সবাই ভেবেছিল ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড হেঁসেলে সুস্বাদু ডিশ রাঁধবে—ছিনিয়ে নেবে জয়, বড় ব্যবধানে। বদলে জীয়ন্ত মাছের ল্যাজের ঝাপ্টায় যে কানচাপাটি খেতে হবে, সেটা ঘুণাক্ষরেও মাথায় আসেনি!

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 28 August 2025 07:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিরোনামে বেলেঘাটা অ্যাথলেটিক কিংবা যাদবপুর সংগ্রামীর তুলনাও টানা যেত। কলকাতা লিগের চতুর্থ ডিভিশনের ক্লাব। তাদের হাতে মোহনবাগান কিংবা ইস্টবেঙ্গল হারলে ছবিটা যেমন দাঁড়ায়, সেই দৃশ্যই ধরা পড়ল কাল রাতে, ব্লান্ডেল পার্কে। ইংলিশ লিগে ফোর্থ ডিভিশনের দল গ্রিমসবি টাউনের (Grimsby Town) হাতে দু'গোলে পিছিয়ে পড়ে কামব্যাক করে ফের টাইব্রেকারে হেরে ইএফএল কাপ (EFL Cup) থেকে বিদায় নিল ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড (Manchester United)। এহেন পরাজয় নজিরবিহীন, লজ্জার, ক্লাবের ইতিহাসে যা আগে কোনও দিন দেখা যায়নি!
গ্যালারি থেকে তখন কাতারে কাতারে সমর্থক বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মাঠে নেমে পড়েছে। কেউ আনন্দে ডিগবাজি খাচ্ছে, কেউ খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরে পিষে মারার জোগাড়! ফ্লাডলাইটের আলোয় তখন আঁধার-মলিন মুখে দাঁড়িয়ে ইউনাইটেড ম্যানেজার রুবেন অ্যামোরিম। সদুত্তর বহুদিন অধরা। এবার প্রশ্নের ভাঁড়ারও ফুরিয়ে আসছে!
গ্রিমসবি টাউন। দলটার নিজস্ব কোনও স্টেডিয়াম নেই। খেলে পড়শি পাড়ার মাঠে। ব্রিটিশ ফুটবলের মূর্তিমান ‘ইয়ো-ইয়ো’ ক্লাব। মানে, টপ ফ্লাইট থেকে নন লিগ—সমস্ত স্তরে ঘুরপাক খেয়েছে। নিজেদের পরিচয় দেয় ‘দ্য মেরিনার্স’ বলে। শহরের বাসিন্দাদের সিংহভাগ পেশায় জেলে। একদা ইউরোপের সবচেয়ে বড় মাছ ধরার কেন্দ্র। ম্যাসকটের নামও ‘মাইটি মেরিনার’। মৎস্যপ্রীতি এতটাই, যে কোনও ম্যাচ জিতে নিলে এক সময় প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের দিকে তাক করে সমর্থকরা মাছ ছুড়তেন। পরে এফএ তাতে নিষেধাজ্ঞা আনে।
কাল রাতে সবাই ভেবেছিল ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড হেঁসেলে সুস্বাদু ডিশ রাঁধবে—ছিনিয়ে নেবে জয়, বড় ব্যবধানে। বদলে জীয়ন্ত মাছের ল্যাজের ঝাপ্টায় যে কানচাপাটি খেতে হবে, সেটা ঘুণাক্ষরেও মাথায় আসেনি!
প্রথমার্ধ শেষ হতে না হতেই ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় গ্রিমসবি। কুড়িবারের ইংলিশ চ্যাম্পিয়নদের তখন ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা! ম্যাচের ১২ মিনিটে আমাদ দিয়ালোর বেখেয়ালি টাচ, তার পরই উগার্তের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বল হারানো। সুযোগটা লুফে নেন চার্লস ভার্নাম। ডান দিক থেকে আসা ড্যারাহ বার্নসের পাস ধরে নিয়ার পোস্টে অনানাকে পরাস্ত করেন। ক্যামেরুনিয়ান গোলকিপারের এই ভুলে আবারও ধরা পড়ল তাঁর টেকনিক্যাল দুর্বলতা।
এরপরই দ্বিতীয় গোল। বামদিক থেকে ছোট কর্নার নিয়ে বল ফের ভেতরে ঢুকল। অনানা ঝাঁপিয়ে পড়লেন, কিন্তু মিস টাইমড পাঞ্চ। বল পড়ল টাইরেল ওয়ারেনের সামনে। নির্দ্বিধায় জালে পাঠালেন তিনি। ২০১৯-এ যিনি একসময়ে ইউনাইটেডেই ছিলেন, সেই ওয়ারেনের গোলেই ‘মেরিনার্স’রা ২–০ এগিয়ে গেল। গ্যালারিতে তখন গান: ‘প্রিমিয়ার লিগ, তোমাদের নিয়ে হাসাহাসি করি!’
হাফটাইমে তিনটি বদল। ফ্রেডেরিকসন, উগার্তে আর ডরগুর বদলে মাঠে নামলেন ব্রুনো ফার্নান্দেস, এমবেউমো আর ডি লিগট। ততক্ষণে চরম চাপে ইউনাইটেড। দ্বিতীয়ার্ধে প্রবল বর্ষণ। তবু চেপে খেলছিল গ্রিমসবি।
৭৫ মিনিটে অবশেষে এক গোল ফেরাল ইউনাইটেড। এমবেউমোর শটে বল জালে জড়াল। ব্যবধান কমল। চাপ বাড়ল। শেষ মুহূর্তে ভরসা জোগালেন হ্যারি ম্যাগুয়ের। কর্নার থেকে হেডে গোল করে সমতা ফেরালেন। অতিরিক্ত সময়ের পর ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে।
এমন শুট-আউট সচরাচর দেখা যায় না। ১২–১১ পর্যন্ত টানাটানি। একে একে গোল করছেন দুই পক্ষই। অবশেষে এমবেউমোর শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসতেই গ্রিমসবির মাঠে উৎসব। দর্শকরা নেমে পড়ল, খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরে গ্যলারি-কাঁপানো গান: ‘ও হোয়েন দ্য টাউন গো স্টিমিং ইন।’
ইউনাইটেডের পরিণতি? ভয়াবহ লজ্জার। সিজনের শুরুতেই একের পর এক বিপর্যয়। রুবেন অ্যামোরিমের ব্যয়বহুল স্কোয়াডে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ হয়েছে। অথচ দল থেকে উধাও ছন্দ, পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস। ৯ মাস কাটল, এখনো তাঁর কৌশলে আলো দেখা যাচ্ছে না। গ্যালারি থেকে চিৎকার উঠছে: ‘তোমার বরখাস্ত নিশ্চিত!’
পর্তুগিজ ম্যানেজার টাচলাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিঃশব্দে। বর্ষার রাতে ব্লান্ডেল পার্কের মাটি ভিজে যাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে কি আস্তে আস্তে নিজের নিষ্ক্রমণ আর দলের অতলে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্যকল্প দেখতে পাচ্ছিলেন অ্যামোরিম?