ইউনাইটেডের পাকাপাকিভাবে কোনও ‘প্যাটার্ন অব প্লে’ নেই। বিল্ড–আপে ভুল, রেস্ট–ডিফেন্সে দূরত্ব, সেট–পিসে দায়িত্ব–বিভ্রাট কিছুতেই কাটছে না।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 28 August 2025 13:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্লান্ডেল পার্কের কাদামাখা রাত নিছকই একটা ‘কাপ–অপসেট’ নয়। গ্রিমসবি টাউনের মতো ‘ইয়ো–ইয়ো’ ক্লাবের কাছে টাইব্রেকারে হেরে (নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ২–২ থেকে পেনাল্টিতে ১২–১১) ক্যারাবাও কাপ থেকে ছিটকে যাওয়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে দেখা গেল একেবারে বে-আব্রু, বে-ইজ্জৎ অবস্থায়।
প্রথমার্ধেই দু’গোলে পিছিয়ে, ৭৫ মিনিটে এমবেউমোর শটে লাইফলাইন, শেষ মুহূর্তে হ্যারি ম্যাগুয়েরের হেডে সমতা, তারপর মরণফাঁদ পেনাল্টিতে পরাজয়। গ্যালারি ছাপিয়ে মাঠে নেমে পড়া গ্রিমসবির উচ্ছ্বসিত সমর্থক আর টাচলাইনে স্তব্ধ রুবেন অ্যামোরিম—একই ছবির দুই ফ্রেম। বিগত পাঁচ বদলে নট বদলেছে। মুখ পাল্টেছে। কিন্তু দৃশ্যপট মোটের উপর একই। প্রশ্নটা তাই ইউনাইটেড ‘কীভাবে হারল?’ নয়। আসল সওয়াল: ‘কেন বারবার এমনটা হচ্ছে?’ এটা কি হঠাৎ জ্বরের ধাক্কা, নাকি দীর্ঘদিনের ‘ক্রনিক’ অসুখের লক্ষণ? মাঠ, বোর্ডরুম, মেডিক্যাল, স্কাউটিং, সংস্কৃতি—সবেতেই ঘুণ ধরার অনিবার্য ফলশ্রুতি?
গ্রিমসবি-বিপর্যয়: এলোমেলো বিন্যাস, ঝুরঝুরে নকশা
গতকাল অ্যামোরিম গুনে গুনে আটটি বদল ঘটিয়ে দল নামালেন। কোবি মেইনু, বেঞ্জামিন শেশকো, আন্দ্রে অনানা, হ্যারি ম্যাগুয়ের, মানুয়েল উগার্তে—প্রথম একাদশে গুচ্ছের হেডলাইন নাম। কিন্তু দলটা আদতে ছিল অসংলগ্ন। শুরু এবং শেষ দুই লগ্নেই চাপে। ১২ মিনিটে আমাদ দিয়ালোর ভুল–টাচ, উগার্তের সঙ্গে ধাক্কা—সুযোগটা চার্লস ভার্নাম কাজে লাগালেন, অনানা পরাস্ত হলেন নিয়ার পোস্টে। কর্নার ডিফেন্ডে অনানার মিস–পাঞ্চে টাইরেল ওয়ারেন দ্বিতীয় গোলটি সহজেই জালে ঠেলে দিলেন।
এই দুটো ঘটনার কারণ কিন্তু একটাই: ইউনাইটেডের পাকাপাকিভাবে কোনও ‘প্যাটার্ন অব প্লে’ নেই। বিল্ড–আপে ভুল, রেস্ট–ডিফেন্সে দূরত্ব, সেট–পিসে দায়িত্ব–বিভ্রাট কিছুতেই কাটছে না। অ্যামোরিমের খেলোয়াড় বদল (ব্রুনো, এমবেউমো, ডি লিগট) পরে ম্যাচের গতি বদলালেও দাপট ফিরল না। ২–২ থেকে পেনাল্টির লটারিতে হার—এই চিত্রনাট্যটা ইউনাইটেডের ইদানীং সময়ের দুর্দশার মেটাফর।
বারবার ম্যানেজার বদলই কি আসল কারণ?
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিদায়ের পর থেকে গুনে দেখুন—ডেভিড ময়েস, লুই ভ্যান গাল, জোসে মোরিনহো, ওলে গানার সোলশায়ের, রাল্ফ রাংনিক (ইন্টারিম), এরিক টেন হাগ—এখন রুবেন অ্যামোরিম—প্রত্যেকে এসেছেন মাথায় ভিন্ন ফুটবল–দর্শন, সিভিতে আলাদা প্রোফাইল নিয়ে। ফল? তত্ত্বের জগাখিচুড়ি! কেউ পজেশন–কন্ট্রোলের জন্য, কেউ ট্রানজিশন–প্রেসের জন্য, কেউ বক্স–ডিফেন্সের জন্য খেলোয়াড় কিনেছেন, তারপর তাঁদের বেচে দিয়েছেন। কারণ, ম্যানেজার বদল মানেই রিসেট! নতুন স্টাফ, নতুন ‘আইডিয়া’, নতুন কেনাকাটা। পুরনো খেলোয়াড়–কন্ট্রাক্ট স্কোয়াডে আটকে থাকে। একদিকে অতিরিক্ত মজুরি, অন্যদিকে নতুন কোচের না চাওয়ার তালিকা—রোস্টার ম্যানেজমেন্ট ভেঙে চৌচির! মাঠে তারই প্রতিফলন—ধীরগতির দলে হাই–প্রেস অসম্ভব। বাণিজ্যিক স্বার্থ মাথায় রেখে তারকাদের সই করানোয় স্কোয়াডের কাঠামো ভেঙে পড়েছে, ঝুরঝুর করে খসেছে আত্মবিশ্বাসের পালেস্তারা!
বিনিয়োগেও গলদ?
পূর্বতন মালিকানা ছিল যাদের হাতে, সেই গ্লেজারদের লিভারেজড বাই–আউটের পর থেকে ‘ঋণের সুদ’, ‘ডিভিডেন্ড’—এই সমস্ত শব্দ ইউনাইটেডের অভিধানে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। ক্লাবের বাণিজ্যিক রাজস্ব চমৎকার। অথচ ফুটবল অপারেশনে ধারাবাহিক, সঠিক, তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগের বহুদিনের অভাব। দীর্ঘ সময় ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাণিজ্য–পটভূমির নির্বাহীরা। প্রতিদ্বন্দ্বীরা (ম্যান সিটি, লিভারপুল, ব্রাইটন) যেখানে আগেই তৈরি করেছে ডেটা–অ্যানালিটিক্স–স্কাউটিং–পাইপলাইন, সেখানে ইউনাইটেড অনেক বছর বাদে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে পথে হাঁটতে শুরু করেছে। মাঝপথে কাঠামো পাল্টানো, দায়িত্ব–ওভারল্যাপে তোড়জোড় বাড়ে, আর মাথাচাড়া দেয় ভুলের পর ভুল!
কালপ্রিটের নাম ‘সাইনিং’
অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, ফ্যালকাও, অ্যালেক্সিস স্যাঞ্চেজ থেকে অ্যান্টনি, মাগুয়ের, স্যানচো, কাজেমিরো—বড় নাম, বড় অঙ্ক, বড় মজুরি। কিন্তু সব সাইনিং কি ইউনাইটেডের কাম্য ফুটবল–পরিচিতির সঙ্গে মিলেছে? বারবার দেখা গিয়েছে ‘আইডিয়া–ফার্স্টে’র বদলে ‘মার্কেট–ফার্স্ট’ রিক্রুটিং। ফলাফল? একাধিক ফুটবলার জড়ভরত, স্থবির। তাদের না বেচা যায়, না খেলানো যায়! বয়স–প্রোফাইলের ভারসাম্য কার্যত উধাও! একদিকে বয়সী খেলোয়াড়, অন্যদিকে অপরিপক্ব বিগেড। মাঝের স্তর অনুপস্থিত। যোগাযোগের অভাবে ড্রেসিংরুমে প্রতিযোগিতা নয়, জন্ম নেয় হতাশা।
চোট-আঘাত, স্পোর্ট–সায়েন্স, ওয়ার্কলোড…
ইউনাইটেড গত কয়েক মরশুমে একগুচ্ছ দীর্ঘ–বিরতির ইনজুরি সামলেছে। বারবার সেন্টার–ব্যাক জুটি বদলাতে হয়েছে, মিডফিল্ডে রোটেশন–সংকট, ফুল–ব্যাকে জোড়াতালি। আধুনিক ফুটবলে হাই–ইনটেনসিটি প্রেস, কমপ্যাক্ট ব্লক বজায় রাখতে পরিকল্পিত স্কোয়াড–বিল্ডিং আর বৈজ্ঞানিক ‘লোড ম্যানেজমেন্ট’ জরুরি। অথচ অপরিকল্পিত প্রি–সিজন, টানা ম্যাচ, এশিয়া–আমেরিকা ভ্রমণ এবং মাঝরাস্তায় ম্যানেজার–বদলের স্কোয়াড–স্ট্রেস—এসব মিলিয়ে শারীরিক–মানসিক ক্লান্তি সবার অলক্ষ্যে দলকে কুরে কুরে খেয়েছে। গ্রিমসবির প্রথম গোলে দিয়ালোর ভুল–টাচ বা উগার্তের সঙ্গে ধাক্কা কেবল টেকনিক্যাল ত্রুটি নয়—ফোকাস–ড্রপের বাস্তব দৃষ্টান্ত!
বড় শিরোপার স্মৃতি উধাও!
ওল্ড ট্র্যাফোর্ড একসময় প্রতিপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ ফেলত। এখন স্টেডিয়াম ধুঁকছে, অবিরাম বৃষ্টিতে টানেল ভিজে যায়—এগুলো প্রতীকী। আসল কথা, জার্সির ভারের সঙ্গে নিয়মিত সাফল্যের স্মৃতি না থাকলে ‘ভয়–ফ্যাক্টর’ও উধাও। ফ্যান–বেস বিশ্বস্ত, কিন্তু ক্লান্ত। বারবার নতুন শুরুয়াতের প্রতিশ্রুতি, বারবার মাঝপথে পিছলে যাওয়া একটা তৈরি করে টক্সিক সাইকেল। কেউ দোষ দেয় মালিকানা–নীতিকে, কেউ ম্যানেজারকে, কেউ খেলোয়াড়কে। শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট জবাবদিহি কোনও পক্ষের তরফ থেকে মেলে না।
কৌলিন্যের গুমরেই আত্মতুষ্টি?
এটা দু’দশক আগের ইংল্যান্ড নয়। লিগ টু–র কোচেরাও সেট–পিস অটোমেশন, প্রেসিং–ট্রিগার, ভিডিও–প্রিপারেশনে সিদ্ধহস্ত। সব স্তরে বিপ্লব। গ্রিমসবি জানত অনানা নিয়ার পোস্ট দুর্বল, কর্নারে পাঞ্চ–জাজমেন্ট ভঙ্গুর। তারা টার্গেটেড প্ল্যান বানিয়েছে, ‘সেকেন্ড–বল’ জিতেছে। ইউনাইটেড আগেও দুর্বল প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে হেরেছে—এমকে ডনসের কাছে (২০১৪, ০–৪), ব্রিস্টল সিটির হাতে (২০১৭), মিডলসব্রোর বিরুদ্ধে এফএ কাপে পেনাল্টিতে (২০২২)। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, স্থায়ী প্যাটার্ন।
অ্যামোরিম–ফ্যাক্টর
স্পোর্টিং লিসবনে অ্যামোরিমের দর্শন ছিল ৩–৪–৩। উইং-ব্যাক উপরে উঠবে, মিডফিল্ডে ডুয়াল–পিভটের কভার, সামনে মোবাইল–ফ্রন্ট–থ্রি। ইউনাইটেডে কি সেই ‘পিচ–মডেল’ মিলছে? বক্স–ডিফেন্সে হাই–লাইন সামলাতে পারেন এমন ডিফেন্ডার কই? বল–পজেশনে ফার্স্ট–ফেজের ক্লিন প্রোগ্রেশন আছে কি? এই দুই স্তম্ভ ভঙ্গুর হলেই ৩–৪–৩ দ্রুত ৫–৪–১ ‘সারভাইভাল ব্লক’ হয়ে যায়। সেখানেই ইউনাইটেড বারবার পিছু হাঁটে: বল নিজেদের পায়ে থাকে কম। চাপের মুহূর্তে বারবার ভুল, বারবার গোল হজম।
কালকের জঘন্য পরাজয় তাই ভুলে যাওয়ার নয়—মনে রাখার। এই হার ফের একবার দেখিয়ে দিল সমস্যা কোথায়! মাঝমাঠের দৌড়–আক্রমণের প্রেস তুচ্ছ। বোর্ডরুম থেকে টানেল পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগছে ইউনাইটেড। আর সেই অভাব না মিটলে ‘গ্লোরি গ্লোরি ইউনাইটেডে’র সুর ক্রমশ ফিকে হতে হতে দিকচক্রবালে মিশে যাবে।