এতকিছুর মধ্যে ম্যাচের সেরা আবিষ্কার ভির্টজ। ডাচ ম্যানেজার সিস্টেম বদলে তাঁকে সামনে খেলাচ্ছেন। এত স্বাধীনতা লিভারপুলের কোনও আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার আগে পাননি।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 11 August 2025 17:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের রোদ ঝলমলে বিকেল। নতুন মরশুমের প্রথম ট্রফি জয়ের লড়াই। একদিকে ক্রিস্টাল প্যালেস। সামনে নয়া চ্যালেঞ্জ। গত সিজনে ম্যান সিটিকে হারিয়ে এফএ কাপ জেতা যে ফ্লুক ছিল না, সেটা বুঝিয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে আর্নে স্লটের লিভারপুল ২.০। প্রায় নতুন ধাঁচে গড়ে ওঠে দলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন! কমিউনিট শিল্ড নিশ্চয় মহম্মদ সালাহদের উইশ লিস্টের উপরের তাকে থাকবে না। তবু প্রিমিয়ার লিগ শুরুর আগের হপ্তায় একটা ট্রফি ক্যাবিনেটে ঢুকলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে বৈ কমবে না! তা ছাড়া প্রায় ৩০০ মিলিয়ন খরচ করে ট্রান্সফার মার্কেট থেকে প্রচুর নতুন ফুটবলার দলে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা কতটা ডাচ ম্যানেজারের দর্শন বুঝতে পেরেছেন—মাঠে নেমে তার ফলিত প্রয়োগ দেখানোর ছিল সুবর্ণ সুযোগ!
নিট ফল: নবাগতদের ফর্মের ঝলক, ডিফেন্সে তালমিলের অভাব, মাঝমাঠে ভারসাম্যহীনতা এবং কমিউনিটি শিল্ডে ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে টাইব্রেকারে হার।
গতকাল চার-চারটি নতুন মুখ নিয়ে মাঠে নেমেছিল লিভারপুল। রেকর্ড ১১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা ফ্লোরিয়ান ভির্টজ আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডে। ডান-বাম ফ্ল্যাঙ্কে জেরেমি ফ্রিমপং আর মিলস কেরকেজ। সামনে নতুন স্ট্রাইকার হুগো একিতিকে। একমাত্র নতুন সাইনিং যিনি মাঠে নামলেন না, তিনি গোলকিপার গিওর্গি মামারদাশভিলি। ব্রাজিলীয় গোলরক্ষক আলিসন নিজের জায়গা ধরে রাখেন।
শুরুটা উজ্জ্বল। সম্ভাবনাময়। একিতিকে ও ফ্রিমপং দু’জনেই অভিষেকেই গোল করলেন। ২০০৬ সালের পর প্রথমবার লিভারপুলের দুজন নতুন ফুটবলার একই ম্যাচের স্কোরলিস্টে নাম লেখালেন। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততবারই অগোছাল ব্যাপারটা প্রকট হয়ে উঠেছে। রক্ষণের বুনিয়াদি ব্যর্থতা গত সিজনে থেকে থেকে উসকে ওঠে। ক্রিস্টাল প্যালেস বুঝিয়ে দিল: রোগ সারেনি। আর্নে স্লটকে গলদ মেরামত করতে হবে দ্রুত। কারণ, আগামী সপ্তাহেই শুরু হচ্ছে প্রিমিয়ার লিগ।
ডাচ ম্যানেজার অবশ্য ফাঁকফোকরের কথটা মেনে নিয়েছেন। তাঁর সাফ জবাব, ‘দলে চারজন নতুন খেলোয়াড়। সময় তো লাগবেই!’ ঠিকই বলেছেন স্লট। সোমবারের প্রস্তুতি ম্যাচে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিরুদ্ধেও লিভারপুল দুটি গোল খেয়েছিল সেট পিস থেকে। আর গতকাল প্যালেসের সুযোগ? মোটে দু’টি। একবার মাতেতার পেনাল্টি। আরেকবার ইসমাইলা সারের একক দৌড়। দু’টিতেই বল জড়াল জালে।
কিন্তু কেন ডিফেন্স সহজ গোল এড়াতে পারছে না?
ক্লপের আমলে ফুল-ব্যাক ছিল লিভারপুলের মূল অস্ত্র। ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ড ও অ্যান্ডি রবার্টসনের ওভারল্যাপে তৈরি হত আক্রমণ। নয়া উইং ব্যাক ফ্রিমপং ও কেরকেজও আগ্রাসী। তবে স্টাইলে ফারাক আছে। কেরকেজ প্রায় রবার্টসনের মতোই। ফ্রিমপং অনেকটা প্রান্তিক—উইং-ঘেঁষা। আর্নল্ডের মতো ভেতরে ঢুকে আচমকা মিডফিল্ডার বনে যাওয়ার কৌশল রপ্ত হয়নি। বদলে চিরাচরিত ওভারল্যাপে দক্ষ।'
এই দৌড়েই এল দ্বিতীয় গোল। ফ্রিমপং বক্সে ঢুকে ডিন হেন্ডারসনের মাথার উপর দিয়ে চিপ করলেন। হয়তো ক্রস ছিল, হয়তো শট—কিন্তু নিঃসন্দেহে সাহসী চাল। আক্রমণে আলো জ্বলিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু রক্ষণে পা পিছলেছে। দ্বিতীয় সমতাসূচক গোলের সময় সার-কে অনসাইডে রেখে দেন। প্রথম গোলের আগে এক থ্রু বলেই ভেঙে গিয়েছিল ডিফেন্স—মাতেতা বেরিয়ে যান। ভান ডাইক ফাউল করেন সার-কে। পেনাল্টি।
গতকাল বেঞ্চে স্বীকৃত সেন্টার-ব্যাক ছাড়াই দল সাজান স্লট। কোয়ানসা লেভারকুজেনে। গোমেজের চোট। ১ সেপ্টেম্বরের ডেডলাইনের আগে অন্তত একজন সেন্টার-ব্যাক চাই। ওয়েম্বলিতেই প্যালেসকে নেতৃত্ব দেওয়া মার্ক গেই মূল টার্গেট। চুক্তির শেষ বছর। ট্রান্সফার গুঞ্জনও রয়েছে। শেষ দিকে পায়ে টান লেগে বেরিয়ে গেলেন। তাঁকে কি আর সই করাতে চাইবে লিভারপুল?
এতকিছুর মধ্যে ম্যাচের সেরা আবিষ্কার ভির্টজ। ডাচ ম্যানেজার সিস্টেম বদলে তাঁকে সামনে খেলাচ্ছেন। এত স্বাধীনতা লিভারপুলের কোনও আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার আগে পাননি। অনেক সময় একিতিকের একেবারে কাছে চলে আসছিলেন, শেষ দিকে তো ফলস নাইনের ভূমিকায়! চতুর্থ মিনিটে বাম দিক থেকে অ্যাসিস্ট বাড়ালেন। ২২ পাস, ৬৬ সেকেন্ড, ৯ খেলোয়াড়—এভাবেই তৈরি হল লিভারপুলের প্রথম গোল। ৮৪ মিনিট মাঠে থেকে ফাইনাল থার্ডে সর্বাধিক পাস, ক্রস, বক্সে টাচ—সবেতেই এগিয়ে। মোট টাচে তৃতীয়।
এতেই প্রশ্ন উঠছে সালাহ-র ভূমিকা নিয়ে। আটটি ওয়েম্বলি ম্যাচে গোল নেই, একবার মাত্র অন টার্গেট শট। টাইব্রেকারে কিক উড়িয়ে দিলেন। একদিনের ছন্দহীনতা? নাকি দীর্ঘমেয়াদী অফ ফর্মের ইঙ্গিত?
যদিও আলো-আঁধারির মধ্যে উজ্জ্বল একিতিকে। তিনি যে আউট-অ্যান্ড-আউট স্ট্রাইকার, বোঝা গেল বিলক্ষণ। গোল করলেন, দারুণ এক ‘আউটসাইড-অফ-দ্য-বুট’ক্রস দিলেন গাকপোকে! সন্দেহবাদীরা প্রশ্ন তুলবেন: নুনেজের ডেবিউও একসময় ঝলমলে ছিল। পরে সেই ধার হারান। একিতিকেরও দ্বিতীয়ার্ধে ছ’গজের মধ্যে হেড মিস, ১২ গজ থেকে শট আকাশে পাঠানো—এসবের মধ্যে ডারউইন নুনেজের ছাপ স্পষ্ট!
সবমিলিয়ে স্লটের লিভারপুল ২.০ এখন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। সামনে লিগের ৩৮ ম্যাচ। ভুল শুধরে নিতেই হবে! কিন্তু সময়? আপাতত এরই বড্ড অভাব!