আসল লক্ষ্য হয়তো এখনও বাকি—আসন্ন বিশ্বকাপ অথবা রোমান্টিক কোনও প্রত্যাবর্তন। ইউরোপের কোনও বড় ক্লাবে ফেরা। কিংবা, আরও আবেগ মিশিয়ে ভাবলে, শৈশবের ক্লাব স্পোর্টিং-এ ফিরে খেতাব জিতে নেওয়া। এর বাইরে, তাঁর ফুটবলজীবনের এই অধ্যায়টা ক্রমশ রূপ নিচ্ছে অন্য কিছুর প্রতীকে।

রোনাল্ডো
শেষ আপডেট: 10 February 2026 18:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ কবে সত্যিই মনে গেঁথে থাকা কোনও গোল দেখেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর (Cristiano Ronaldo)? একটু ভেবে দেখুন। ইউটিউব রিলস নয়, হাইলাইটস নয়—মনে দাগ কেটে যাওয়া, ম্যাচের স্রোত ঘুরিয়ে দেওয়া কোনও গোল, মনে পড়ে? প্রশ্নটা অস্বস্তিকর, কারণ উত্তরটা ধোঁয়াটে।
সংখ্যা, হিসেব, ইতিহাস বলবে তিনি থেমে যাননি। সৌদি আরবে যাওয়ার পর লিগে নব্বইয়ের বেশি গোল। আন্তর্জাতিক স্তরে নেশনস লিগে জার্মানির বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের জয়সূচক গোল, স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনাল—সবই আছে। কিন্তু স্মৃতি? আবেগ? সে সব কি আগের মতো?
আসলে সত্যি বলতে সমস্যা গোলের নয়। সমস্যা প্রেক্ষাপটের। আজ রোনাল্ডো এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে তিনি ফুটবল খেলছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর উপস্থিতির গুরুত্ব তৈরি হচ্ছে অন্য কারণে। খেললে নয়—তিনি না খেললে খবর হচ্ছে। এটাই বাঁকবদলের আসল ইঙ্গিত।
গোলের পরিসংখ্যান বনাম স্মৃতির শূন্যতা
কাতার বিশ্বকাপের পর থেকেই এক ধরনের ক্লান্তি কাজ করছে। শুধু রোনাল্ডোর শরীরে নয়—দর্শকের মনেও। পর্তুগালের কোচ তাঁকে বেঞ্চে বসালেন। বদলি হিসেবে নামা র্যামোস (Goncalo Ramos) করলেন হ্যাটট্রিক। সেদিন থেকেই প্রশ্নটা জোরালো—এই দল কি সিআরসেভেনকে ছাড়াই এগোতে পারে?
এরপর এল সৌদি অধ্যায়। আল নাসেরে (Al Nassr) যোগ দিলেন। উদ্দেশ্য শুধু ফুটবল নয়—সৌদি লিগকে (Saudi Pro League) গ্লোবাল ব্র্যান্ড বানানো। যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর মুখ। তিন বছরে একশোর বেশি গোল। কিন্তু বড় ট্রফি? নেই। লিগ? নেই। এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ? নেই। সবচেয়ে বড় কথা—এই গোলগুলোর খুব কমই গড় দর্শকের স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে। যদি আপনি পর্তুগিজ, সৌদি বা রোনাল্ডো-ভক্ত না হন, তাহলে হয়তো একটাও মনে নেই।
এটা তাঁর ব্যর্থতা নয়। আধুনিক ফুটবলের বাস্তবতা। যেখানে প্রিমিয়ার লিগ আর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এত গর্জন তৈরি করে, যে অন্য সবকিছু চাপা পড়ে যায়। এক বিলিয়ন ফলোয়ারও সেখানে যথেষ্ট নয়।
না খেলাই কেন বড় খবর?
এই সপ্তাহে রোনাল্ডো আবার শিরোনামে। কারণ? তিনি খেলেননি। আল নাসের (Al Nassr) তাঁকে ছাড়াই আল রিয়াধের বিরুদ্ধে জিতল। গোল করলেন সাদিও মানে। তারপর আল ইত্তিহাদের ম্যাচেও পর্তুগিজ তারকা স্কোয়াডে নেই। ফুটবলগত দিক থেকে খুব বড় কিছু নয়। টিম জিতেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়া? ফুটবল মহলে ঝড় বইল। এই অনুপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ফুটবলের চেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এল: রোনাল্ডোর সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক। তাঁর ভূমিকা—শুধু স্ট্রাইকার নাকি ‘প্রজেক্টে’র মুখ?
আগে রোনাল্ডো না খেললে মানে দাঁড়াত—প্রতিপক্ষ দুর্বল। টানেলে দাঁড়িয়েই ১–০ এগিয়ে থাকার বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া। এখন মানে বদলেছে। এখন তাঁর না খেলার অর্থ রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, ব্র্যান্ড-সংক্রান্ত জল্পনা। এই জায়গাতেই তিনি ডেভিড বেকহ্যাম-থ্রেশহোল্ড পেরিয়ে গিয়েছেন। ফুটবলের জন্য বিখ্যাত থেকে ‘বিখ্যাত হওয়ার জন্য বিখ্যাত’ হয়ে উঠেছেন। সৌদি লিগের গোলের চেয়ে বেশি আলো পড়ছে—তিনি কবে বিলিয়নিয়ার হলেন, কার সঙ্গে সেলফি তুললেন, হোয়াইট হাউসে কার পাশে দাঁড়ালেন—এইসব নিয়ে! ফুটবল সেখানে সাবপ্লট।
উত্তরাধিকার প্রশ্ন
প্রশ্নটা কঠিন, কিন্তু জরুরি। রোনাল্ডোর উত্তরাধিকার কি আর বদলাবে? মাইকেল জর্ডানের মতো উদাহরণ সামনে আছে। শিকাগো বুলসেই লেগ্যাসি লেখা হয়ে গিয়েছিল। ওয়াশিংটন উইজার্ডস তাতে নতুন কিছু যোগ করেনি। রোনাল্ডোর ক্ষেত্রেও কি তাই? হাজার গোল পূর্ণ করা? সৌদি লিগ জেতা? এগুলো পরিসংখ্যানে যোগ হবে। কিন্তু ইতিহাসে?
আসল লক্ষ্য হয়তো এখনও বাকি—আসন্ন বিশ্বকাপ অথবা রোমান্টিক কোনও প্রত্যাবর্তন। ইউরোপের কোনও বড় ক্লাবে ফেরা। কিংবা, আরও আবেগ মিশিয়ে ভাবলে, শৈশবের ক্লাব স্পোর্টিং-এ ফিরে খেতাব জিতে নেওয়া। এর বাইরে, তাঁর ফুটবলজীবনের এই অধ্যায়টা ক্রমশ রূপ নিচ্ছে অন্য কিছুর প্রতীকে। যেখানে খেলাধুলো, মিডিয়া আর বিনোদন একাকার। যেখানে ফুটবল আর কেন্দ্র নয়—একটা উপাদান মাত্র! এই কারণেই রোনাল্ডো আজ ‘পোস্ট-ফুটবল’। ফুটবলের ভেতরেই ফুটবলের পরের ধাপ। তিনি খেললে আমরা গোল গুনি। না খেললে আরা অর্থ খুঁজি। এটাই বদলে যাওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় সত্য।