আর্সেনালের সাফল্যের মূলে শুধু কৌশল নয়, আছে মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি আর বারবার অনুশীলন। জোভের প্রতিটি সপ্তাহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু কর্নার প্র্যাকটিস করান। খেলোয়াড়রা জানেন, ম্যাচে তাদের ঠিক কোন মুহূর্তে কোথায় দৌড়াতে হবে।

আর্সেনাল
শেষ আপডেট: 19 August 2025 14:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজকাল কর্নার ফ্ল্যাগে বল রাখলেই এমিরেটস ময়দান গর্জে ওঠে। দীর্ঘদেহী, ডাকাবুকো ডিফেন্ডারের দল সামনে এগিয়ে আসেন। প্রতিপক্ষ রক্ষণে তখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা! কে কাকে মার্ক করবে—বুঝতে না বুঝতেই বোমারু হেডারে বল জড়িয়ে যায় জালে।
চেনা ছক, পরিচিত ফর্মুলা। অথচ গত দু’মরশুম ধরে এই ছবি, এই রণকৌশলই বাকিদের আতঙ্কে রেখেছে। কর্নার মানেই বুঝি অবধারিত গোল! অন্য দল যেখান থেকে টুকটাক সাফল্য পায়, তাকেই গানার্সরা গানপাউডার বানিয়ে ফেলেছে। প্রশ্ন একটাই: কী করে?
২০২৩-২৪ আর্সেনালের সেট-পিস পরিসংখ্যান চমকে দেওয়ার মতো। ডেড-বল পজিশনে তারা মেরেছিল মোট ২০টি গোল। যার মধ্যে ১৬টিই আসে কর্নার থেকে। প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এক সিজনে এই বিশেষ পজিশনে এতগুলো গোল আর কোনও দলের নেই।
২০২৪-২৫ মরশুমেও একই ধারার পুনরাবৃত্তি। গতবারের সিজন অর্ধেক যেতে না যেতেই ডেড-বল থেকে তুলেছে ১২ গোল, যার মধ্যে বেশিরভাগই কর্নার। সেট-পিসের সম্ভাব্য গোলের (expected goals) হিসাবেও তারা লিগশীর্ষে, প্রায় ১৩.০। অর্থাৎ, মিকেল আর্তেতার বাহিনী শুধু সুযোগ তৈরি করছে না, তাকে নিয়মিত কাজেও লাগাচ্ছে।
আর এই সাফল্যের আড়ালে যে নামটা সবার আগে উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি নিকোলাস জোভের। ফরাসি এই কোচকে মিকেল আর্তেতা নিয়ে আসেন ২০২১-এ। সেই সময় আর্সেনাল মাঝারি মানের সেট-পিস দল। কর্নার থেকে খুব কম গোল আসত, প্ল্যান ছিল এলোমেলো। আর্তেতা তখন নতুন প্রকল্পে দল গড়ছেন। তিনি বুঝেছিলেন—আধুনিক ফুটবলে সেট-পিস শুধু খেলার অঙ্গ নয়, এটা ম্যাচ জেতার নির্ণায়ক অস্ত্র হতে পারে।
জোভের দায়িত্ব নিতেই ছবিটা পালটে গেল। আর্সেনালের কর্নার হয়ে উঠল এক প্রকার মঞ্চনাটক। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আলাদা চিত্রনাট্য। কে কোথায় দাঁড়াবে, কার দৌড় কোন কোণ ঘুরে আসবে, কোন ডিফেন্ডারকে ব্লক করতে হবে—সব পূর্বনির্দিষ্ট। হঠাৎই দেখা যায়, ছয় গজের ভেতর হট্টগোলের মধ্যে একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করে হেড মারছে। এই দৃশ্য ছকভাঙা। আকছার দেখা যায় না।
জোভেরের পরিকল্পনা রূপায়ণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম বুকায়ো সাকা। কর্নারের বিষাক্ত ডেলিভারি তার পায়ের ছোঁয়াতেই ভেসে আসে। দু’মরশুম আগে একা কর্নার থেকে ৫টি অ্যাসিস্ট বাড়ান। গতবারের সিজনেও ধারাবাহিকতা অব্যাহত। সাকার বলের বাঁক, গতি আর নিখুঁত জায়গায় ফেলার ক্ষমতা আর্সেনালের গোলের অন্যতম সোপান।
সাকার পাশে আছেন ডেকলান রাইস। পরিসংখ্যান বলছে, গত দেড় বছরে দুজন মিলে সাতটি করে সেট-পিস অ্যাসিস্ট দিয়েছেন। তাঁদের মিলিত জুটির সৌজন্যে কর্নার থেকে গোলের সংখ্যা আকাশ ছুঁয়েছে।
বিশ্লেষকদের চোখে, আর্সেনালের ডিফেন্ডাররাই এই কৌশলের মূল ভরসা। বিশেষ করে গ্যাব্রিয়েল মাগালহাইস। যিনি কর্নারের সময় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। তাঁর শক্তিশালী হেড প্রতিপক্ষের বক্সে আতঙ্ক ছড়ায়। উইলিয়াম স্যালিবার উচ্চতাও একইভাবে কার্যকরী। দু’জন মিলে কর্নার থেকে অন্তত ৯-১০ গোল এনে দিয়েছেন।
তবে শুধু সেন্টার-ব্যাক নয়, ফরোয়ার্ডরাও নানাভাবে লিপ্ত। কাই হাভার্টজের মতো খেলোয়াড় জায়গা খুলে দেন, ডিফেন্ডারদের ব্লক করেন। যাতে গ্যাব্রিয়েল বা স্যালিবার মতো টার্গেটম্যানরা সুবিধা পান। মাঝেমধ্যে নিজেরাই হেড নিয়ে গোল করেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে—বাকি দলগুলো কি এগুলো রুখে দেওয়ার চেষ্টাই করছে না? নিশ্চয় করছে। কিন্তু জোভেরের পরিকল্পনার এতটাই জটিল যে, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা প্রায়ই তাল হারিয়ে ফেলে। একদিকে তিনজনের হঠাৎ দৌড়, আরেকদিকে দুজনের ব্লক—এই বিভ্রান্তির চক্করে কে আসল টার্গেট, বোঝা খুবই কঠিন!
তাই ম্যাঞ্চেস্টার সিটির মতো দল হিমশিম খেয়েছে। বায়ার্ন মিউনিখও কর্নার প্রতিহত করতে গিয়ে ভুল করেছে। কারণ, এখানে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা, ডিফেন্ডারদের জায়গা থেকে সরানো, এমনকি গোলকিপারকেও জটলায় আটকে দেওয়া—সবই সুচতুর ও সুপরিকল্পিত প্ল্যানের অংশ।
প্রশ্ন আসে—যদি কর্নার থেকে এত গোল করা যায়, তবে অন্যরা এতদিনে কেন শিখতে পারল না? আসলে আর্সেনালের সাফল্যের মূলে শুধু কৌশল নয়, আছে মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি আর বারবার অনুশীলন। জোভের প্রতিটি সপ্তাহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু কর্নার প্র্যাকটিস করান। খেলোয়াড়রা জানেন, ম্যাচে তাদের ঠিক কোন মুহূর্তে কোথায় দৌড়াতে হবে। সবকিছুই সুষ্ঠু তালিমের ফসল। তাই অন্য দল চাইলে নকল করতে পারে, কিন্তু সেই নিখুঁত অনুশীলন ও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়া শুধু কৌশল দিয়ে কাজের কাজ হবে না। আর এখানেই আর্সেনাল এগিয়ে। তারা কর্নারকে শুধু কৌশল নয়, সাংস্কৃতিকভাবে খেলায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।