লিভারপুলের ‘নির্মাণ দর্শন’ ছিল: প্রযুক্তিনির্ভর স্কাউটিং, হিসেবমাফিক বিনিয়োগ এবং খেলোয়াড়দের থেকে সর্বোচ্চটা বের করে আনা। এবার সবকিছু বদলে গিয়েছে। স্লটবাহিনী এখন রক্ষণশীল খোলস ছেড়ে বেরতে আগ্রাসী।

লিভারপুল
শেষ আপডেট: 7 August 2025 14:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: খুব বেশিদিন আগে নয়, গত মরশুমেও ‘ফুটবলার কেনার বদলে ফুটবলার গড়া’র দর্শন নিয়ে লিভারপুলের সভ্য-সমর্থকদের উন্নাসিকতা ছিল! ইংল্যান্ডের অন্যান্য ধনকুবেরদের বরপুত্র দল যতই টাকার ধামা নিয়ে ট্রান্সফার মার্কেটে নামুক না কেন, আমরা সেই রাস্তায় হাঁটি না। বদলে অ্যাকাডেমির পরিকাঠামো ও মানোন্নয়নে জোর দিই। তরুণ ফুটবলারদের আধুনিকতম ট্রেনিংয়ে গড়েপিটে ইউরোপের সর্বোচ্চ মঞ্চে টক্কর দেওয়ার যোগ্য করে তুলি—মোটের উপর এটাই ছিল ভক্তদের মোদ্দা অহংকার। অ্যানফিল্ডের আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত গানের কলি: ‘দ্য রেডস হ্যাভ গট নো মানি, বাট উই উইল স্টিল উইন দ্য লিগ!’
আর কিছুদিনের মধ্যে শুরু হতে চলা প্রিমিয়ার লিগের আগে অবশ্য লিভারপুলের ভক্তদের এই গান ভুলে যেতে হবে। কারণ, এবারের দলবদলে বাজারে আর্নে স্লটের টিম যে হারে টাকা খরচ করছে, তা স্মরণযোগ্য সময়ে দেখা যায়নি। না আর্নে স্লট, না ব্রেন্ডন রজার্স—কেউই উপরমহলের এতখানি কৃপাদাক্ষিণ্য পাননি। তাহলে লিভারপুলের হলটা কী? কেন আচমকা টাকা গাদা গাদা খরচের ঝোঁক চাপল? আড়ালে কি প্রিমিয়ার লিগ খেতাব ধরে রাখার দুর্মর বাসনা? নাকি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার ইচ্ছে?
গত এক দশকে ইংল্যান্ডের ফুটবল-অর্থনীতিতে ‘বড় দলের বড় খরচ’ নতুন ফর্মুলা নয়। তবু লিভারপুলের এই পরিবর্তন ব্যতিক্রমী। কারণ, ইংল্যান্ডের দলটির বুনিয়াদ কেবল অর্থের দাপটে গড়া নয়, বরং নীতিগত নিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফসল। আজ শুধু সমর্থকদের গান নয়, মেজাজও বদলেছে। এবারের ট্রান্সফার মার্কেটে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে লিভারপুল বুঝিয়ে দিয়েছে—তারা এখন ‘নগদ’ চ্যাম্পিয়নদের দলে!
মালিকানাধীন ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ (FSG) কখনওই আবেগে খরচ করার পক্ষপাতী নয়। ২০১৮ সালে ফিলিপ কুটিনহোকে বার্সেলোনায় বিক্রি করে পাওয়া টাকা দিয়েই গোলে আলিসন ও রক্ষণে ভ্যান ডাইককে কেন্দ্র করে এক ঘোরতর প্রতিদ্বন্দ্বী দল গড়ে তোলে লিভারপুল। ক্লপের অধীনে জেতে প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ। তখন লিভারপুলের ‘নির্মাণ দর্শন’ ছিল: প্রযুক্তিনির্ভর স্কাউটিং, হিসেবমাফিক বিনিয়োগ এবং খেলোয়াড়দের থেকে সর্বোচ্চটা বের করে আনা।
এবার সবকিছু বদলে গিয়েছে। স্লটবাহিনী এখন রক্ষণশীল খোলস ছেড়ে বেরতে আগ্রাসী। এন্ট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে হুগো একিতিকে-কে ৭৯ মিলিয়নে আনার পাশপাশি ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, মামারদাশভিলি, কেরকেজ, ফ্রিমপং, এমনকি গোলকিপার আরমিন পেচির মতো সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় দলে যোগ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যয়চক্র, এভাবে উপুড় করে টাকা ঢালার পরিকল্পনা হঠাৎ করে আসেনি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি কানাকড়িও খরচ করেনি লিভারপুল। গত গ্রীষ্মে তাদের লাভের অঙ্কে জুড়ে যায় ৪২.৫ মিলিয়ন পাউন্ড। এই আপাত নীরবতা ছিল ঝড়ের পূর্বাভাস। পেছনে জমছিল সঞ্চয়, যা এবার বিনিয়োগের চেহারা নিয়েছে।
একসময় ইউরোপা লিগ খেলার ফলে ৫৭ মিলিয়ন পাউন্ড লোকসান সইতে হয়েছিল। এবার ফের চ্যাম্পিয়নস লিগ, সঙ্গে মিলেছে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা। সাকুল্যে প্রায় ২৬০ মিলিয়নের প্রত্যক্ষ আয়। আশা করা হচ্ছে, এ বছর প্রথমবারের মতো রাজস্ব ৭০০ মিলিয়নের গণ্ডি পেরোবে। ম্যাচ ডে আয়, বর্ধিত স্ট্যান্ডের সুবিধা এবং বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে লিভারপুলের ‘সেলফ-সাস্টেইনিং মডেল’ আপাতত আগ্রাসী বিনিয়োগের পথে। এই পন্থা আত্মঘাতী না আত্মবিশ্বাসী—সেটা মরশুমের মাঝপথেই বোঝা যাবে।
একিতিকে এখনো সরকারিভাবে সই করেননি, তবে এরই মধ্যে ক্লাবের লক্ষ্য আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ের দিকে। ক্রিস্টাল প্যালেসের মার্ক গুহি এক নম্বর টার্গেট। পাশপাশি অন্যান্য ক্লাব যদি লুইস দিয়াজ, ডারউইন নুনেসের মতো হার্ভে এলিয়ট (£৪০ মিলিয়ন), ফেডেরিকো চিয়েসা (£১০ মিলিয়ন) কিংবা টাইলার মর্টনদের (£১৫ মিলিয়ন) মোটা অঙ্ক দিয়ে কিনে নেয়, তাহলে মোটামুটি ২০০ মিলিয়নের বেশি তুলে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এটাই আধুনিক ফুটবলের আর্থিক কূটনীতি—শুধু ব্যয় নয়, রিটার্নও নিশ্চিত করা জরুরি!
য়ুর্গেন ক্লপ দায়িত্ব ছাড়ার পর নতুন কোচ আর্নে স্লট প্রথম সুযোগেই লিগ জেতেন। যদিও মরশুমের মাঝপথে তাঁর স্বীকারোক্তি ছিল—লিগে নির্দিষ্ট দল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহারের ফলে ক্লান্তি ভর করেছে। ‘কারাবাও কাপ’ ফাইনালে নিউক্যাসলের কাছে হারের পর শ্রান্তি নিয়ে কথা বলেন স্লট। এবার তাঁর হাতে বিকল্প অনেক বেশি—নতুন মুখ, তরুণ শক্তি, রোটেশনের সুযোগ। অর্থাৎ, রণকৌশলেও বৈচিত্র্য বাড়বে।
লিভারপুলের বদলে যাওয়া মানসিকতা ফুটবলের ব্যবসা ও দর্শনের বিবর্তনের এক বাস্তব উদাহরণ। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, ‘বিনিয়োগ’ শব্দটা শুধু বাজারে চমক তৈরির জন্য নয়, বরং তা হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জমি তৈরির ফর্মুলা। তাদের এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত—লিভারপুল শুধু ট্র্যাডিশনের ক্লাব নয়, তারা এখন সাম্রাজ্যবিস্তারে মশগুল।