ঠিক-ভুলের বাইরে সবচেয়ে বড় সত্য—যে বন্ধন ক্লপ–যুগে সালাহকে ‘ইজিপশিয়ান কিং’বানিয়েছিল, সেই বাঁধন এখন ভেঙে পড়ার মুখে। এখন শুধু প্রশ্ন—বিদায়টা মর্যাদার সঙ্গে হবে, নাকি আরও বিভেদের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে!

মহম্মদ সালাহ
শেষ আপডেট: 10 December 2025 17:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এবার নয়। ধুয়োটা উঠেছিল দুই মরশুম আগে। যখন জার্মান কোচ য়ুর্গেন ক্লপ (Jurgen Klopp) মসনদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। পিছুপিছু অনেক তারকাই লিভারপুল থেকে বেরিয়ে আসেন।
সেই ভিড়ে নাম লেখাননি মহম্মদ সালাহ (Mohamed Salah)। যদিও গুঞ্জন উঠেছিল জোর—সৌদি প্রো লিগ (Saudi Pro League) থেকে নাকি বিপুল অঙ্কের অফার এসেছে। এদিকে লিভারপুল কর্মকর্তারা চুক্তি নবীকরণ নিয়ে গড়িমসি করতে থাকায় মিশরের তারকার মনে জমেছিল ক্ষোভ। তবে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। নতুন কোচ আর্নে স্লটের (Arne Slot) অধীনে মৌসুম শুরু করেন, ঠিকঠাক ফিটনেস ধরে রাখেন, পারফরম্যান্স–ও দেন। ফল—প্রিমিয়ার লিগ (Premier League) জেতে লিভারপুল, আর সেরা পারফর্মারদের একজন হন সালাহ।
কিন্তু নয়া জমানার স্থায়িত্ব বেশিদিন রইল না। চলতি সিজনের মাঝপথেই জেগে উঠল পুরনো ক্ষত। লিডসের (Leeds) বিরুদ্ধে পয়েন্ট খোয়ানোর রাতেই বিস্ফোরণ! তৃতীয় ম্যাচে টানা বেঞ্চে বসে থাকা নিয়ে ক্ষোভ, আর তার সঙ্গে জুড়ে গেল গভীর অভিমান। ম্যাচশেষের সাক্ষাৎকারে বিতর্কিত মন্তব্য—ক্লাব নাকি ‘বাসের তলায় ঠেলে দিয়েছে’তাঁকে। প্রতিশ্রুতির কিছুই পালন করেনি। সালাহর ভাষায়, ‘আমি এত কিছু করেছি এই ক্লাবের জন্য। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওরা আমাকে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে!’
কোথা থেকে শুরু হল এই ভাঙন?
এই চিড় ধরাটা নতুন নয়, তবে বিস্ফোরণটা প্রথম। লিভারপুলের অন্দরমহল বলছে—সালাহর মুড বদলাতে শুরু করেছিল তিন সপ্তাহ আগে থেকেই। ক্লপের আমলে দলটা গড়ে উঠেছিল তাঁর জ্যোতির্বলয়ে… গোল–অ্যাসিস্ট–লিঙ্ক–আপের ঘেরাটোপে। ডান উইংয়ের সেই চিরচেনা কাট-ইন, ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের সঙ্গে (Trent Alexander-Arnold) বোঝাপড়া, কিংবা নুনেজ–ডিয়াজ জুটির (Darwin Nunez, Luis Diaz) সঙ্গে তালমিল—সালাহকে ভরসা জোগাত।
কিন্তু এই মরশুমে দলের কাঠামো পালটে গেছে। ফ্লোরিয়ান ভিরৎস (Florian Wirtz), আলেক্সান্ডার ইসাক (Alexander Isak) আর হুগো একিটিকে (Hugo Ekitike)—এদের নিয়ে আক্রমণ সাজানোর ফলে সালাহর ভূমিকাটা আর আগের মতো পরিষ্কার নয়। দলে তাঁকে ঘিরে ট্যাকটিক্স তৈরি হচ্ছে না, বরং সালাহকেই অভিযোজিত হতে হচ্ছে অন্যদের সঙ্গে! এতে গোলে খরা, প্রভাব কমছে। ধাক্কা লাগছে আত্মবিশ্বাসেও।
আর এতকিছুর পাকেচক্রে যে জায়গায় সবচেয়ে বেশি আঘাত লেগেছে, তা হল আর্নে স্লটের তাঁকে টানা তিন ম্যাচ বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সাহসী সিদ্ধান্ত! খেলোয়াড় হিসেবে এটা নক আউট পাঞ্চের সামিল। যা সালাহকে দিয়ে বলিয়ে নেয়, ‘আজ সব দায় আমার ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে!’
কোচকে এক্ষেত্রে ভিলেন বানানোটা বোকামো। আর্নে স্লট দলের ডিফেন্সিভ কমপ্যাক্টনেস বাড়াতে চান। সেই জায়গায় ডমিনিক সোবোসলাই (Dominik Szoboszlai) ডান দিকে সালাহর থেকে বেশি কায়িক পরিশ্রম করছেন—এই পর্যবেক্ষণ তো অপরাধ নয়! কিন্তু আজ, কেরিয়ারের উপান্তে এমন নিগূঢ় অবলোকন সালাহর গায়ে লেগেছে। ফলে যখন লিডস ম্যাচে গোটা ৯০ মিনিট মাঠেই নামানো হল না তাঁকে, তখন ধৈর্য ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার—হঠাৎ নয়, নিখুঁত পরিকল্পনা?
ভালো করে দেখলে সালাহর সাক্ষাৎকারে অভিযোগগুলো দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
ক. ক্লাব তাঁকে ‘বলির পাঁঠা বানাচ্ছে’: স্পষ্ট বলেছেন—‘আমি এত কিছু করেছি। অথচ দোষগুলো সব আমার ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।’এটা সেই মুহূর্ত যেখানে তাঁর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ একসঙ্গে বেরিয়ে এসেছে। দল খারাপ খেলছে, গোল খাচ্ছে, ডিফেন্স ভঙ্গুর—তবু আলো পড়ছে শুধু তাঁর ফর্মে। মিশরীয় তারকার ধারণা, ক্লাব ইচ্ছে করেই তাঁকে সমালোচকদের ডিনার টেবিলে এগিয়ে দিচ্ছে!
খ. কোচ–খেলোয়াড় সম্পর্ক ভেঙে পড়া: স্লট সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যগুলো সবচেয়ে কঠিন। সালাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘কেউ’ তাঁকে দলে রাখতে চান না। এই ‘কেউ’-টা কে? সেটা এখনও পরিস্কার নয়। তবে ভেতরের খবর বলছে—স্লটের ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনার সঙ্গে সালাহর প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। আর সেই জায়গায় সম্পর্ক ধীরে ধীরে ফিকে হয়েছে।
গ. সাক্ষাৎকার সময়ের হিসাব–নিকাশ: ইন্টার ম্যাচের আগে এত বড় মন্তব্য? হঠাৎ সিদ্ধান্ত? অনেকে মনে করছেন—না। এটা ছিল চাপ বাড়ানোর কৌশল। উদ্দেশ্য—জোর করে সিদ্ধান্ত আদায়। ক্লাব তাঁকে খেলাতে বাধ্য হবে, বা ম্যানেজমেন্ট স্লটকে প্রশ্ন করবে—এমনটাই হয়তো চাইছিলেন মিশরের অধিনায়ক।
কিন্তু সংকেত পরিষ্কার—এফএসজি (FSG) পুরোপুরি স্লটের পাশে আছে। একজন খেলোয়াড়, যতই দিকপাল হোন না কেন, কোচ বদলানোর কারণ হতে পারেন না।
এখন লিভারপুল কী করবে?
এই মুহূর্তে তিনটি পথ সামনে—
এক: ‘শান্তি চুক্তি’—সবাই একসঙ্গে টেবিলে বসে কথা বলে সমাধান বের করে আনা। এটা অসম্ভব নয়। রিচার্ড হিউজ (Richard Hughes) এবং মাইকেল এডওয়ার্ডস (Michael Edwards) দু’জনই শর্ত দিয়ে হলেও সালাহকে শান্ত করতে পারেন। তাঁর পারফরম্যান্স এখনও বিশ্বমানের হতে পারে—এই বিশ্বাস বজায় রাখা লিভারপুলের লাভও বটে। কিন্তু সম্পর্ক যদি সত্যিই ভেঙে গিয়ে থাকে, আস্থা ফেরানো কঠিন।
দুই: জানুয়ারিতেই ট্রান্সফার। সৌদি বা এমএলএস? হতে পারে সম্ভাব্য গন্তব্য। সৌদি প্রো লিগের আগ্রহ আগের থেকেও দ্বিগুণ। আল হিলাল (Al Hilal) আপ্রাণ চেষ্টা করবে—বড় অঙ্কও দিতে রাজি। ৩৩ বছর বয়সে আরেক দফা বিশাল চুক্তি—সালাহর কাছে এটা প্রলোভন ঠেকতেই পারে! পাশাপাশি দরজা খুলে রাখতে পারে এমএলএস (MLS)। যেমন: সান ডিয়েগো এফসি (San Diego FC), শিকাগো ফায়ার (Chicago Fire), ইন্টার মিয়ামি (Inter Miami)। জানুয়ারিতে গেলে লিভারপুল হয়তো ১০০–১২০ মিলিয়ন পাউন্ড পেতে পারে!
তিন: আফকন (AFCON) থেকে ফিরে সিদ্ধান্ত। অস্থায়ী থমকে থাকা। জাতীয় দলের জার্সিতে খেলবেন সালাহ। আপাতত একমাস লিভারপুলের বাইরে। এই ৩০ দিনই কি সম্পর্ক মেরামতের সময়? নাকি আরও দূরত্ব তৈরি হবে? কথা হল—লিভারপুল তাঁকে বিক্রি করতে চাইলে জানুয়ারি–ই সর্বোত্তম সময়। গ্রীষ্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করা মানে কম অঙ্ক পাওয়া।
শেষ কথা: দোষ কার?
এই সম্ভাব্য বিচ্ছেদে দোষ দু’পক্ষেরই। সালাহর ভুল: রাগ চেপে না রেখে এমন সময়ে বিস্ফোরণ ঘটানো, যখন দল উত্তেজনার মধ্যেই ডুবে। নিজের অবস্থানকে বৃহত্তর স্বার্থের উপরে রাখার অভিযোগ উঠছে।
লিভারপুলের দোষ: নতুন ট্যাকটিক্সে তাঁর গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া, আগে থেকে স্পষ্ট করে কিছু না বলা। চুক্তি নবীকরণ টেনে হেঁচড়ে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে খেলোয়াড়ের মনে ক্ষোভ জন্মানো স্বাভাবিক।
ঠিক-ভুলের বাইরে সবচেয়ে বড় সত্য—যে বন্ধন ক্লপ–যুগে সালাহকে ‘ইজিপশিয়ান কিং’বানিয়েছিল, সেই বাঁধন এখন ভেঙে পড়ার মুখে। এখন শুধু প্রশ্ন—বিদায়টা মর্যাদার সঙ্গে হবে, নাকি আরও বিভেদের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে!