গাত্তুসো নিজে ২০০৬-এর বিশ্বজয়ী দলের মাঝমাঠের যোদ্ধা। ‘যোদ্ধা’ শব্দটা ক্লিশে শোনাতে পারে। কিন্তু গাত্তুসোর জন্য এর চেয়ে সার্থকতর তুলনা আর কিছু হতে পারে না! মাঠে নামলে চোখে আগুন ঝরত, ঘর্মাক্ত শরীর থেকে গলে পড়ত অটুট জেদ।

গাত্তুসো
শেষ আপডেট: 24 March 2026 14:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল ইতালি। তারপর?
২০১০-এ গ্রুপ পর্বে বিদায়।
২০১৪-তে আরও একবার গ্রুপ স্তরেই ছুটি।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে নেই।
২০২২-এও একই ছবি!
চার বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের এই হাল। ফুটবল দুনিয়ায় এর চেয়ে মর্মান্তিক অধঃপতন আর কী হতে পারে? ছাব্বিশে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ মিস হলে ইতিহাসে নতুন কলঙ্ক লিখবে ইতালি। কারণ কোনও প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশ এর আগে এহেন ‘কীর্তি’ স্থাপন করেনি! সেই লজ্জা থেকে দেশকে বাঁচাতে মাঠে নেমেছেন জেনারো গাত্তুসো (Gennaro Gattuso)। অধুনা কোচ, প্রাক্তন খেলোয়াড়।
ঝুঁকির নিয়োগ, তবু ভরসা
গাত্তুসো নিজে ২০০৬-এর বিশ্বজয়ী দলের মাঝমাঠের যোদ্ধা। ‘যোদ্ধা’ শব্দটা ক্লিশে শোনাতে পারে। কিন্তু গাত্তুসোর জন্য এর চেয়ে সার্থকতর তুলনা আর কিছু হতে পারে না! মাঠে নামলে চোখে আগুন ঝরত, ঘর্মাক্ত শরীর থেকে গলে পড়ত অটুট জেদ।
এ তো খেলোয়াড়ের জার্সিতে। কিন্তু কোচ হিসেবে? জাতীয় দল সামলানোর অভিজ্ঞতা? উত্তর: শূন্য। ১২ বছরে ১০টি ক্লাবে কাজ করেছেন। কোথাও দু’বছরের বেশি টেকেননি। ইতালীয় ফুটবল সাংবাদিক দানিয়েলে ভেরির (Daniele Verri) কথায়, নিয়োগটা ছিল ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। তবু তাঁরা গাত্তুসোকেই বেছে নেন।
কেন এই নির্বাচন? আসলে ক্ষতবিক্ষত আজুরি বাহিনীর সেই মুহূর্তে অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি করে দরকার ছিল মনোবল। কোচের কুর্সিতে লাগত এমন কাউকে, যাঁকে দেখলে খেলোয়াড়রা অনুপ্রাণিত হন। সেখানে গাত্তুসো এগিয়ে। ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুঁফো (Gianluigi Buffon) এখন দলের ব্যাকরুম স্টাফ। তিনি ভরসা রেখেছেন বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থের উপর। বলেছেন, ‘গাত্তুসোর ক্যারিশমা আছে। জনপ্রিয়তা আছে। ঠিকঠাক মানসিকতা আমদানির ক্ষমতা রাখে!’
দলকে নিজের মতো করে গড়ছেন
প্লে-অফের আগে স্কোয়াডকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা চালান গাত্তুসো। প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নানা কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। তাতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে নারাজ! ইংল্যান্ড, ইতালি, কাতার, সৌদি আরব—যেখানে যে খেলোয়াড় রয়েছেন, যাচাই করতে খোদ কোচ সশরীরে হাজির! কথা বলেছেন। জানিয়েছেন কী চান, কেন চান।
ভেরির কথায়, ‘এটাই গাত্তুসোর পন্থা। শুধু অনুশীলনে নয়, ও রাতেও ভিডিও দেখে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময় কাটিয়ে দলকে নিজের করে নিতে চায়!’ হাতে হাত মিলিয়ে পাশে রয়েছেন ইউরো-জয়ী লিওনার্দো বোনুচ্চি (Leonardo Bonucci)। কোচিং টিমে তিনজনেই শিরোপা জেতা তারকা। সেই মানসিকতা খেলোয়াড়দের মধ্যে চারিয়ে দেওয়াই আসল টার্গেট। ছয় ম্যাচে পাঁচ জয়—রেকর্ড খারাপ নয়। তবু গ্রুপে নরওয়ের (Norway) পেছনে থেকে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট হাতছাড়া। তাই প্লে-অফের জটিল পথ।
সমস্যা একা গাত্তুসোর নয়
ভেরি একটা কথা সাফ সাফ জানিয়েছেন—ইতালির সমস্যা শুধু কোচ বদলে মিটবে না। ক্লাব ফুটবলে ধীরগতির খেলা, ইউরোপে ব্যর্থতা, নতুন প্রতিভা তৈরিতে ঘাটতি—পুরো ব্যবস্থাটাই দুর্বল। তিনি বলেন, ‘গাত্তুসোর পক্ষে একা সব ঠিক করা সম্ভব। যা আছে তাই নিয়ে সেরাটা বের করতে হবে। সেটা তিনি করে দেখিয়েছেন!’
২০১৮-তে সুইডেনের কাছে, ২০২২ সালে উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে প্লে-অফে হেরে বিশ্বকাপ মিস করেছে ইতালি। এবার ২৬ মার্চ ঘরের মাঠে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের (Northern Ireland) বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। জিতলে ৩১ মার্চ ওয়েলস বা বসনিয়ার বিপক্ষে ফাইনাল। সেই লড়াই পেরোলে জুটবে ফিফা বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) টিকিট। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড কাগজে-কলমে দুর্বল। কিন্তু ভেরি সতর্ক—‘ওরা দ্রুতগতি, লড়াকু। একটা ম্যাচে যা কিছু হতে পারে!’
জয়-পরাজয়ের ঊর্ধে গাত্তুসোর ভবিষ্যৎও নির্ধারণ হবে এই দুই ম্যাচে। জিতলে নায়ক। হারলে? ইতালিকে আবার নতুন করে ভাবতে হবে। ভেরি চাপ জমতে দিতে নারাজ। কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ব মন্তব্যে বলে দিলেন, ‘যোগ্যতা ছিনিয়ে নিলে দেশ তাঁকে ভালোবাসবে। না পেলে কঠিন!’ আপাতত যা পরিস্থিতি, তাতে একমাত্র গাত্তুসোই জানেন দাঁড়িপাল্লায় ঠিক কী রাখা আছে।