দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ প্রায় শেষ। পিএসজির কাছে ততক্ষণে হতাশা আর পেশিশক্তির প্রদর্শন ছাড়া কিছুই ছিল না। ৮৪ মিনিটে মার্ক কুকুরেলার চুল ধরে টেনে ফেললেন জোয়াও নেভেস। সঙ্গে সঙ্গেই লাল কার্ড।

চেলসি
শেষ আপডেট: 14 July 2025 10:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিত্রনাট্য অনুযায়ী, পিএসজি ফেভারিট। যারা বায়ার্ন মিউনিখ, আতলেতিকো মাদ্রিদ, রিয়াল মাদ্রিদ সবাইকে চার গোল দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। প্রতিপক্ষ চেলসি। ধারে নির্বিষ, ভারে দুর্বল। কত গোলে ক্লাব বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতে ট্রফি হাতে তুলবে ফ্রান্সের ক্লাব, সেই নিয়ে তর্ক জমেছিল।
কিন্তু সেই চিত্রনাট্য এফোঁড়ওফোঁড় করে নিউ এজ চেলসির নয়া রূপকথা লিখলেন কোল পালমার৷ প্রথমার্ধে দু'গোল, একটা অ্যাসিস্ট। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন পিএসজিকে ৩-০ স্কোরলাইনে উড়িয়ে ক্লাব বিশ্বকাপ জিতল ইংল্যান্ডের ক্লাব।
কাগজে-কলমে যে লড়াইটা পিএসজির একপেশে বিজয়মিছিল হওয়ার কথা ছিল, সেটা পরিণত হল চেলসির প্র্যাকটিস সেশনে! ফাইনালের মঞ্চে নামের জোর, খ্যাতির ছটা, মহাতারকাদের গ্ল্যামার মুছে শেষ হাসি হাসলেন এনজো মারেস্কা। যাকে এতদিন পেপ গোয়ার্দিওলার একদা ডেপুটি নামে দুনিয়া চিনে এসেছে। চেলসির তক্তে বসে একঝাঁক তরুণ, অনভিজ্ঞ ফুটবলারদের নিয়ে এবার দুনিয়া শাসন ইতালীয় ম্যানেজারের। গতকাল আমেরিকার খটখটে রোদে যার প্রমাণ পেলেন লুই এনরিকে। তাঁর মেশিন-সদৃশ পাসিং ফুটবল মারেস্কার প্রেসিংয়ে হাঁসফাঁস করল। পালমার-পেদ্রোর পায়ের তালে ছন্দ ভুলে বেসুরো কাভারাৎস্কেলিয়া-দেম্বেলে।
রেফারির বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে খেলা শুরু হল যখন, তখনই বোঝা যাচ্ছিল চেলসি আজ অন্য মেজাজে। বল দখল, গতি, পজিশন—সবকিছুতেই অপ্রতিরোধ্য কর্তৃত্ব। বল পজেশন থাকল পিএসজির জিম্মায়। কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে চেলসি। যার সুবাদে ২২ মিনিটেই প্রথম গোল। রবার্ট সানচেজের লং বল। পিএসজির নুনো মেন্ডেস ভুল হেড করে বল ঠেলে দিলেন মালো গুস্তোর পায়ে। তাঁর কাট-ব্যাক শট বেরালদো রুখে দিলেও ফিরতি বল কোলে পালমার পাওয়ামাত্র বাঁ-পায়ের নিপুণ স্কিল ও অব্যর্থ লক্ষ্যভেদী শটে গোল!
পিএসজি ডিফেন্স আচমকা পিছিয়ে হতভম্ব। শুধু প্রথমার্ধ কেন, গোটা ম্যাচে তারা এই ঘোর কেটে বেরোতে পারেনি। ঠিক আট মিনিট পর পালমার যেন নিজের আগের গোলটাকেই নকল করলেন। লিভাই কোলউইলের লং পাসের দৌলতে বল পেয়ে বাঁ দিক থেকে কেটে ঢুকে ফের বাঁ-পায়ে বক্সের ঠিক মাথা থেকে একই ভঙ্গিমা ও টেকনিকে নিখুঁত শট। ঠিক যেন কম্পাস দিয়ে মাপা! দ্বিতীয়বার বল জালে জড়াল। দোনারুম্মা দাঁড়িয়ে থাকলেন, মেন্ডেস হতাশ ভঙ্গিতে ফিরে এলেন পজিশনে। পিএসজি শিবির যেন বুঝতেই পারল না—কী থেকে আচমকা কী সব হয়ে গেল!
চেলসি তখন তেতে। আরও একটা গোল আসবে কি? গ্যালারিতে গুঞ্জন, ফিসফাস। ৪৩ মিনিটে সেটাই হল। নায়ক ফের পালমার। এবার গোল করলেন না, করালেন। ডি-বক্সের বাইরে থেকে লাইন-চেরা থ্রু পাস। ঠিক সময়ে পেদ্রো দৌড়ে গেলেন বলের দিকে। সামনে এগিয়ে এলেন দোনারুম্মা। চিপ করলেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। গোলরক্ষকের মাথার উপর দিয়ে বল গোললাইন ছুঁয়ে জালে জড়াল। এক অর্ধে পিএসজি হজম করল তিন-তিনটি গোল! বিশ্বফুটবল এমন উলটপুরাণ শেষ কবে দেখেছে?
সেই সঙ্গে উঠেছে প্রশ্ন: এই চেলসি কি সেই দল, যারা লিগ টেবিল শেষ করেছিল চতুর্থ স্থানে? যারা কনফারেন্স লিগ জিতে কোনওমতে বিপুল বিনিয়োগের জবাব দিয়েছিল? চার সপ্তাহ আগে নিজেদের আত্মপরিচয় খোঁজার মরিয়া চেষ্টায় ব্যস্ত, সেই তারাই কিনা ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকার সেরা ক্লাবকে শাসন করল! ছাপিয়ে গেল!
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ প্রায় শেষ। পিএসজির কাছে ততক্ষণে হতাশা আর পেশিশক্তির প্রদর্শন ছাড়া কিছুই ছিল না। ৮৪ মিনিটে মার্ক কুকুরেলার চুল ধরে টেনে ফেললেন জোয়াও নেভেস। সঙ্গে সঙ্গেই লাল কার্ড। রেফারি পকেটে হাত ঢোকাতে দেরি করলেন না। তারপরই মাঝমাঠে উত্তেজনা। ঠেলাঠেলি। ম্যাচশেষেও গনগনে আঁচ। পরাজয় মেনে নিতে ব্যর্থ পিএসজি। হতাশা থেকে পেদ্রোকে ধাক্কা দিলেন কোচ লুইস এনরিকে ও গোলকিপার দোনারুম্মা।
যখন রেফারি শেষবারের মতো বাঁশি বাজালেন, গ্যালারিতে উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে। ভিআইপি বক্সে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, তাঁর স্ত্রী লিনা আল আশকার। সবাই দাঁড়িয়ে চেলসির ফুটবলারদের অভিবাদন জানালেন। স্টেডিয়ামে উপস্থিত নীল জার্সির সমর্থকেরা তখন শুধু একটাই সুর গাইছে—’চ্যাম্পিয়ন, চ্যাম্পিয়ন চেলসি’। ট্রফিজয়ের সুবাদে ১২৮.৪ মিলিয়ন থেকে ১৫৩.৮ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সম্মানিক অর্থ লন্ডনের ক্লাবের পকেটে ঢুকতে চলেছে। নির্দিষ্ট অঙ্কটা নির্ভর করছে ফিফার পার্টিসিপেশন ফি-র উপরে।