অঁরির দৌড়, বার্গক্যাম্পের পাস, ভিয়েরার দৃঢ়তা, লেমানের সেভ—সব মিলিয়ে ২০০৩-০৪ মরশুমের আর্সেনাল ফুটবলকে যন্ত্রচালিত শ্রমের বদলে নিখুঁত শিল্পের পর্যায়ে তুলে ধরে। শুধু শিরোপাজয় নয়, অপরাজিত থেকে প্রিমিয়ার লিগ জেতা তাদের আলাদা সারিতে বসিয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 29 August 2025 16:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে শিরোপাজয়ী টিমের কমতি নেই। তাদের মধ্যে মহত্বের তুল্যমূল্য বিচার আকছার লেগেই থাকে। দাঁড়িপাল্লার একদিকে কেউ দৃঢ় রক্ষণের বাঁটখারা সাজান। কেউ রাখেন ধারালো আক্রমণকে। মাঝমাঠে কর্তৃত্ব দেখিয়েছে যে দল, আলোচনায় তারাও জায়গা করে নেয়।
পেপ গোয়ার্দিওলার ‘সেঞ্চুরিয়ন’ ম্যাচ সিটি, স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ট্রেবলজয়ী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবা জোসে মোরিনহোর টানা দুইবার প্রিমিয়ার লিগ জেতা চেলসি। প্রত্যেকেই অযুত শক্তিশালী, আধিপত্যকামী দল। কিন্তু আলোচনার টেবিলে, ইতিহাসের পাতায় এবং তর্কযুদ্ধের আঙিনায় আলাদা উচ্চতা পেয়েছে ২০০৩-০৪ মরশুমের আর্সেনাল।
কারণ একটাই—পুরো মরশুম অপরাজিত থেকে প্রিমিয়ার লিগ জেতা। যেটা আজও ‘এক্সক্লুসিভ’। শিরোপার পাশে ‘ইনভিন্সিবল’ ট্যাগের ভাগ চেয়ে অন্য কোনও দল হাত বাড়ায়নি। এক মরশুমে ৩৮ ম্যাচে ২৬ জয়, ১২ ড্র, কোনও হার নেই। গোল করেছে ৭৩, খেয়েছে ২৬টি। ৯০ পয়েন্ট নিয়ে লিগ চ্যাম্পিয়ন! ট্রফির পাশে আলাদা এক সোনালী রেপ্লিকা। যা আর কোনও ক্লাবের ক্যাবিনেটে ঢোকেনি!
ইতিহাসের তুলনায় কতটা বিরল?
প্রিমিয়ার লিগ শুরুর পর থেকে অনেক দল একবার-দু’বার হেরে শিরোপা জিতেছে। ফার্গুসনের ইউনাইটেড ১৯৯৯ সালে ট্রেবল জিতে সাড়া জাগালেও লিগে বারতিনেক পরাস্ত হয়। মোরিনহোর চেলসি (২০০৪-০৫) রেকর্ডসংখ্যক ৯৫ পয়েন্টে লিগ জিতল ঠিকই। কিন্তু তারাও দু’বার হোঁচট খায়। গোয়ার্দিওলার সিটি ২০১৭-১৮ মরশুমে ‘সেঞ্চুরিয়ন’ (১০০ পয়েন্ট) হল দুই ম্যাচে হার মেনে! লিভারপুল ২০১৯-২০ মরশুমে ৯৯ পয়েন্ট তুলল। কিন্তু অজেয় হতে পারল না।
তাহলে এতক্ষণে স্পষ্ট—একটা পুরো মরশুম অপরাজিত থাকা আধুনিক জমানায় প্রায় অসম্ভব! এমনকি ইউরোপের অন্যান্য বড় লিগেও ঘটনাটা বিরল। সিরি আ-তে জুভেন্তাস ২০১১-১২ মরশুমে অপরাজিত ছিল। কিন্তু সেটা ৩৮ ম্যাচে মাত্র ২৩ জয় আর ১৫ ড্র মিলিয়ে। প্রিমিয়ার লিগের তীব্রতা, প্রতিযোগিতা, মিডিয়া-চাপ, শারীরিক লড়াইকে সামলে ইনভিন্সিবলের তকমা অর্জন আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে!
নেপথ্য নায়ক ওয়েঙ্গার
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্সেন ওয়েঙ্গারের দর্শনই বদলে দিয়েছিল আর্সেনালকে। ডায়েট, ট্রেনিং, স্টাইল—সবকিছুতে তিনি ইউরোপীয় পেশাদারিত্ব আমদানি করেন। যখন ১৯৯৬ সালে আর্সেনালে পা রাখেন ওয়েঙ্গার, ইংলিশ ফুটবল তখনও ‘পাব কালচারে’ বন্দি। তরুণ ম্যানেজার খেলোয়াড়দের মদ্যপান ছাড়তে বাধ্য করেন। নিয়ে আসেন সাপ্লিমেন্ট, সঠিক ডায়েট।
কৌশলগত দিক থেকে ওয়েঙ্গার দল সাজান ৪-৪-২ ফরমেশনে। যেখানে মিডফিল্ডের অতুলনীয় তালমিল বিপক্ষের যাবতীয় স্ট্র্যাটেজি ছারখার করে দিত। ডিফেন্সে টনি অ্যাডামস-সোল ক্যাম্পবেল-অ্যাশলে কোল, মিডফিল্ডে প্যাট্রিক ভিয়েরা-গিলবার্তো সিলভা, আক্রমণে থিয়েরি অঁরি-ডেনিস বার্গক্যাম্প। তার সঙ্গে রবার্ট পিরেস, লুংবার্গ, লরেনদের ক্যামিও!
ভিয়েরা-গিলবার্তোর ডাবল পিভট আর্সেনালকে দিয়েছিল শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য। বার্গক্যাম্প ‘সেকেন্ড স্ট্রাইকার’। যিনি অঁরিকে স্পেস খুঁজে দিতেন। ফরাসি স্ট্রাইকারের গতি, নিখুঁত ফিনিশিং আর ভয়ঙ্কর ড্রিবলিং বার্গক্যাম্পের সৃজনশীলতার সঙ্গে পুরোদস্তুর মিশে গিয়েছিল!
ইনভিন্সিবল মরশুমের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
২০০৩-০৪ মরশুমে আর্সেনাল অনেক বার নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচে। উদাহরণ হিসেবে টানা যায় হাইবুরিতে পোর্টসমাউথের বিরুদ্ধে ১-১ ড্র-কে। শেষ মুহূর্তে অঁরির পেনাল্টি দলকে এক পয়েন্ট এনে দেয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ভ্যান নিস্তেলরুইয়ের পেনাল্টি মিস আজও কিংবদন্তি। সেই ম্যাচ শেষে আর্সেনাল ফুটবলারদের উচ্ছ্বাস দলীয় সংহতির প্রাণবন্ত প্রতীক।
পরিসংখ্যানের আয়না
৩৮ ম্যাচে অপরাজিত। ২৬ জয়, ১২ ড্র। দল করে ৭৩ গোল, খায় ২৬ গোল। সর্বোচ্চ গোলদাতা থিয়েরি অঁরি (৩০ গোল)। গোলকিপার জেনস লেমানের ১৫টি ক্লিন শিট। অঁরি সেই মরশুমে শুধু আর্সেনালের নায়ক নন, হয়ে ওঠেন প্রিমিয়ার লিগের পোস্টার বয়। ট্রাম্প কার্ড পিরেস। উইং থেকে করেন ১৪ গোল, বাড়ান ৭টি অ্যাসিস্ট। লুংবার্গের তেজ, ভিয়েরার নেতৃত্ব, সোল ক্যাম্পবেলের ইস্পাত-কঠিন ডিফেন্স—সবকিছুর মিশেলে গড়ে ওঠে আধুনিক যুগের অন্যতম ব্যালান্সড দল।
ইনভিন্সিবল বনাম সেঞ্চুরিয়ন: কোনটা কঠিন?
ফুটবল মহলে একটি প্রশ্ন আকছার ঘুরে বেড়ায়—‘অজেয়’ থাকা কঠিন, নাকি ‘সেঞ্চুরিয়ন’ হওয়া? ১০০ পয়েন্ট তুলতে হলে প্রায় সব ম্যাচ জিততে হয়। কিন্তু এক মরশুমে একটিও লড়াই না হারার মানে প্রতিটি ম্যাচে চাপ সামলানো, প্রতিটি ভেন্যুতে মানসিকভাবে অটল থাকা। ওয়েঙ্গার নিজেও বলেছেন, ‘আমাদের আসল সাফল্য পয়েন্টে নয়, মানসিকতায়। আমরা হারতে চাইতাম না!’
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
ইনভিন্সিবল আর্সেনাল কেবল ফুটবলীয় স্বীকৃতি নয়, কালে-কালান্তরে সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে ওঠে। লন্ডনের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে আর্সেনাল আশা-অহংকারের রূপকল্পের চেহারা নেয়। ওয়েঙ্গার পান ‘প্রফেসরে’র কৌলীন্যভরা ডাকনাম। যিনি ফুটবলকে শুধু মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ রাখেননি, জীবনদর্শনে পরিণত করেছিলেন।
ইনভিন্সিবলের ভবিষ্যৎ
গত দুই দশকে প্রিমিয়ার লিগে ইনভিন্সিবল স্বীকৃতির কাছাকাছি পৌঁছেছে একমাত্র লিভারপুল (২০১৯-২০, এক হার) ও ম্যানচেস্টার সিটি (২০১৭-১৮, দুই হার)। কিন্তু পুরো মরশুমে অপরাজিত? না, কারও পক্ষে ততটা দুর্ভেদ্য থাকা সম্ভব হয়নি। কারণ প্রিমিয়ার লিগ এখন আরও কঠিন। স্কোয়াড ডেপথ, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা, মিডিয়া চাপ—সব মিলে প্রতিটি দলের ‘অফ ডে’ আসবেই আসবে!
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, হয়তো আর কখনও কোনও ক্লাব প্রিমিয়ার লিগে ইনভিন্সিবল হবে না। কারণ এখন প্রতিটি দল শক্তিশালী, প্রতিটি ম্যাচে পা পিছলে যাওয়ার চূড়ান্ত সম্ভাবনা।
শেষ কথা
অঁরির দৌড়, বার্গক্যাম্পের পাস, ভিয়েরার দৃঢ়তা, লেমানের সেভ—সব মিলিয়ে ২০০৩-০৪ মরশুমের আর্সেনাল ফুটবলকে যন্ত্রচালিত শ্রমের বদলে নিখুঁত শিল্পের পর্যায়ে তুলে ধরে। শুধু শিরোপাজয় নয়, অপরাজিত থেকে প্রিমিয়ার লিগ জেতা তাদের আলাদা সারিতে বসিয়েছে। অপরাজেয় থাকার গৌরব তাই সঙ্গত কারণেই ইতিহাসে অমর।