ‘ছেলেটা ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সিতে দুর্দান্ত খেলছে। সামনে বড় ম্যাচ। নিজেকে প্রমাণ করার বড় সুযোগ। ওকে বেড়ে উঠতে দিন। অযথা ঘাড়ে চাপ দেবেন না। তবেই তো আমরা আগামী অনেক বছর এমন এক প্রতিভার খেলা দেখে যেতে পারব!’
ফের নিজেকে সামনে টেনে জুড়ে দেন, ‘আমি তো ইয়ামালকে চাপমুক্ত রাখব। ওকে একা ছেড়ে দেব। ওর প্রতিভা অফুরন্ত।‘
বিদায়-আগমন, উদয়-অস্ত… সাংবাদিক, তাত্ত্বিক, বিশ্লেষকরা ‘বাইনারি’ খুঁজে চলুন। কিন্তু আসল সত্যিটা হচ্ছে, লামিল ইয়ামাল মাত্র ১৮ বছর বয়সে যা কিছু ‘অর্জন’ করেছেন, অষ্টাদশী রোনাল্ডো তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেননি। জিতেছেন ইউরো, বার্সার হয়ে দু’দুটো লা লিগা, কোপা দেল রে। ক্লাবের জার্সিতে ইতিমধ্যে খেলে ফেলেছেন ১০৬টি ম্যাচ। জাতীয় দলের হয়ে নেমেছেন ২০টি ম্যাচে। করেছেন ৬ গোল। পা থেকে এসেছে ৯টি অ্যাসিস্ট। রিয়ালের বিরুদ্ধে এল ক্লাসিকোয় চারখানা গোল তো রয়্যাল কেকের উপর বসানো মহামূল্য চেরি!
অন্যদিকে রোনাল্ডো বাইশের কোঠায় পৌঁছে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে লিগ খেতাব জেতেন। ইউরো জিততে ৩১ বসন্ত পেরিয়ে যায়!
কিন্তু স্রেফ দপ করে জ্বলে ফুরিয়ে যাওয়াই তো নয়, ‘প্রতিভা’কে ‘কিংবদন্তি’ করে তোলে খেলোয়াড়ের আয়ু… শীর্ষে থেকে যুদ্ধ লড়ে যাওয়ার সামর্থ্য। সেই ‘সময়ে’র হিসেবে রোনাল্ডো নির্বিকল্প! ৯৩৭ কেরিয়ার গোল… হাজারের লক্ষ্যে ছুটে চলার যে অতন্দ্র সাধনা, সেখানে তিনি তুলনারহিত। তাঁর উপমা তিনি নিজেই। এখনও খিদে আগল ভাঙার। যে জার্মানির বিরুদ্ধে চারবারে একবারও জিততে পারেননি, তাদের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল করার প্রতিস্পর্ধা দেখানোর অন্য নাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো! এখনও ছুটে চলেছেন রানারের মতো। ভুল প্রমাণ করতে, নতুন উপমা খুঁজে নিতে, নতুন চ্যালেঞ্জকে সামনে দাঁড় করাতে!
তিনি বৃদ্ধ হোন, বনস্পতির ছায়া দিন। আর সেই ছায়ার আবডালেই নিরালা-নিভৃতে বেড়ে উঠুক সবুজ-প্রাণবান চারা। লামিল ইয়ামার তাঁর নাম।
তাঁকে বাড়তে দিন!