মোদ্দা বিষয় দাঁড়াল: আর্সেনাল ধারাবাহিক, সিটি অভিজ্ঞ, চেলসি অনুপ্রাণিত, নিউক্যাসল ক্ষুধার্ত। কিন্তু লিভারপুল সাম্রাজ্য গড়ে ফেলেছে। তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে দলে তারকা থাকলেই চলবে না। চাই মনোবল, কৌশল আর অবশ্যই ময়দানে বিদ্রোহ দেখানোর শক্তি।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 8 August 2025 16:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিরাচরিত ঐতিহ্য ভেঙে খানখান। দলবদলের বাজার এখনও ঝাঁপ ফেলেনি। তার আগেই ৩০০ মিলিয়ন খরচ করে ফেলেছে লিভারপুল (LIverpool)। যে দল সেভাবে চড়াদামে ফুটবলার কেনে না, তারাও প্রিমিয়ার লিগ (EPL) নিজেদের হাতে রাখতে সাবেকি দর্শন ভুলে যেতে কসুর করছে না। বিনিয়োগকেই সাফল্যের মূল মন্ত্র ধরে নিয়েছে। খানিকটা বাধ্য হয়ে… চাপে পড়ে, খানিকটা বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে।
যদিও বাকি ক্লাবগুলি যে হাত গুটিয়ে রয়েছে, বিষয়টা এমন নয়। নিঃশব্দে দল সাজাচ্ছে আর্সেনাল, ম্যান সিটি, চেলসি। কেউ তারকা খেলোয়াড়দের ধরে রাখছে, বিপুল অঙ্কে চুক্তি নবীকরণ হচ্ছে। কেউ অন্যের ঘর ভেঙে তরুণ, প্রতিশ্রুতিমান ফুটবলারদের সই করাচ্ছে। মোট কথা, কেউই থমকে নেই। লিভারপুলকে কড়া টক্কর দিতে অন্তত পাঁচটি ক্লাব মুখিয়ে।
গতবার চার ম্যাচ হাতে রেখে প্রিমিয়ার লিগ জিতে নেয় লিভারপুল। আর্নে স্লটের প্রথম মরশুমে এমন নিরঙ্কুশ সাফল্য অনেকের ভাবনার বাইরে ছিল। যদিও উন্মাদনা এক মরশুমেই ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। সামনের সপ্তাহ থেকে ফের শুরু লড়াই--টাইটেল ধরে রাখা বনাম ছিনিয়ে নেওয়ার রুদ্ধশ্বাস সংঘাত!
আর এই যুদ্ধে লিভারপুল ইতিমধ্যে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ২৬৯ মিলিয়ন পাউন্ডের বাজার-খরচে দলে সই করেছেন পাঁচ তারকা। লেভারকুজেনের মিডফিল্ডার ফ্লোরিয়ান উইর্ট্জকে আনা হয়েছে ক্লাব রেকর্ড ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে (শর্ত সাপেক্ষে ১১৬ মিলিয়ন পর্যন্ত)। সঙ্গে স্ট্রাইকার হুগো একিটিকে (৬৯ মিলিয়ন), লেফট উইঙ্গার মিলোস কেরকেজ (৪০ মিলিয়ন), ডান প্রান্তে জেরেমি ফ্রিমপং (২৯.৫ মিলিয়ন) এবং ভ্যালেন্সিয়া থেকে গোলকিপার জর্জি মামারদাশভিলি (২৫ মিলিয়ন)। নতুনদের সাজানোর পাশপাশি পুরনো মেরামতের ফলে স্লটের স্কোয়াড এখন আরও গভীর!
আর্সেনাল: অনেক দিন ধরেই 'প্রায়' চ্যাম্পিয়ন… এবার কী হবে?
মিকেল আর্তেতার আর্সেনাল (Arsenal) মানেই দুর্দান্ত শুরু, মোটামুটি মিড-সিজন, তারপর আচমকা খেই হারানো। শেষ ধাপে আকছার গা-ছাড়া ভাব দেখিয়েছে গানার্সরা। তবে এবার এমিরেটসের আকাশ-বাতাসে অন্যকিছুর আঁচ! দুর্বল পজিশনে বিনিয়োগ করে দলকে প্রায় গুছিয়ে এনেছেন স্পেনীয় কোচ। ভিক্টর জিওকারেস (স্পোর্টিং) এবং মার্টিন জুবিমেন্ডির (রিয়াল সোসিয়েদাদ) মতো ক্লিনিক্যাল অ্যাটাকার কেনার আড়ালে ভাবনা পরিষ্কার—গোলস্কোরিং ও বল দখলের খামতি, যেটা গত মরশুমে বেজায় ভুগিয়েছে, তা পুরোদস্তুর মিটিয়ে ফেলা।
ভিনদেশের লিগ ঘেঁটে ফুটবলার কেনার পাশাপাশি চেলসি থেকে নোনি মাদুয়েকে ও কেইপা অ্যারিজাবালাগা, ব্রেন্টফোর্ড থেকে মিডফিল্ডার ক্রিশ্চিয়ান নরগার্ডকে সই করিয়েছেন আর্তেতা। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফসল ভ্যালেন্সিয়ার থেকে প্রতিভাবান ডিফেন্ডার মস্কেরাকে টেনে আনা। সব মিলিয়ে ২০১ মিলিয়ন পাউন্ডের দলবদল। খরচের ধাক্কা মেটাতে পার্টে, তমিয়াসু, জর্জিনহোদের মতো তারকাদের ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ছ’নম্বর মরশুমে এক এফএ কাপ ছাড়া তেমন স্মরণীয় সাফল্য নেই। আর্তেতা কি কিছুটা হলেও চাপে? বিবিসি-র অ্যালেক্স হাওয়েলের কথায়, ‘এটা আর্সেনালের কাছে ট্রফি জয়ের মরশুম। শুধু ক্লাব নয়, খেলোয়াড়দের মধ্যেও সেটাই বার্তা!’ প্রস্তুতি ম্যাচগুলোয় দেখা যাচ্ছে, আর্তেতা এবার আরও আক্রমণাত্মক ফুটবলের দিকে ঝুঁকেছেন। মিডফিল্ড থেকে বল দ্রুত ফরোয়ার্ডে পৌঁছে যাচ্ছে। এই কৌশল জিওকারেসের মতো স্ট্রাইকারদের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
ম্যানচেস্টার সিটি: ‘পঙ্কজরবি’ কি সত্যি অস্তাচলে?
গত মরশুম ছিল পেপ গোয়ার্দিওলার জন্য হতাশার সিজন। একটাও বড় ট্রফি আসেনি—না প্রিমিয়ার লিগ, না ক্লাব বিশ্বকাপ। এমন অভিজ্ঞতা ২০১৭ সালের পর এই প্রথম। সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে এবার মিডফিল্ডে এসেছেন টিজানি রেইন্ডার্স (এসি মিলান), উইঙ্গার রায়ান চেরকি (লিওঁ), রক্ষণে রায়ান এইট-নৌরি (ওলভস)। সঙ্গী তরুণ জেমস ট্রাফোর্ড। সব মিলিয়ে ১৫৪ মিলিয়ন! যদিও দল ছেড়েছেন দুই স্তম্ভ—কেভিন ডি ব্রুইনে ও কাইল ওয়াকার। ডি ব্রুইনের জায়গায় এখনও কেউ পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি। বিবিসি-র শামুন হাফেজের মতে, ‘এ বছর সিটির উপরে চাপ কম। স্পটলাইট নেই। যা গোয়ার্দিওলার টিমকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে!’ সিটির (Manchester City) সমস্যা হচ্ছে, তারা সবসময়ই টানা জয়ের ফর্মে গা ভাসাতে অভ্যস্ত। তাই মরশুমের শুরুতে ছন্দ না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।
চেলসি: স্পর্ধার নাম ‘তারুণ্য’
এনজো মারেৎসকার নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণ কিন্তু প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে দল গড়েছে চেলসি (Chelsea)। গত মরশুমে সবচেয়ে কমবয়সি একাদশ নিয়ে ক্লাব বিশ্বকাপে পিএসজিকে হারিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে—স্প্রিন্ট নয়, এবার ম্যারাথন জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামতে হবে। ট্রান্সফার মার্কেটে দলে যোগ দিয়েছেন লিয়াম ডেলাপ (ইপ্সউইচ), জোয়াও পেদ্রো (ব্রাইটন), জেমি গিটেনস (ডর্টমুন্ড), জোরেল হাটো (আয়াক্স)। সেই সঙ্গে সঙ্গে আগে থেকেই ঠিক থাকা দারিও এসুগো ও এস্তেভাও উইলিয়াম। নিট খরচ ২৪৯ মিলিয়ন। বিবিসি-র নিঝার কিনসেলারের কথায়, ‘চেলসির অফিসিয়াল টার্গেট টপ-ফোর হলেও, দলের অন্দরে অনেকে মনে করছেন এই দল শিরোপা জিততে পারে!’ কোল পালমার, এনজো ফার্নান্দেজ, কাইসেদোরা থাকায় মাঝমাঠে ভারসাম্য রয়েছে। অভিজ্ঞতার অভাব কি লম্বা দৌড়ে ফ্যাক্টর হতে পারে? প্রশ্নটা এখনও উবে যায়নি।
নিউক্যাসল ইউনাইটেড: মাঠে গর্জন, বাজারে নিশ্চুপ
নিউক্যাসল (Newcastle United) গত সিজনে পঞ্চম হলেও, শেষ পর্যন্ত শীর্ষে ওঠার প্রতিযোগিতায় ছিল। ক্লাব ট্রানজিশনের মধ্যে। পুনরুজ্জীবন চলছে। কিন্তু দলবদলের বাজারে তারা অনেকটাই পিছিয়ে। এখনও পর্যন্ত মাত্র ৫৫ মিলিয়ন খরচ করে আনা হয়েছে অ্যান্থনি এলাঙ্গা ও অ্যারন রামসডেলকে (লোন)। হুগো একিটিকে, জোয়া পেদ্রো, লিয়াম ডেলাপ, জেমস ট্রাফোর্ডদের মতো বহু টার্গেট হাতছাড়া। স্পোর্টিং ডিরেক্টর পল মিচেলও বিদায় নিয়েছেন। ফলে বোর্ডরুমেও অস্থিরতা। যা দেখে বিশেষজ্ঞ সিয়ারান কেলি বলেন, ‘নিউক্যাসল এখনও সেরাদের সঙ্গে লড়ার মতো দল। কিন্তু স্কোয়াড অনেকটা দুর্বল—চারটে টুর্নামেন্টে চালিয়ে যাওয়ার মতো গভীরতা নেই!’ আলেকজান্ডার ইসাক থাকলেও, তাঁর ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তা। শোনা যাচ্ছে, তিনি লিভারপুলে যোগ দিতে পারেন। ফলে এ মরশুমে হয় নিউক্যাসল বড়সড় চমক দেবে, নয়তো পুরোপুরি ব্যাক গিয়ারে চলে যাবে।
অতএব মোদ্দা বিষয় দাঁড়াল: আর্সেনাল ধারাবাহিক, সিটি অভিজ্ঞ, চেলসি অনুপ্রাণিত, নিউক্যাসল ক্ষুধার্ত। কিন্তু লিভারপুল সাম্রাজ্য গড়ে ফেলেছে। তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে দলে তারকা থাকলেই চলবে না। চাই মনোবল, কৌশল আর অবশ্যই ময়দানে বিদ্রোহ দেখানোর শক্তি। মো সালাহরা স্থিতাবস্থা ধরে রাখবেন নাকি ফের একবার ভারসাম্য টলিয়ে নতুন কোনও শক্তি উঠে আসে—এবারের প্রিমিয়ার লিগের এক সপ্তাহ আগে এই তর্কই ঘুরপাক খাচ্ছে।