ভিয়েরি–তোত্তি–দেল পিয়েরোরা জমকালো স্মৃতিতে থাকবেন, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ জন্ম নেবে না। ইতালির মতো প্রকাণ্ড ফুটবল–সভ্যতার জন্য এটাই সবচেয়ে বড় ধাক্কা।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 17 November 2025 14:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘রোম ওয়াজ নট বিল্ট ইন আ ডে!’ চালু প্রবাদ এবার যেন প্রহসন ঠেকছে অজুরি ফুটবল টিমের অন্দরে। এখন আর কিছু গড়ার সময় নয়। সবকিছু ক্ষয়ে যাচ্ছে। ধূসর হচ্ছে গরিমার স্মৃতি, খ্যাতির জৌলুস৷ কটা বিশ্বকাপ, ক'বারের ফাইনালিস্ট, ক'জন তারকা দুনিয়া শাসন করেছেন, ঘরোয়া লিগের কোন কোন ক্লাব ইউরোপে দেখিয়েছে দাপট—সবই যেন বিলীনের পথে! অন্তর্হিত গরিমা, উত্তুঙ্গ ইতালীয় অহমিকা!
বিগত দু'বার বিশ্বকাপের ছাড়পত্র পায়নি দেল পিয়েরো, রবার্তো বাজ্জিওদের দেশ৷ তীরে এসে তরী ডুবেছে। সরাসরি লিগ লিডার্স হয়ে মূল পর্বে যাওয়ার বদলে নামতে হয়েছে প্লে-অফে। এটুকুই যথেষ্ট অবিশ্বাস্য। তারপর প্লে-অফ থেকে ছিটকে যাওয়ার তথ্যটুকু জন্ম দেয় পাহাড়প্রমাণ বিস্ময়ের!
অথচ এর মধ্যে ইউরো জিতেছে ইতালি। সিরি আ লিগের ক্লাবগুলিও চ্যাম্পিয়নস লিগে ধারাবাহিকভাবে খারাপ পারফর্ম করেনি। ভাল খেলেছে। তা সত্ত্বেও টিকিট জোটেনি বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের। কী কারণ? ধারাবাহিক অধ:পতনের গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরগুলো কোথায় লুকিয়ে? কীভাবে বাসা বাঁধল ঘূণ? কোন কোণে?
২০০৬–এর বার্লিন ফাইনালই আসলে ছিল প্রথম সতর্কবার্তা। জিনেদিন জিদানকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ইতালির দলের গড় বয়স ছিল অনেকটাই বেশি। সেই একবার শিখরে পৌঁছে দলের একাধিক স্তম্ভ সরে গেলেন জাতীয় দল থেকে। ফলে ২০১০–এর বিশ্বকাপে নামার সময় স্কোয়াডের গঠনটা অদ্ভুতভাবে ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। চ্যাম্পিয়ন হয়েও গ্রুপ স্টেজ থেকে বিদায়—অজুরি পতনের ইতিহাসে এটাই ছিল মোক্ষম আঘাত।
এরপরের দেড় দশকজুড়ে ইতালির ফুটবল ফেডারেশন (FIGC) যা করেছে, তা মূলত আগুন জ্বালানোর উপযোগী সামগ্রী জমা রাখা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে। পরিকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। দেশের একাধিক বড় ক্লাব—এসি মিলান, ইন্টার, রোমা, ফিয়োরেন্তিনা—নিজস্ব স্টেডিয়াম গড়তে চাইলে আমলাতন্ত্র চেপে বসেছে। অথচ জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স এই সময়ের মধ্যে ফুটবল পরিকাঠামো আমূল বদলে ফেলেছে। ইতালি দাঁড়িয়ে থেকেছে একই জায়গায়। এমনকি নরওয়েও আজ সামগ্রিক কাঠামোয় এগিয়ে—সাম্প্রতিক পরাজয়ে এই তথ্য নির্ভেজাল ব্যঙ্গ ছাড়া আর কী!
জাতীয় দলেও চূড়ান্ত বিভ্রান্তি। আধুনিক ইতালির শিশুদের কাছে ক্লাব ফুটবলই প্রিয়, আন্তর্জাতিক ফুটবল টিম নিয়ে আবেগ কমেছে। অথচ আর্জেন্তিনা, ব্রাজিল বা জার্মানির মতো দেশে জাতীয় দলই গর্ব ও ঐক্যের প্রতীক। ইতালিতে সেটা ম্লান। ফুটবল সংস্কৃতি ভাঙছে ভিতর থেকেই।
সবচেয়ে বড় ক্ষয় অবশ্য যুবব্যবস্থায়। প্রতিভা জন্ম নিলেও তা পূর্ণতা পাচ্ছে না। কারণ, দেশের কোচরা তরুণদের নিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তাদের চাকরি অনিশ্চিত, আয় কম। ফলাফল চাই এখনই। ফলে অনূর্ধ্ব–২০ বা ১৮ থেকে প্রমোশন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। লা মাসিয়া থেকে যেভাবে লামিন ইয়ামাল উঠে আসে, ডর্টমুন্ডে যেমন ১৮ বছরের ছেলেরা নিয়মিত প্রথম দলে খেলছে, আয়াক্স বা ম্যানচেস্টার সিটিতে প্রতিভার বহর দেখা যায়—ইতালিতে তার ঝলকটুকুও নেই। কোচদের ভয়—চাপ, সমালোচনা, বোর্ডের ধমক; তাই রেডিমেড ফুটবলার ছাড়া কারও উপর নির্ভর করতে নারাজ!
এই কারণেই ক্লপ বা আর্তেতার মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রজেক্ট ইতালিতে কল্পনা করা যায় না। আটালান্টার গ্যাস্পেরিনিই ব্যতিক্রম। বাকিদের দিনে দিনে ফল দিতে হয়। এই তাড়াহুড়োই তরুণদের গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। জাতীয় দলের স্কোয়াড তাই বয়সে অনিয়মিত, প্রতিভায় অসম, অভিজ্ঞতা–তরুণের ভারসাম্য ভঙ্গুর।
ইতালির ঘরোয়া ফুটবলে আরও একটা বড় সমস্যা—খেলার গতি ধীর, প্রেশার ফুটবল কম, ট্রানজিশন টলমলে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবল চলছে হাই–টেম্পো, টেকনিক্যাল, দ্রুত রূপান্তরের পথে। ইতালি পিছিয়ে পড়ছে প্রতিদিন। সিরি আ–তে উজ্জ্বল মুহূর্ত থাকলেও সেই ধার জাতীয় দলে ধরা পড়ছে না। কোচ বদলও অবশ্য এর বড় কারণ। কন্তে গেলেন, এলেন ভেনচুরা, তার পর মানচিনি, স্পালেত্তি, এখন গাতুসো—প্রত্যেকের দর্শন আলাদা, প্রত্যেকের পরিকল্পনা অর্ধেক রাস্তায় থমকে গেছে। বারবার সিস্টেম বদলানোয় খেলোয়াড়দের মধ্যে স্বচ্ছতা নেই। মানচিনি ইউরো জিতিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর প্রয়োজন ছিল স্থিরতা ও সময়। স্পালেত্তিও সেই একই সমস্যায় ভুগেছেন—আইডিয়া ছিল, স্কোয়াডে ছিল না পর্যাপ্ত গুণমান। গাতুসো সাহসী, পরিশ্রমী—কিন্তু সিস্টেম ভেঙে গেলে একজন মানুষের পক্ষে সারানো সম্ভব নয়। তবু তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন—এটাই তাঁর বড় গুণ।
কিন্তু বাস্তব নিদারুণ। ইতালি আবারও প্লে–অফে দাঁড়িয়ে। আবারও আতঙ্ক—তৃতীয়বার বিশ্বকাপ মিস করতে পারে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। নরওয়ে, সুইডেন, ইউক্রেন, এমনকি জর্জিয়াও আজ আধুনিক ইনফ্রাস্টাকচারে এগিয়ে। ইতালির পরবর্তী প্রজন্মে এমন কোনও নাম নেই যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভয় ধরাতে পারে। এমন পরিস্থিতি শুধু FIGC–র ব্যর্থতা নয়; টানা দশকের অবহেলা, দৃষ্টিহীনতা ও আত্মসমালোচনার অভাবের ফল। পরিকল্পনা নেই, পরিকাঠামো নেই, প্রতিভা তৈরির মডেল নেই। মাঠে দল হারছে। মাঠের বাইরে হারছে সংস্কৃতি। যুবা প্রজন্ম আজ বিশ্বকাপে ইতালিকে দেখেনি। ফুটবল–দেশের জন্য এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর কী হতে পারে?
সমাধান দ্বিমুখী—পরিকাঠামো দ্রুত আধুনিক করতে হবে, ক্লাব পর্যায়ে অনূর্ধ্ব–২১ ফুটবলারদের বাধ্যতামূলক সময় দিতে হবে, কোচদের প্রশিক্ষণ ও বেতন বাড়াতে হবে, ফেডারেশনকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার–রোডম্যাপ ঠিক করতে হবে। জাতীয় দলের আবেগ পুনর্গঠন ও ছোটদের মননে ফিরিয়ে দিতে হবে নীল জার্সির মাহাত্ম্য। অন্যথায় অজুরিদের চূড়ান্ত পতন অনিবার্য। ভিয়েরি–তোত্তি–দেল পিয়েরোরা জমকালো স্মৃতিতে থাকবেন, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ জন্ম নেবে না। ইতালির মতো প্রকাণ্ড ফুটবল–সভ্যতার জন্য এটাই সবচেয়ে বড় ধাক্কা।