এই আইএসএল সিজন কোনও রিস্টার্ট নয়। এটা একটা ‘স্টপগ্যাপ’। লিগটা যেন কোনও মতে চালু থাকে, সেই চেষ্টা মাত্র।
.jpeg.webp)
ছবি: এআই নির্মিত
শেষ আপডেট: 7 January 2026 11:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাগজে-কলমে সমস্যার অবসান। কিন্তু বাস্তবে শুধু সংকটের রং বদলেছে। ২০২৫–২৬ মরসুমের ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL) নিশ্চিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ঘোষণার নীচে জমে থাকছে একের পর এক ধোঁয়াটে প্রশ্ন। ফেব্রুয়ারিতে লিগ শুরু হবে—এই খবর যতটা স্বস্তির, তার চেয়ে ঢের বেশি অস্বস্তিকর সেই তথ্য, যা বলছে, ক্লাবগুলো কার্যত টাকা দিয়ে লিগে টিকে থাকার অনুমতি কিনছে! এই আইএসএল আসলে কোনও নতুন সূচনা নয়। এটা একপ্রকার ‘ফায়ার ফাইটিং’। লিগ বাঁচানোর চেষ্টা। কাঠামো মেরামতি নয়।
‘হ্যাঁ’ বলতেই হবে: আলোচনা নয়, নির্দেশ
সমস্যার সূত্রপাত বৈঠকে। ক্রীড়া মন্ত্রক, অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (AIFF) এবং আইএসএল ক্লাবগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে যে আলোচনার কথা ছিল, তা কার্যত আলটিমেটামের চেহারা নেয়। সময় নেই। বিকল্প নেই। হয় এখনই সম্মতি, নাহলে অনিশ্চয়তার আরও অতলে তলিয়ে যাওয়া!
ক্লাব মালিকদের সঙ্গে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ নেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিসর নেই। এই আবহেই ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য ঘোষণা করেন—১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আইএসএল শুরু। ১৪ দলই খেলবে। একটা বিপুল সমস্যা আপাতভাবে মিটল। কিন্তু সেই সঙ্গে সামনে এল আরও কয়েকটি ছোটবড় ক্ষত।
খেলতেও খরচ: আইএসএল কি এখন ‘পে-টু-প্লে’?
এই মরসুমে আইএসএলের প্রস্তাবিত একমাত্র কাঠামো—সিঙ্গল লেগ হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে। মোট বাজেট ধরা হয়েছে ২৪ কোটি ২৬ লক্ষ টাকা। সংখ্যাটা শুনতে খুব ভয়ানক নয়। কিন্তু খুঁটিনাটি পড়লেই গল্প বদলে যায়:
ক। এআইএফএফ দেবে ৪০ শতাংশ, প্রায় ৯.৭০ কোটি।
খ। অথচ এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ ফেডারেশনের টাকা।
গ। বাকি অংশ নির্ভর করছে স্পনসর পাওয়ার উপর—যা এখনও হাতেই আসেনি!
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা এখানেই। এই ৯.৭০ কোটির বড় অংশ আসবে ক্লাবগুলোর পকেট থেকে। কারণ প্রতিটি দলকে দিতে হচ্ছে ১ কোটি টাকা করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি। সব মিলিয়ে অর্থ দাঁড়াল: ক্লাবই টাকা দিচ্ছে, ক্লাবই খেলছে আর সেই প্রক্রিয়াকেই বলা হচ্ছে ‘এআইএফএফ সাপোর্ট’! আর রাজস্ব বণ্টন নয়। এটা রাজস্ব ঘুরিয়ে আনার কৌশল হয়ে উঠছে!
বেতন কাটছাঁট, বিদেশিদের বিদায়
এই অনিশ্চয়তার প্রথম ধাক্কা পড়েছে ড্রেসিংরুমে। খবর অনুযায়ী, একাধিক আইএসএল ক্লাব খেলোয়াড়দের কাছে বেতন কমানোর প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছে। আগের ২৭৫ কোটি টাকার ব্রডকাস্ট চুক্তির সময় যে বেতনের কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেই সুরক্ষাবলয় এখন আর নেই।
ফল? বিদেশি ফুটবলাররা অপেক্ষা করছে না। ইস্ট বেঙ্গলের ডিফেন্ডার কেভিন সিবিল ইতিমধ্যেই বেরোনোর রাস্তা খুঁজছেন। এর আগে বা একই সময়ে লিগ ছেড়েছেন অ্যাড্রিয়ান লুনা, নোয়া সাদাউই, বোরহা হেরেরা, হোসে আরোয়োর মতো তারকারা। কারণ খুব সরল—চুক্তির নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও অধরা। লিগ বাঁচছে কাগজে। কিন্তু প্রতিভার ধারাবাহিক ক্ষয় চালু। তা থামার নামগন্ধ নেই।
সম্প্রচার থেকে কাঠামো: তাড়াহুড়োর মাশুল কতটা ভয়াবহ?
সবচেয়ে ভয় ধরানো সংখ্যাটা লুকিয়ে আছে বাজেটের এক কোণে। প্রোডাকশন ও ট্রান্সমিশনের জন্য বরাদ্দ—৯.৭৭ কোটি টাকা। যেখানে আগের মরসুমগুলোতে শুধু সম্প্রচারেই খরচ হত প্রায় ৭০ কোটি। এর মানে কী? মানে: কম ক্যামেরা, কম মানের প্রোডাকশন, কম দর্শক আকর্ষণ, কম স্পনসর আগ্রহ। একটা লিগ, যেটা কিনা এমনিতেই ধারাবাহিকতা আর বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে ভুগছে, সেখানে এই কাটছাঁট আত্মঘাতী নয়?
৯১টা ম্যাচ হবে। ১৪ দল একে অপরের সঙ্গে একবার করে খেলবে। মোট প্রাইজ মানি ৫.৮২ কোটি। যুব লিগে বিনিয়োগ নেই। প্যারাশুট পেমেন্ট নেই। সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রূপরেখাই উধাও! এআইএফএফ এখন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC)-র কাছে বিশেষ ছাড় চাইবে, কারণ এই ফরম্যাটে মহাদেশীয় প্রতিযোগিতার ন্যূনতম ম্যাচ শর্ত পূরণ হয় না। তাতেও কি পাকাপাকিভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর দিশা মিলবে?
মরসুম বাঁচল, ব্যবস্থা উলঙ্গ
এই আইএসএল সিজন কোনও রিস্টার্ট নয়। এটা একটা ‘স্টপগ্যাপ’। লিগটা যেন কোনও মতে চালু থাকে, সেই চেষ্টা মাত্র। কিন্তু তার বিনিময়ে ক্লাবগুলো দিচ্ছে টাকা, খেলোয়াড়রা দিচ্ছে ছাড় আর দর্শক পেতে চলেছে নামেমাত্র বিনোদন! ফেব্রুয়ারিতে কিক-অফ। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের গভীর ক্ষতগুলো ইতিমধ্যে পাকতে শুরু করেছে।
প্রশ্ন একটাই—এভাবে আর কতদিন?